fever in chamurchi tea garden

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : গত ২৪ ঘণ্টায় জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চার জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত এক মাসে মৃত্যু হয়েছে চোদ্দোজনের, এমনটাই দাবি বাসিন্দাদের। আতঙ্কে কাঁপছে ডুয়ার্সের চামুর্চি চা বাগান।

জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি ব্লকের এই রুগ্‌ণ চা বাগানের শ্রমিকসংখ্যা প্রায় ১৫০০। জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। অভিযোগ, জনসংখ্যার অধিকাংশই জ্বরে আক্রান্ত। আর্থিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে চলা এই রুগ্‌ণ চা বাগানটির নিজস্ব স্বাস্থ্য পরিষেবাও বেহাল। বাধ্য হয়েই সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল শ্রমিক পরিবারগুলি। মাসদুয়েক ধরে জ্বরের উপদ্রবে নাজেহাল বাসিন্দারা।

শুক্রবার বিকেলে বিজয় মাহালি (৫২) নামে এক জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। শুক্রবার ভোরে নিজের বাড়িতেই মৃত্যু হয় আপার ডিভিশনের বাসিন্দা বলবীর বিশ্বকর্মা (৪০) নামে এক জনের। বেশ কিছু দিন ধরেই তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। অন্য দিকে মাহালি লাইনের বাসিন্দা বসু মাহালি (৩২) নামে এক জনকে জ্বর নিয়ে বৃহস্পতিবার মালবাজার মহুকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আজ ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। গুদাম লাইনের বাসিন্দা বিনিকা লোহার (২৬) জ্বর নিয়ে প্রথমে বীরপাড়া স্টেস্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরে আসেন। বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই ফের তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। প্রথমে বানারহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, পরে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে রাতেই তিনি মারা যান।

চামুর্চি চা বাগানের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, জ্বরের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের দাবি, প্রায় হাজার দুয়েক মানুষ আক্রান্ত। তবে কী ধরনের জ্বর তা পরিষ্কার নয়। এই মরশুমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বিশেষ করে জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকা, চা বাগান থেকে গত এক মাস ধরে ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া গিয়েছে। মিনু পোখরেল নামে এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, র‍্যাশ বের হওয়া, বমি বমি ভাব এই ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে আক্রান্তদের। বাগানের বাসিন্দাদের অভিযোগ, মেডিক্যাল টিম পাঠানো হলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন বা স্বাস্থ্য দফতর।

গফর আনসারি নামে বাগানের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, বাগানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মশা নিরোধক স্প্রে করা প্রয়োজন। দরিদ্র শ্রমিক পরিবারগুলিকে মশারি দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। চা শ্রমিক নেতা জিয়াউল আলম জানিয়েছেন, শুধু মেডিক্যাল টিম পাঠালে চলবে না, বাগানে চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ রেখে স্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

যদিও এ বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তরফে। শনিবার এই পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ জগন্নাথ সরকার, রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান তথা সাংসদ বিজয় চন্দ্র বর্মণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্তারা। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে দাবি করা হয়েছে, গত এক মাসে যে ১৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে তার কারণ শুধু জ্বর নয়, অন্যান্য রোগেও মৃত্যু হয়েছে বাসিন্দাদের। তবে পরিস্থিতি বুঝে ইতিমধ্যেই সেখানে একাধিকবার বিশেষ মেডিক্যাল টিম পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ জগন্নাথ সরকার। স্বাস্থ্য দফতরের হিসেব অনুযায়ী শুক্রবার ওই টিম মোট ২০১টি বাড়ি ভিজিট করে ১০১০ জন বাসিন্দার শারীরিক পরীক্ষা করে। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪৯ জনের জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জানিয়েছেন, রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পরই জানা যাবে অসুস্থরা ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত, না কি ভাইরাল ফিভারে।

এই মেডিক্যাল টিম লাগাতার বাগানে নজরদারি চালাবে বলে জানিয়েছেন মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, জ্বরে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা না করিয়ে বাড়িতেই ফেলে রাখার প্রবণতা বেশি চা বাগানগুলিতে। পরিস্থিতির অবনতি হলে তবেই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এতে অনেক সময় চিকিৎসার সুযোগই পাওয়া যায় না। জেলা স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, ‘আশা’ কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়ার বিষয়ে বাগানের বাসিন্দাদের সচেতন করার কাজ করছেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here