সন্ধিপূজার সময় চৌষট্টি যোগিনীর উদ্দেশে ৬৪টি পদ্ম দেওয়া হয় হাওড়ার মল্লিক ফটকের ভট্টাচার্য পরিবারে

0

শুভদীপ রায় চৌধুরী

ইতিহাস ও ধারাবাহিকতা বঙ্গের সংস্কৃতিতে একটি অন্যতম বিষয়। সামনেই শারদীয়া উৎসব। এই মহোৎসবকে কেন্দ্র করে আপামর বাঙলি মেতে উঠছে উৎসবের আনন্দে। বনেদিবাড়ির ঠাকুরদালানও সেজে উঠছে উমার আগমনে। বনেদিবাড়িতে দশভূজা মহিষমর্দিনীর আরাধনা যেমন হয় নিষ্ঠার সঙ্গে তেমনই পরম্পরার রীতিনীতিও থাকে প্রবল। তেমনই এক বনেদিবাড়ি হল হাওড়ার মল্লিক ফটকের ভট্টাচার্যবাড়ি।

Loading videos...

হাওড়া জেলার বনেদিবাড়িগুলির মধ্যে অন্যতম হল ভট্টাচার্যবাড়ি। আন্দুলের শঙ্করী কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ভৈরবীচরণ বিদ্যাসাগরের (ভট্টাচার্য) পূর্বপুরুষ দক্ষিণ রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজভুক্ত নোয়াপাড়া অঞ্চলের শাণ্ডিল্য গোত্রীয় ‘ভট্টাচার্য’ উপাধিধারী বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের রঘুনাথ তর্কবাগীশ আন্দুলের দত্তচৌধুরী কর্তৃক সপরিবার প্রতিষ্ঠিত হন। এই রঘুনাথ তর্কবাগীশ শুরু করেছিলেন পরিবারে দুর্গার আরাধনা ১৬৫১ সালে।

আনুমানিক ১৭৬৫ সালে ভৈরবীচরণের কনিষ্ঠ পুত্র গোপীমোহন ভট্টাচার্য আন্দুলের সমস্ত সম্পত্তি ছেড়ে দিয়ে হাওড়া অঞ্চলের মল্লিক ফটকে চলে আসেন। আন্দুলের তৎকালীন জমিদার বসুমল্লিকদের দান করা ভদ্রাসনের ওপর তৈরি হয়েছিল ঠাকুরদালান সমেত বসতবাড়িও, কারণ মল্লিকদের গুরুবংশ ছিল ভট্টাচার্য পরিবার। এই ভাবেই হাওড়া অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মল্লিক ফটকের ভট্টাচার্যবাড়ি। এ ছাড়াও আন্দুলের দক্ষিণপাড়ায় এঁদের এক শাখা (প্রেমিক ভবন/মাঝের বাড়ি) আছে সেখানে আনুমানিক সতেরো শতকের সত্তর দশক থেকে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।

গোপীমোহনের দ্বিতীয় পুত্র রামনারায়ণের চারটি পুত্রসন্তানের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উমাচরণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বসতবাড়ি সংলগ্ন রাস্তাটি উমাচরণের নামেই চিহ্নিত করা হয় (ভট্টাচার্যবাড়ি তথা চ্যাটার্জিবাড়ির ঠিকানা: ১০নং উমাচরণ ভট্টাচার্য লেন, হাওড়া – ৭১১০০১)। আন্দুলের বাড়িতে পুজো শুরু হয় ১৬৫১ সালে এবং প্রাচীন পুজোটি স্থান পরিবর্তন করে মল্লিক ফটকের বাড়িতে চলে আসে আনুমানিক ১৭৬৫ সালে। মল্লিক ফটকের এই বাড়িতে বর্তমানে আর ভট্টাচার্যরা বসবাস করেন না, বসবাস করেন তাঁদের দৌহিত্র চট্টোপাধ্যায়রা।

উমাচরণের চার পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন বরদাচরণ ভট্টাচার্য। তিনি ১৮৬২ সালে বসতবাড়ির ঠিক বিপরীতেই হাওড়া রামকৃষ্ণপুর হাই স্কুল স্থাপন করেন। এই বরদাচরণের একটি মাত্র কন্যাসন্তান, নাম অভয়াবালা(১৮৭০-১৯৬২)। অভয়াবালার বিবাহ হয় হুগলি জেলার বৈদ্যবাটীর তৎকালীন জমিদার ক্ষিতিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র বাবু রমেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। অভয়াবালা দেবী বিবাহের পরও নিজের হাতে সামলাতেন পুজোর সমস্ত কাজ এবং অভয়াবালা দেবীর চার পুত্র পুজোর দায়িত্ব নিলেও ১৯৮৪-এর পর থেকে ভূপেন্দ্রনাথের বংশই সেই ভার কাঁধে নিয়েছিল। এই ভাবে মল্লিকফটকের ভট্টাচার্যবাড়ি তাঁদের দৌহিত্র চট্টোপাধ্যায়দের হয়ে যায়।

এই বাড়িতে দেবী সিংহবাহিনী দশভূজা, সঙ্গে রয়েছেন তাঁর চার সন্তান অর্থাৎ সেই সাবেকি ডাকের সাজের প্রতিমাই তৈরি হয় ভট্টাচার্যবাড়িতে। এই বাড়ির পুজো শুরু হয় রথযাত্রার দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। তার পর শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে ঘট বসিয়ে চণ্ডীপাঠ হয়। এই বাড়ির পুজো হয় কালিকাপুরাণ মতে, দক্ষিণাচারী তান্ত্রিক পদ্ধতি মেনেই। অতীতে মহিষবলি ও পাঁঠাবলি হত। বর্তমানে পশু বলিদান বন্ধ, তবে প্রতীকী বলিদান হয় সেই পুরাতন খাঁড়া দিয়ে।

দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন ঠাকুরদালানেই নবপত্রিকার স্নান হয়। তার পর বরণ করে নবপত্রিকাকে স্থাপন করা হয়। পুজোর সব ক’টি দিনে অন্নভোগ দেওয়া হলেও সন্ধিপূজার সময় লুচিভোগ দেওয়া হয় দেবীকে এবং এই সময়ে একটি বিশেষ পূজা হয়। চৌষট্টি যোগিনীর পূজা, যাতে ৬৪টি পদ্ম নিবেদন করা হয়। মহানবমীর দিন কুমারীপুজো হয় এবং দশমীর দিন ভট্টাচার্যবাড়িতে কনকাঞ্জলি প্রথাও পালিত হয়।

এই বাড়ির প্রতিমা সকাল ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বিসর্জন হয় এবং হাওড়া অঞ্চলের বনেদিবাড়ির মধ্যে এই ভট্টাচার্যবাড়ির প্রতিমাই প্রথম নিরঞ্জন হয়। এই ভাবে ঐতিহ্যের সঙ্গেই আজও পুজো করে আসছেন মল্লিক ফটকের ভট্টাচার্যবাড়ির সদস্যরা।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

দশমীতে মাছপোড়া খেয়ে নিয়ম ভঙ্গ করে পশ্চিম বর্ধমানের খান্দরার সরকার পরিবার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.