নার্সিংহোমে গাফিলতিতে মৃত্যু: নতুন করে তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের

0
1980
marina nursing home

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ির মেরিনা নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেণ্ট আইনে মামলায় এ বার নতুন মোড়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে দল গঠন করে নতুন করে তদন্ত করাবে ডিরেক্টরেট অফ হেলথ সার্ভিস। বুধবার এই নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে ওই নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশের সময়সীমা আরও ছ’ সপ্তাহ বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত। আজকের নির্দেশে চিকিৎসকমহল যেমন স্বস্তি পেয়েছেন, তেমনি উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশে খুশি মৃতা মীনা ছেত্রীর পরিবারও।

গত ১১ এপ্রিল জলপাইগুড়ি শহরের মেরিনা নার্সিংহোমে মৃত্যু হয় মীনা ছেত্রী নামে এক প্রৌঢ়ার। ভেন্টিলেশন মেশিন খারাপ থাকায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে তাঁর পরিবারের তরফে। মীনা দেবীর ছেলে রাজেশ ছেত্রীর অভিযোগ ছিল, ভেণ্টিলেশন মেশিন খারাপ থাকার কথা তাঁদের কাছে চেপে গিয়েছিল নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা। এর পরেই মীনা ছেত্রীর পরিবার জেলা স্বাস্থ্য দফতর এবং কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ জানায়। অভিযোগ পাঠানো হয় রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও। তিন সদস্যের কমিটি তৈরি করে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেই রিপোর্ট দেয় জেলা স্বাস্থ্য দফতর। তার ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানার পুলিশ ২০১৭-এর ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইন অনুযায়ী মামলা রুজু করে। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ নং ধারা (অনিচ্ছাকৃত খুনের ধারা)। এরই মধ্যে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এবং তিন চিকিৎসক-সহ পাঁচজনের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয় জলপাইগুড়ি জেলা আদালত। তার পরেই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা। গত ২০ জুনের শুনানিতে দু’ সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট এবং কেস ডায়েরি-সহ সমস্ত নথি আদালতে পেশের নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। সেই সঙ্গে চার সপ্তাহ নার্সিংহোম ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত।

আরও পড়ুন: জলপাইগুড়ির অভিযুক্ত চিকিৎসকদের আপাতত গ্রেফতার নয়, স্থগিতাদেশ কলকাতা হাইকোর্টের

এটি সম্ভবত ২০১৭-এর ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইনে করা  প্রথম মামলা। তাই শোরগোল পড়ে যায় রাজ্য জুড়ে। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে চিকিৎসকমহলে। তাঁরা আন্দোলনের পথে যাওয়ারও হুমকি দেন। অবস্থা এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, জেলার চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার উপক্রম দেখা দেয়।

চিকিৎসকদের প্রশ্ন ছিল, এই মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ নং ধারা (অনিচ্ছাকৃত খুনের ধারা) কোন যুক্তিতে দেওয়া হল। চিকিৎসক মহলের একটা বড়ো অংশের অভিযোগ ছিল, তড়িঘড়ি তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে এবং কোনো এক ‘অজ্ঞাত’ চাপে প্রথম বারের তদন্ত রিপোর্ট বদল করে দ্বিতীয় বার ফের একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। কেন এই তদন্ত রিপোর্ট বদল, সেই প্রশ্ন তুলে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগন্নাথ সরকারকে ঘেরাও পর্যন্ত করেছিলেন জলপাইগুড়ির চিকিৎসকরা।

দু’ সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত নথি জমা পড়ার পর বুধবার এই মামলায় ফের শুনানির দিন ধার্য হয়েছিল উচ্চ আদালতে। জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তদন্ত রিপোর্টে অসঙ্গতি থাকার যুক্তিতেই আজ উচ্চ আদালতে সওয়াল করেন মেরিনা নার্সিংহোম এবং চিকিৎসকদের আইনজীবীরা। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তদন্ত রিপোর্ট এবং পুলিশের কেস ডায়েরি পেশ করা হয়। নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকদের আইনজীবী শেখর বসু, সৈকত চ্যাটার্জি, দেবাশিস মুখার্জি তদন্ত রিপোর্ট বদল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পালটা বক্তব্য পেশ করেন সরকার পক্ষের আইনজীবী। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে দু’ পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর এবং তদন্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী তাঁর নির্দেশ দেন। আইনজীবী সৈকত চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, রাজ্য স্বাস্থ্য অধিকর্তার অধীনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি দল গঠন করে নতুন করে ওই রোগিণীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যে হেতু ভেন্টিলেশন মেশিন খারাপ থাকার অভিযোগ রয়েছে, সে হেতু ওই দলে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসকদের রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্ট আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে আদালতে পেশ করতে হবে। আইনজীবী দেবাশিস মুখার্জি জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আরও ছয় সপ্তাহ পুলিশ ওই নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারির মতো কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না।

উচ্চ আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন চিকিৎসকমহল। জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্বস্তিশোভন চৌধুরী জানিয়েছেন, তাঁরা তদন্ত রিপোর্ট বদল নিয়ে এবং পুলিশের ৩০৪ ধারা প্রয়োগ নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, আদালতের রায় তাকে মান্যতা দিয়েছে। আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: কমলেশ বিশ্বাস। তাঁর দাবি, তদন্ত রিপোর্টে অসঙ্গতি এবং পুলিশের অতি সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে তাঁরা যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, আদালতের পর্যবেক্ষণেও তা ধরা পড়েছে।

মৃতার তিন ছেলে।

তবে শুধু চিকিৎসক মহল নয়, আজকের রায়ে খুশি প্রকাশ করেছেন মৃতা মীনা ছেত্রীর পরিবারও। তাঁর বড় ছেলে উদয় ছেত্রী জানিয়েছেন, নতুন করে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশে তাঁরা খুশি। এতে আসল সত্য উদঘাটন হবে এবং তাঁরা সুবিচার পাবেন।

স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী আইন সংশোধন করে ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইন ২০১৭ এনেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল স্বাস্থ্যপরিষেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের নিত্য দিনের অগুনতি অভিযোগের অবসান। সেই আইনের সম্ভবত প্রথম প্রয়োগ হওয়ায় জলপাইগুড়ির মেরিনা নার্সিংহোমের এই মামলার দিকে তাকিয়ে গোটা রাজ্যের মানুষ এবং চিকিৎসক মহল। কারণ, আইনের প্রয়োগ এবং উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে তা এই মামলার পরিণতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here