কামারপুকুরের লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণ

0
কামারপুর লাহাবাড়ি।
কামারপুর লাহাবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের সূত্র ধরেই হুগলির কামারপুরের লাহা পরিবার বাঙালির কাছে খুবই পরিচিত নাম। জমিদারের অত্যাচারে দেরে গ্রাম ছেড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ তথা গদাধরের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় যখন কামারপুকুরে এসে বসতি স্থাপন করেন তখন তাঁর পাশে বন্ধুর মতো দাঁড়িয়েছিলেন লাহাবাড়ির ধর্মদাস লাহা।

লাহাবাড়ির কয়েক শতাব্দী প্রাচীন দুর্গাপুজো নতুন করে শুরু হয়েছিল এই ধর্মদাস লাহারই হাত ধরে। আর এই লাহাবাড়ির পুজোতেই মাতৃপ্রতিমায় চক্ষুদান করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। তখনও তিনি অবশ্য শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হননি, তখনও তিনি গদাধর চট্টোপাধ্যায় তথা গদাই।

শোনা যায়, কামারপুরের লাহাবাড়ির দুর্গাপূজার বয়স নাকি আনুমানিক সাড়ে চারশো বছর। মাঝে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর তা আবার চালু হয় ধর্মদাস লাহার সময়ে, একাদশ বঙ্গাব্দের শেষ দিকে বা দ্বাদশ বঙ্গাব্দের গোড়ায়। পুজো কী ভাবে ফের চালু হল তার একটি কাহিনি আছে।

জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদে একবার মামলায় জড়িয়ে পড়েন ধর্মদাস লাহা। চুঁচুড়া আদালতে সেই মামলার শুনানিতে হাজিরা দিতে এক দিন চলেছেন গ্রামের মেঠোপথ ধরে। পথে ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নীচে বিশ্রাম নিতে শুরু করেন। সেই সময়ে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে মা তাঁকে বলেন, “মামলায় জয়ী হবি তুই, বাড়ি গিয়ে আমার পুজো শুরু করিস। খানাকুল থেকে দু’ জন পটুয়া যাচ্ছে।”

মামলায় সত্যিই জিতে যান ধর্মদাস এবং সেই আনন্দে মায়ের স্বপ্নাদেশের কথাও ভুলে যান তিনি। কিন্তু বাড়ি ফিরে চমকে যান। দেখেন খানাকুল থেকে দুই প্রতিমাশিল্পী হাজির। তাঁরা ধর্মদাসবাবুকে বলেন, “একটি মেয়ে এসে আমাদের বললে, এখানে দুর্গাপ্রতিমা গড়তে হবে। তাই আমরা এসেছি।”

সেই থেকেই শুরু লাহাবাড়ির দুর্গাপুজো। পুজো শুরু হওয়ার কয়েক বছর পরে ১২০২ বঙ্গাব্দে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

পুজো উপলক্ষ্যে চলছে নাড়ু তৈরি করা।

প্রথা মেনে এই দুর্গাপূজার কাঠামোপুজো শুরু হয় বিপত্তারিণী পুজোর দিন এবং ঘট উত্তোলন হয় মহালয়ার পরের দিন। প্রতিপদের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় মহাচণ্ডীর পুজো। আর এই পুজোর আরেকটি আকর্ষণ মহালয়ার দিন শুরু হওয়া যাত্রাপালা

পরিবারের সদস্যদের কথায়, মা দুর্গা যাত্রা শুনতে ভালোবাসতেন। সেই রীতি মেনে এখনও বংশ পরম্পরায় যাত্রাপালা হয়ে আসছে। মহালয়ার দিন থেকে আট দিনব্যাপী যাত্রাপালা চলে। যাত্রাশিল্পীরা বলেন, মা দুর্গার কাছে প্রথম যাত্রাপালার অনুষ্ঠান করলে সারা বছর তাঁদের খুব ভালো ভাবে কাটে।

লাহা পরিবারের সূত্রে জানা গেল, ঘট স্থাপনের দিন থেকে পুরোহিত মশাই মন্দিরেই থাকেন। বিভিন্ন কাজের সূত্রে যাঁরা বাইরে থাকেন তাঁরা সবাই পুজোর দিনগুলিতে মন্দিরে এসে উপস্থিত হন। সবাই মিলেমিশে একটা সুন্দর পরিবেশ গড়ে ওঠে পুজোর দিনগুলিতে।

লাহা পরিবারের সদস্য সংখ্যা আড়াইশো জনের উপর। পুজোর দিনগুলিতে বাড়ির সকলেই মন্দিরের প্রসাদ গ্রহণ করেন। নবমীর দিন এখানে কুমারীপূজা হয়।

লাহা পরিবারের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীরামকৃষ্ণের ছোটোবেলা। যে হেতু তাঁদের গ্রামের বাড়ির পুজো, তাই এই পুজোতে অংশ নিত রামকৃষ্ণের পরিবারও।

যে হেতু মহালয়ার পর থেকেই পুজো শুরু হয়ে যেত তাই দুর্গার চোখ আগেই আঁকা হয়ে যেত। একবার কোনো কারণে ঠাকুর রঙ করার কারিগর না আসায় গদাই মা দুর্গার চোখ এঁকে দিয়েছিলেন। ছবি আঁকায় তিনি বেশ পটু ছিলেন। তাই তাঁর নিপুণ হাতের গুণেই মায়ের চক্ষু দান হয়েছিল।

আরও পড়তে পারেন

সিঙ্গি গ্রামের ভট্টাচার্য বংশের ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো ‘মঠের বাড়ির দুর্গোৎসব’

হুগলির জোলকুলের ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজোর এ বার ২১৭ বছর

দু’ দিন পরেই বোধন, সাবর্ণদের আটচালাবাড়িতে শুরু হয়ে যাবে ৪১২তম বছরের দুর্গাপুজো

রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নির্দেশেই ১৭৫৭-য় শুরু হয়েছিল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজো

পাণ্ডবেশ্বরের নবগ্রামে তিন শরিকের পুজোয় মা দুর্গা আসেন ব্যাঘ্রবাহিনী রূপে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন