“আমায় একটু ঘুমোতে দে না…” কুন্তল কাঁড়ারের শেষ কথাগুলো এখনও কানে বাজছে রুদ্রপ্রসাদ হালদারের

0
এই দলের মধ্যে দু'জন ফিরলেন, আর দু'জন রইলেন কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে।

ওয়েবডেস্ক: “রুদ্র আমায় একটু শুতে দে না। একটু ঘুমোতে দে না আমায়।” সেই শেষ বার কুন্তলবাবুর মুখ থেকে কোনো কথা শুনলেন তিনি। তার পর আসতে আসতে চিরনিদ্রায় পাড়ি দিলেন বহু দিনের বন্ধু কুন্তল।

কোনো রকমে বেঁচে ফিরেছেন তিনি, রুদ্রপ্রসাদ হালদার। কিন্তু এখনও তাঁর কানে বাজছে কুন্তল কাঁড়ারের সেই কথাগুলো। মনে পড়ে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তগুলো যখন দুই বন্ধুকে প্রায় হারানোর মুখে দাঁড়িয়ে তাঁরা। একটি বাংলা খবরের ওয়েবসাইটে রোমহর্ষক সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন রুদ্রপ্রসাদবাবু।

বুধবার কাঞ্চনজঙ্ঘায় সামিট করে নামার পরেই ঘটে যায় এই অঘটন। রুদ্রপ্রসাদবাবুর কথায়, সামিট থেকে নামার সময়েই আসতে আসতে অসুস্থ হতে শুরু করেন কুন্তল। তাঁর কথায়, “আমি সব বুঝতে পারছিলাম। কুন্তলের এই লক্ষণগুলো আমার খুব চেনা। হাই অল্টিটিউড সিকনেসের এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে, যেখান থেকে একটু এগোলেই মৃত্যু।” কিন্তু তাঁরও যে কিছু করার ছিল না।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন পূর্বা শেরপা। রুদ্রবাবুকে বারবার শেরপা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, মৃত্যুপথযাত্রী কুন্তলবাবুর কাছে বেশিক্ষণ থাকলে তিনি নিজেও মারা যাবেন, সেই সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়বেন পূর্বা শেরপা নিজেও।

আরও পড়ুন খোঁজ নেই দীপঙ্কর ঘোষের, কুন্তল-বিপ্লবের দেহ উদ্ধার করল ছয় শেরপার দল

কুন্তলবাবুকে ছেড়ে আসতে চাননি তিনি। একাধিকবার চড় মেরে, ঝাঁকিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ আর উপায়ান্তর না দেখে কুন্তলবাবুকে একা ফেলেই নামতে শুরু করেন তিনি। এর পরে জেপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমে একটি এসওএস পাঠান রুদ্রবাবু। সেখানে তিনি লেখেন, “স্পট থেকে এসওএস করছি। এখুনি অ্যাকশন নে, নতুবা কুন্তল মরে যাবে। বিপ্লবকেও আর বাঁচানো যাবে না।” কিন্তু রুদ্রবাবু এসওএসটা করতে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য গ্লাভ্‌স এবং সানগ্লাস খোলা রাখেন। আর তাতেই তাঁরও ফ্রস্ট বাইট হয় এবং স্নো-ব্লাইন্ডনেসে আক্রান্ত হন তিনি। রুদ্রবাবুর কথায়, তিনি ভালোই বুঝতে পারছিলেন, দু’জনের মৃত্যু ডেকে আনার কোনো মানেই হয় না।

তবে কুন্তলবাবুর সঙ্গে শেষ কথা বলার আগেই আরও এক খারাপ অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন রুদ্রবাবু। সেটা আরও এক পর্বতারোহী বিপ্লব বৈদ্যকে নিয়ে।

রুদ্রবাবুর করা সেই এসওএস। ছবি সৌজন্য: সোনারপুর আরোহী ক্লাবের সদস্য চন্দন বিশ্বাস

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিকেলে সামিট ক্যাম্প থেকে রওনা হয়ে বুধবার সকাল এগারোটা নাগাদ কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়োয় পৌঁছোন চার জন। মাঝেই পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন কুন্তলবাবু। তাঁকে ছেড়ে রেখেই বিপ্লব বৈদ্য, রুদ্রপ্রসাদ হালদার, রমেশ রায় এবং শেখ সাহাবুদ্দিন কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষে পা রাখেন। রুদ্রবাবুর কথায়, কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিটের মতো শক্ত সামিট আর নেই। কারণ, “চুড়োর মাথায় একটা পাঁচিল মতো আসে প্রথমে। ওটায় চড়ার পরে মনে হয়, ওটাই সামিট। কিন্তু ওখান থেকে ফের নেমে, কয়েক মিটার দূরে একটা বাটির মতো অংশে উঠতে হয়, যেটা হল আসল সামিট! আগেরটা নয়। আর এই কয়েক মিটার পথে বরফের সঙ্গে পাথর মিশে আছে। ওই উচ্চতায় পাথরে ক্লাইম্বিং যে করেছে, সে-ই জানে যে সেটা কতটা কঠিন।”

আরও পড়ুন পর্বতারোহণে অন্ধকার সময়, আট পর্বতারোহীর প্রাণ কাড়ল এই মরশুম

এই সামিটের সময়েই রুদ্রবাবুকে এমন একটা কথা বলেন বিপ্লববাবু, যেটা শুনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। বিপ্লববাবু বলছিলেন ওখানেই ‘বিভোক’ করতে। পাহাড়ি ভাষায়, বিভোক করার অর্থ বরফের ঢালে অস্থায়ী শেল্টার বানিয়ে রাত কাটানো। কোনো অভিজ্ঞ পর্বতারোহী যে এই সময়ে এই কথা বলতে পারেন না, সেটা ভালোমতো জানেন সবাই। তাই বিপ্লববাবুর শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে রুদ্রবাবুর মনে।

বিপ্লববাবু অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, এটা আন্দাজ করেই সামিট থেকে নামতে শুরু করেন রুদ্রবাবু। তবে সেই সঙ্গে আশ্বাস পান, বিপ্লববাবুর সঙ্গে থাকা শেরপা যথেষ্ট ওস্তাদ, এবং সে নামিয়ে আনবেই। সামিট থেকে নামার পথে দুশো মিটার এগিয়েই কুন্তলবাবুর সঙ্গে সেই কথাবার্তা হয় রুদ্রবাবুর। বহু কষ্টে কুন্তলবাবুকে পাহাড়ের ঢালে রেখেই নামতে শুরু করেন রুদ্রবাবু।

এরই মধ্যে জীবন বিপন্ন হতে শুরু করে আরও এক পর্বতারোহী রমেশ রায়ের। রুদ্রবাবু বলেন, “আমার খানিকটা সামনে রমেশদা ছিল। জল শেষ, অক্সিজেন শেষের মুখে। ফলে সেও ডিহাইড্রেটেড হয়ে গেছিল। শরীরে কোনো ক্ষমতাই ছিল না ওর।”

বিকেল নাগাদ সামিট ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছোতেই রুদ্রবাবু দেখেন অভিজ্ঞ কয়েকজন শেরপা যাচ্ছেন কুন্তল আর বিপ্লববাবুকে উদ্ধার করে আনতে। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর শরীরও যে ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারেন তিনি। কারণ হঠাৎ করে অসংলগ্ন আচরণ শুরু করেন তিনি। বরফের মধ্যে ডিগবাজি খাওয়ার পাশাপাশি হাসতে শুরু করেন। তবে তাঁকে সামলে নেন অন্য এক ব্যক্তি। রুদ্রবাবু বুঝতে পারছেন না তিনি পর্বতারোহী না কি শেরপা। ওই ব্যক্তির সাহায্যের সামিট ক্যাম্পে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু সেখানে যে রমেশবাবু নেই। রমেশবাবু তো অনেক আগেই ছিলেন, তা হলে কোথায় গেলেন?

এর পরে ক্যাম্পেই ঘুমিয়ে পড়েন রুদ্রবাবু। তাঁর কথায়, “রাতে শেরপারা ফিরল, এক জনকে নিয়ে। দড়ি দিয়ে বেঁধে, পা টেনে, প্রায় ঘষটে ঘষটে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এটা হয়তো কুন্তলের মৃতদেহ। কিন্তু এ তো রমেশদা! রমেশদা কোথায় আটকে ছিল!”

আরও পড়ুন কুন্তল-বিপ্লবের মতো চিলের এক পর্বতারোহীকেও কি নিজের কাছে রেখে দিল কাঞ্চনজঙ্ঘা?

তিনি তখন ভেবেছিলেন তুষাররাজ্যে প্রাণ হারিয়েছেন রমেশবাবুও। শেরপারাই রমেশবাবুকে সামিট ক্যাম্পের সামনেই উদ্ধার করেন প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায়। রুদ্রবাবু তখনও জানেন না যে বিপ্লববাবুও মারা গিয়েছেন। ভাবছিলেন, বিপ্লববাবু ঠিক সুস্থ শরীরে ফিরবেন। কিন্তু এরই মধ্যে রমেশবাবুর অবস্থা দেখে কার্যত ভেঙে পড়তে শুরু করেন তিনি।

কিন্তু হঠাৎ করেই শেরপারা বলেন, “জিন্দা হ্যায়।” মৃত্যুকে হারিয়ে দিয়েছেন রমেশবাবু। শেরপাদের ডাকেই পাশের ক্যাম্প থেকে পুনের অভিযাত্রী দল থেকে একজন চিকিৎসক ছুটে আসেন। ইঞ্জেকশন-সহ আরও কিছু চিকিৎসার পর বেঁচে গেলেন রমেশবাবু।

বৃহস্পতিবার সকাল হল এই বিষাদ নিয়ে। কারণ ততক্ষণে কুন্তলবাবুর পাশাপাশি বিপ্লববাবুর মৃত্যুর খবরও এসে পৌঁছেছে তাঁদের কাছে। কিন্তু তখনও তাঁদের দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওই দিনই ক্যাম্প-২-তে নেমে আসেন রুদ্র-রমেশ। এর মধ্যেই একটা শান্তির খবর ছিল, তুলনামূলক ভাবে অনেকটা সুস্থ থাকার ফলে দ্রুত বেস ক্যাম্পে পৌঁছে যান শেখ সাহাবুদ্দিন।

কাঠমান্ডুর হাসপাতালে রমেশবাবু ও রুদ্রবাবু।

শনিবার সকালে ক্যাম্প-২ থেকে তাঁদের ‘হেলি রেস্কিউ’ করা হয়। অর্থাৎ হেলিকপ্টার এসে পৌঁছোয় ক্যাম্প-২-এর সামনে। সেখান থেকে দু’জনকে নিয়ে সোজা হেলিকপ্টার পৌঁছোয় কাঠমান্ডুর গ্র্যান্ডি হাসপাতালের ছাদে।

ফ্রস্ট ব্রাইটে জখম হলেও এখন আর প্রাণ সংশয় নেই রমেশবাবু আর রুদ্রবাবুর। কিন্তু একটা কথাই তিনি বলে চলেছেন, “চার জনেই মরে যেতাম আমরা।”

খবর সৌজন্য: দ্য ওয়াল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.