শ্রয়ণ সেন

“এ ভাবে ব্যবসা করলে এক দিন নৌকাসুদ্ধু জলে পড়ব।” চাঁচাছোলা ভাষায় বলে দিলেন সবজিবিক্রেতা ছায়া বেরা। মঙ্গলবার সন্ধের দানব-ঝড়ের স্মৃতি থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছেন না তিনি। বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, কী ভাবে কোনো রকমে নৌকা ধরে নিজেকে জলে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন।

অবশ্য ছায়াদেবী ব্যতিক্রমী কোনো ব্যক্তি নন, পাটুলি ভাসমান বাজারের অধিকাংশ ব্যবসায়ীর কথাই এক রকম। ছায়াদেবীর মতো চাঁচাছোলা ভাবে হয়তো কেউ বলছেন না, কিন্তু ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ঝড়ের সময়ে ঠিক কী অসহায় অবস্থাটাই তাঁদের হয়েছিল।

ভাসমান বাজারের কাছেই এই প্রতিবেদকের বাস। মঙ্গলবার প্রবল ঝড় যখন গোটা কলকাতায় তাণ্ডব চালাচ্ছে তখন বাড়ির জানলা থেকেই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে বাজারের অবস্থা। এ বছর এটাই অবশ্য প্রথম ঝড় নয়। মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরুতে বেশ কয়েকটি কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গিয়েছে কলকাতার ওপর দিয়ে। কিন্তু মঙ্গলবারের মতো ঝড়ের তাণ্ডব কোনোটারই ছিল না। থাকবেই বা কী করে! মঙ্গলবারের ঝড় যে স্বয়ং আয়লাকেও হার মানিয়ে দিয়েছে।

floating market kolkata storm
বাজারে নিত্যদিনের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে না।

নৌকোগুলো বাঁধা ছিল, তাই খুব টালমাটাল অবস্থা হয়তো হয়নি, কিন্তু ভেতরের ব্যবসায়ীদের কী অবস্থা হয়েছিল সেটা নিজের চোখেই বোঝা গিয়েছে। ঝড়ের দাপট কমার পরে বাজারে ঢোকার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু কাউকেই সে ভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারণ সবাই তখন নৌকোর নীচে সবজি রাখার জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। গাছ পড়েছে ভাসমান বাজারের ভেতরেও।

বাজারের খোঁজখবর নিতে বুধবার সকালে আবার হাজির। বাজার আজ ফাঁকা। অন্য দিন যে ব্যস্ততা দেখি তার ছিটেফোঁটাও আজ দেখা যাচ্ছে না। সকাল সাড়ে ন’টায় এ রকম ফাঁকা বাজার কল্পনা করা যায় না।

সকালের কয়েক দফা হালকা বৃষ্টির জন্য ক্রেতারা আজ বাজারমুখো হননি বলে জানালেন মাছবিক্রেতা রতন নস্কর। সেই সঙ্গে বললেন গতকালের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি। “কাল আমি কী ভাবে ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছি সেটা বলে বোঝাতে পারব না। নৌকা বাঁধা থাকায় বেশি দোলেনি, কিন্তু আমার তো চার দিক খোলা, বিশেষ করে উত্তর দিকটা। এক এক সময়ে মনে হচ্ছিল আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ভাগ্যিস মাছগুলোকে ঢুকিয়ে ফেলেছিলাম। নইলে আমার অনেক ক্ষতি হয়ে যেত।”

floating market kolkata storm
আবার যদি এরকম ঝড় আসে? মাছ কাটছেন রতনবাবু

তাঁর মাছ ঠিকঠাক রয়েছে বলে সে ভাবে ক্ষতি হয়নি ঠিকই, কিন্তু বাজারের মূল সময়ে যে ভাবে ঝড় তাঁর ব্যবসার ক্ষতি করে দিয়েছে তাতে তাঁর আক্ষেপ কিছুতেই যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “সবে তো বৈশাখ মাস শুরু। এ বার তো আরও ঝড় হবে, বৃষ্টি হবে, বর্ষাকাল আসবে। আমি বুঝতে পারছি না ব্যবসা কী করে হবে!” ভাসমান বাজার হওয়ার ফলে সাধারণ ভাবে তাঁর ব্যবসা কিছুটা কমে গিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রতনবাবুর কথায়, “আগে পুরোনো বাজারে আমি একবেলা বসতাম। এখন এখানে দু’বেলা বসেও আগের মতো ব্যবসা করতে পারছি না।”

তবে কারও ওপরেই বিশেষ ক্ষোভ নেই রতনবাবুর। যে ক্ষোভটা রয়েছে সবজিবিক্রেতা ছায়াদেবীর। তাঁর নৌকাটি অন্যদের থেকে একটু ফাঁকা জায়গায় হওয়ার ফলে ঝড়ের সময়ে পুরো অসহায় অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেন, “আমার মনে হচ্ছিল নৌকা নিয়ে আমায় ফেলে দেবে। আমি জলে পড়লে সাঁতরে বেরিয়ে আসব, কিন্তু আমার সবজিগুলোর কী হবে সেটা কী কেউ ভেবে দেখেছে!” প্রায় কুড়ি বছর ধরে পাটুলিতে ব্যবসা করা ছায়াদেবী আগে এ রকম কোনো ঝড় দেখেননি বলেও জানিয়ে দেন।

ঝড়টা কী ভাবে এসেছিল! বোঝাচ্ছেন ছায়াদেবী

ছায়াদেবীর দাবি, তাঁর নৌকোর উত্তর-খোলা দিকটায় যেন টিন লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেটা করা হবে না বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, “টিন লাগিয়ে দিলে ঝড়ের সময়ে অন্তত হাওয়াটা কোনো ক্ষতি করবে না আমায়। কিন্তু কেউ শুনবে না আমার কথা। শুনবেই বা কেন, টিন লাগালে তো নৌকার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে।” ছায়াদেবীর মতো অবস্থা হয়েছিল আরও এক সবজিবিক্রেতা জয়দেব বাগেরও।

মুদির দোকান থেকে সেলাইয়ের দোকান, সবারই এখন একটাই প্রশ্ন, এ ভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ব্যবসা হবে কী ভাবে!

কলকাতার বুকে এক অসাধারণ দ্রষ্টব্য স্থান হয়েছে পাটুলির এই ভাসমান বাজার। শুধু কলকাতা কেন, সারা ভারতেও বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে সে। এর জন্য রাজ্য সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ব্যবসায়ীদের এ রকম ক্ষতি কী ভাবে পূরণ করা যায়, সে ব্যাপারেও ভাবা উচিত প্রশাসনের।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here