নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: ট্রেজারি কর্তা নাদির শাহ’র মৃত্যু রহস্যের কিনারা করতে এবার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিচ্ছে পুলিশ।বুধবার দুপুরে জলপাইগুড়ির রাজবাড়ি পাড়ার কম্পোজিট কমপ্লেক্সে সরকারি আবাসনে আসেন চার সদস্যের ফরেনসিক দল। সঙ্গে জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইন্দিরা মুখার্জি, ডিএসপি(ক্রাইম)মানবেন্দ্র দাস, কোতোয়ালি থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার।

গত ১৩ ডিসেম্বর ওই  সরকারি আবাসনের নিজের ফ্ল্যাটেই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত ট্রেজারি আধিকারিক নাদির শাহ’র। ঘটনার পর তার স্ত্রী রাখি শাহ পুলিশের কাছে দাবি করেন ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি।যদিও ১৫ ডিসেম্বর কোতোয়ালি থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করেন মৃত নাদির শাহর বাবা নাসির শাহ।মৃতদেহ নিয়ে চিকিৎসকের সন্দেহ হওয়ায় জলপাইগুড়ি থেকে ময়নাতদন্তের জন্য উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই দেহ ময়নাতদন্তের পর চুড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়ার আগে ঘটনাস্থল পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই মোতাবেক উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ থেকে ফরেনসিক দল আসে বুধবার।

আরও পড়ুন: জলপাইগুড়িতে ট্রেজারি আধিকারিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে রহস্য ঘনীভূত

স্বামীর মৃত্যুর পর কলকাতায় শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিলেন স্ত্রী রাখি। তাঁকে এবং মৃতের বাবা নাসের শাহকেও ডেকে পাঠানো হয় জলপাইগুড়িতে। নাসির  শাহ না এলেও স্ত্রী রাখি শাহ সোমবার জলপাইগুড়ি আসেন।বুধবার তাঁকে নিয়েই ওই ফ্ল্যাটে যায় ফরেনসিক দল ও পুলিশ। তারা ফ্ল্যাটের পারিপার্শ্বিক অবস্থা খুটিয়ে দেখেন।ঘটনার সময় ওই ফ্ল্যাটে তিনি ও তার স্বামী ছাড়া আর কেউ ছিলনা বলেই পুলিশকে জানিয়েছিলেন স্ত্রী রাখি। তাঁর দাবি, গোঙানির আওয়াজ পেয়ে পাশের ঘরের দরজা কিছুটা ভেঙ্গে স্বামীর ঘরে ঢোকেন তিনি।ওড়না দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে পাশের রান্না ঘর থেকে বটি-দাঁ নিয়ে এসে সেই ওড়না কেটে স্বামীর দেহ নামিয়ে আনেন। তারপর প্রতিবেশীদের খবর দেন। সেদিনের ঘটনার বিবরণ আজ ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের কাছে তুলে ধরেন রাখি শাহ। ফাঁস লাগানোর জন্য ব্যাবহার করা ওড়না এবং যে বটি-দাঁ দিয়ে সেই ওড়না কেটে নাদির শাহর দেহ নামানো হয়েছিল সেটি সংগ্রহ করেন তারা।পাশাপাশি বাজেয়াপ্ত করা হয় নাদির শাহর তিনটি এবং রাখির শাহর একটি মোবাইল ফোন।প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল।

সূত্রের খবর, প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যার ঘটনা মনে হলেও কিছু পারিপার্শ্বিক অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে।সেই জট খুলতেই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিচ্ছে পুলিশ।

ঘটনার পর থেকে ওঠা কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।যেমন ঘরের দরজা ভেঙ্গে স্বামীকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে আনা একা একজন মহিলার পক্ষে সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাখি পুলিশকে জানিয়েছেন, সেদিনও স্বামীর সঙ্গে প্রবল ঝগড়া হয়েছিল তাঁর। নাদির শাহের মৃত্যুর পর তার শ্যালক এবং রাখির ভাই তাহের শেখ অভিযোগ করেছিলেন,তাঁর জামাইবাবুর সঙ্গে একাধিক মহিলার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে।আগের বিয়ে লুকিয়ে তার দিদিকে বিয়ে করেছিলেন নাদির, অভিযোগ তাহেরের।সম্প্রতি এক মহিলা নাদিরকে বিয়ের জন্যও চাপ সৃষ্টি করছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এইসব নিয়ে সম্প্রতি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি চরমে পৌছেছিল।ঘটনার দিনও দুজনের বচসার আওয়াজ পেয়েছিলেন প্রতিবেশীরা।

এদিকে ছেলেকে খুনের অভিযোগ দায়ের করলেও নির্দিষ্ট কারও নামে অভিযোগ দেননি বাবা নাসির শাহ।

ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে কথা বলতে আজ তাকে ডেকে পাঠানো হলেও তিনি আসেননি।

নাদির শাহ ও রাখি শাহ

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ডাঃ রাজীব প্রসাদ জানিয়েছে তারা দ্রুত পুলিশকে রিপোর্ট দেবেন।তবে মুখ খোলেননি মৃতের স্ত্রী রাখি শাহ।তাঁর বক্তব্য,যা জানানোর পুলিশকে জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ঘটনায় এখনও রয়ে যাচ্ছে ধোঁয়াশা। একাধিক মহিলার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের চাপ নিতে না পেরেই কি এই চরম পরিণতি? স্ত্রীর দাবি আত্মহত্যা, বাবার অভিযোগ খুন।সত্যি কোনটা?

জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন,আত্মহত্যার পাশাপাশি খুনের সম্ভবনাও এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, সবদিক মাথায় রেখেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের রহস্য মৃত্যু চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল জনমানসে,সেই রহস্যের পর্দা কবে উঠবে অপেক্ষা তারই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here