শ্রয়ণ সেন

‘ছোড়দা ছিলেন বিজ্ঞমান মূর্খ,’ ‘বীরেনদা ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী।’ অনুষ্ঠানের মূল সূত্র এ ভাবেই বেঁধে দিলেন পীযুষ রায়চৌধুরী এবং রতনলাল বিশ্বাস।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুই প্রজন্মের দুই পর্বতারোহী বিদ্যুৎ সরকার এবং বীরেন সরকারকে স্মরণ করলেন পাহাড়প্রেমীরা। হিমালয়ান ক্লাব এবং পাহাড়িয়া গ্রুপের উদ্যোগে হল এই অনুষ্ঠান।

দুই প্রজন্মের দুই পর্বতারোহী ছিলেন বীরেন সরকার এবং বিদ্যুৎ সরকার। বীরেনবাবুর পর্বতারোহণ শুরু ষাটের দশকে আর সকলের কাছে ছোড়দা হিসেবে পরিচিত বিদ্যুৎবাবু পাহাড়ে চড়া শুরু করেন তার এক দশক পর।

প্রথমে আসি বিদ্যুৎবাবুর কথায়। কেন তিনি বিজ্ঞমান মূর্খ, সেটাও অবশ্য পরিষ্কার করে দিলেন পীযুষবাবু।

“একটা মানুষ কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছাড়াই স্রেফ নিজের ইচ্ছেতে বাংলার পর্বতারোহণকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না। পাহাড়প্রেমীরা ছাড়া কারও কাছে সে ভাবে পরিচিতই নন তিনি,” আক্ষেপ যাচ্ছে না পীযুষবাবুর।

পর্বতারোহণকে একটা অন্য আঙ্গিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। সফলও হয়েছিলেন।

আরও পড়ুন ভ্রমণ নিয়ে লেখালেখি করেন? তা হলে যোগ দিন এই কর্মশালায়

১৯৭৬-৭৭ সালে প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে ট্র্যান্স হিমালয়ান ট্রেক করেছিলেন ছোড়দা। ট্র্যান্স হিমালয়ান ট্রেক কী?

পাহাড়ে ট্রেকিং করতে করতেই একবার তাঁর মাথায় এল, হিমালয়ের পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত যদি হাঁটা যায়, তা হলে কেমন হয়। যেমন কথা তেমনই কাজ।

লাদাখের কার্গিল থেকে অরুণাচলের বমডিলা পর্যন্ত একনাগাড়ে হেঁটে ছিলেন তিনি। হিমালয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, যে হেঁটে যাওয়া যায়, কোনো পর্বতারোহী জানতেন না। সেটাই করে দেখালেন ছোড়দা। কিন্তু কোনো স্বীকৃতি পাননি তিনি। কেন?

“ওই যে ছোড়দা পিঠ চুলকোতে জানতেন না।” বললেন পীযুষবাবু।

বক্তব্য রাখছেন রতনলাল বিশ্বাস।

বিদ্যুৎবাবু কখনও কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে পাহাড়ে যেতেন না। শুধু নিজের জন্যই যেতেন তিনি। আর তাই মাঝেমধ্যেই বলে উঠতেন, “আমি হিমালয়ে যাই ভালোবেসে, নাম কামানোর জন্য থোড়ি যাই। হিমালয় আমার মামাবাড়ি।”

আর কত কী ছোড়দা করেছিলেন, এক এক করে বলে গেলেন পীযূষবাবু। কচিকাঁচাদের নিয়ে নেচার স্টাডি ক্যাম্প শুরু করেছিলেন বিদ্যুৎবাবু। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে তিনি করেছিলেন, সেটা সফল হয়নি এমনই দাবি পীযূষবাবুর।

এক সময়ে চেয়েছিলেন পুরুলিয়ায় নেচার স্টাডি ইনিস্টিটিউট করবেন। জমিও কিনেছিলেন। কিন্তু সেটা আর হল না। পীযূষবাবুর কথায়, “ওই যে পিঠ চুলকোতে জানতেন না ছোড়দা।”

সঠিক সময়ে সঠিক লোকের কাছে পৌঁছোতে পারেননি বিদ্যুৎবাবু। পীযূষবাবু বলে চলেন, “ছোড়দা অভিযাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিব্রাজক।”

আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গের সাফারি বুকিং করুন এ বার অনলাইনে

শেষ দিকে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বিদ্যুৎবাবু। তখন তাঁর কাছের মানুষজনও ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে শুরু করেছিলেন।

এক বর্ণময় অথচ স্বীকৃতিহীন মানুষ। প্রথম ট্র্যান্স হিমালয়ার ট্রেকার, কিন্তু কেউ তাঁকে চেনেন না। গুগুলে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

আক্ষেপের সুরে নিজের বক্তব্য শেষ করতে গিয়ে, এক রাশ নিস্তব্ধতা রোটারি সদনের হলে।

বিদ্যুৎ সরকারের থেকে এ বার বীরেন সরকারকে স্মরণের পালা। বিদ্যুৎবাবুর থেকে প্রায় বছর দশকের বড়ো হলেও, প্রায় একই সঙ্গে মারা গিয়েছেন দু’জনে।

বিদ্যুৎবাবু যদি বিজ্ঞমান মূর্খ হন, তা হলে বীরেনবাবু ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী। এমনই ফুটে উঠল রতনলাল বিশ্বাসের কথায়।

৬০-এর দশক থেকে একের পর এক পর্বতাভিযান করেছেন বীরেন সরকার। সেই সঙ্গে লিখে ফেলেছেন একের পর এক বই। এদের মধ্যে রহস্যময় রূপকুণ্ড বইটি আজও জনপ্রিয়।

৮০-এর দশক থেকে সখ্যতা ছিল রতনবাবু এবং বীরেনবাবুর মধ্যে। দু’জনেই সহকর্মী। রতনবাবুর কথায়, “বীরেনদার মতো পড়াশোনা করা লোক খুব কমই রয়েছে।”

বটানির ছাত্র না হয়ে হিমালয়ের ফুল বইটি তিনি যে ভাবে লিখেছিলেন সেটা আজও ভাবায় রতনবাবুকে। তাঁর কথায়, “বীরেনদা তো সব সময়েই ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়ে থাকতেন।”

শুধু পীযূষবাবু বা রতনবাবুই নন। এই দুই পর্বতারোহীকে স্মরণ করলেন, অমূল্য সেন, বনভূষণ নায়েক, বসন্ত সিংহরায়ের মতো প্রবাদপ্রতিম সব ব্যক্তি।

বসন্ত সিংহরায়ের ছোড়দা স্মরণ

একটাই আক্ষেপ থাকল। দুই কিংবদন্তীকে স্মরণের অনুষ্ঠানে লোক যেন বড্ড কম। কেন কম, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই শেষ হল অনুষ্ঠান।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here