ইন্দ্রানী সেন ও শ্রয়ণ সেন:

শুক্রবার- ৭৬ মিমি

শনিবার-২৭৪ মিমি

রবিবার- ১১০ মিমি

সোমবার (রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত)- ১০৩ মিমি

নিম্নচাপ এবং মৌসুমী অক্ষরেখার জোড়া ফলায় গত তিন দিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে বাঁকুড়া জেলায়। বাঁকুড়া শহরে বৃষ্টি অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। জুলাই মাসে বাঁকুড়ায় বৃষ্টি হওয়ার কথা ৩৮৪ মিমি, কিন্তু সোমবার দুপুর আড়াইটে পর্যন্ত গত ৮৪ ঘণ্টাতেই বাঁকুড়ায় বৃষ্টি হয়েছে ৫৬৩ মিমি। তবে শুধু এই তিন দিন নয়, এই বছর বর্ষার শুরু থেকেই মাঝেমধ্যেই আকাশভাঙা বর্ষণ হচ্ছে বাঁকুড়ায়। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯ জুন। সে দিন বাঁকুড়া শহরে ১৭৭ মিমি রেকর্ড করা হয়। গত ১১ জুলাই ৮০ মিমি বৃষ্টি হয়েছিল বাঁকুড়ায়। এর পাশাপাশি কমবেশি দশ থেকে কুড়ি মিলিমিটারের বৃষ্টি তো লেগেই রয়েছে।

গত দেড় মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি পাওয়ার ফলে জেলার নদীগুলি এমনিতেই টইটম্বুর হয়ে উঠেছিল। গত তিন দিনের বৃষ্টিতে এ বার বাঁধ ভেঙে তারা উপচে পড়ছে। শিলাবতী, কংসাবতী, দামোদর,দ্বারকেশ্বর, শালি-সহ জেলার সব কটি নদীতেই জল বেড়েছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

ব্রিজের ওপর দিয়ে বইছে শিলাবতী, তালডাংরার কাছে

জেলার সব থেকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হয়েছে কোতুলপুর ব্লক এলাকায়। এখানে আমোদরের জল বেড়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় জল ঢুকতে শুরু করেছে। জয়রামবাটি সংলগ্ন গ্রামগুলিও জলমগ্ন হয়ে পড়েছে বলে খবর। রাস্তার উপর দিয়েও নদীর জল বইতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও আবার জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে কাঁচা রাস্তা। ব্রহ্মডাঙা, শিরোমণিপুর এবং লেগো অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে জল জমতে শুরু করায় আতঙ্কে গ্রামের বাসিন্দারা।

কোতুলপুরে।

বিষ্ণুপুরের ইন্দাস, পাত্রসায়র ব্লকের বেশ কিছু অংশ জলের তলায়। ইন্দাসে দামোদর ও শালি নদী সংলগ্ন ভগবতীপুর পাত্রগাঁটি, গোকুলচক, ভাবাপুর মঙ্গলপুর, বেতালন ও নাগাতেঁতুল অঞ্চলে বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জল। ব্লকের বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলির মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইন্দাসের বিডিও সুচেতনা দাস। তাঁর কথায়, “পঞ্চায়েত স্তরে বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে, ইন্দাস ব্লকের ভগবতীপুর এলাকার উপর বিশেষ নজর রাখছে প্রশাসন। বিলি করা হচ্ছে ত্রিপল।” প্রশাসনের কাছে একটাই স্বস্তির খবর যে সারা জেলা থেকে এখনও কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

ইন্দাস ব্লকে

বাঁকুড়ায় কেন এত বৃষ্টি

জুন থেকে এখনও পর্যন্ত বাঁকুড়ায় বৃষ্টি হয়েছে ১০৩৯ মিলিমিটার। স্বাভাবিকের থেকে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। অতি বৃষ্টির ফলে বাঁকুড়া হয়ে উঠেছে বাংলার চেরাপুঞ্জি। এর পেছনে কারণ কী?

বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা ওয়েদার আল্টিমার কর্ণধার রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা মনে করেন, এর পেছনে আবহাওয়াগত কারণ থাকার পাশাপাশি বাঁকুড়ার ভ্রূ-প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অনেকটা দায়ী। তাঁর কথায়, “অন্য বছরের তুলনায় এ বছর মৌসুমী অক্ষরেখা বাঁকুড়ার ওপর দিয়ে একটু বেশিই বিস্তৃত রয়েছে। এর ফলে গত দেড় মাস ভালো বৃষ্টি হয়েছে। সেই অক্ষরেখা এখনও বাঁকুড়ার ওপরে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে এ বারের নিম্নচাপটি।”

ভ্রূ-প্রকৃতিগত কারণ বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, “সমুদ্রতল থেকে বাঁকুড়ার গড় উচ্চতা ৭৮ মিটার, অন্য দিকে পড়শি পুরুলিয়ার উচ্চতা ২৪০ মিটার। জলভরা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ যখন পশ্চিম দিকে সরতে শুরু করে তখন এই বাঁকুড়া পেরোনোর পর, উচ্চতার জন্য পুরুলিয়ায় ঢুকতে পারে না। সেই মেঘ বাঁকুড়ার ওপরে ভেঙে যায়, এর জন্যই বাঁকুড়ায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এত বেশি।”

বর্তমানে নিম্নচাপটি আরও কিছুটা শক্তি বাড়িয়ে অবস্থান করছে মুর্শিদাবাদ এবং সংলগ্ন ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে। নিম্নচাপটির যা গতিপ্রকৃতি, তাতে আগামী ২৪ ঘণ্টাতেও তার বিশেষ নড়নচড়নের সম্ভাবনা দেখছেন না আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। নিম্নচাপটি যত দিন থাকবে তত দিন বাঁকুড়া এবং রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বৃষ্টি চলবে।

এখানেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে প্রশাসনিক কর্তাদের। বৃষ্টি যদি বন্ধ না হয় তা হলে বন্যা পরিস্থিতি ঘোরালো হবে বলে আশঙ্কা। মানুষের এখন একটাই প্রার্থনা, কবে থামবে এই বৃষ্টি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here