করোনা-বিধি মেনে শিবরাত্রির উৎসব পালিত হচ্ছে বালির কল্যাণেশ্বর শিবমন্দিরে

0

শুভদীপ রায় চৌধুরী

আজ শিবরাত্রি। শিবরাত্রির ব্রত পালন করছেন অনেকেই, বিশেষ করে মেয়েরা।  বিভিন্ন মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তরা ভিড় করছেন। বালির কল্যাণেশ্বর শিবমন্দিরও এর ব্যতিক্রম নয়। করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখে শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে মন্দিরে পুজো দিচ্ছেন ভক্তরা।

Loading videos...

হাওড়া জেলার বালিতে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে অবস্থিত এই মন্দির বেলুড় মঠ থেকে খুব দূরে নয়। কাছেই গঙ্গা প্রবাহিত। প্রচলিত লৌকিক কাহিনি অনুসারে এই মন্দির পাণ্ডবদের প্রতিষ্ঠিত। তবে ইতিহাস বলে, এই মন্দিরের বয়স প্রায় ৬০০ বছর। মন্দিরের দু’টি অংশ – সামনে বড়ো বড়ো থামযুক্ত নাটমন্দির এবং তার পিছনে আটচালা গঠনশৈলীর মূল মন্দির।  

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শিষ্য-ভক্তদের প্রায়ই কল্যাণেশ্বর শিবমন্দিরে আসতেন এবং শিবের পুজো করতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কল্যাণেশ্বরকে ‘জ্যান্ত শিব’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ঠাকুরের আগমনের সূত্র ধরে প্রতি বছর শিবরাত্রির দিন রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজরা এই মন্দিরে উপস্থিত হন এবং বাবা কল্যাণেশ্বরের পুজো করেন। এ বারেও তার অন্যথা হচ্ছে না।

কল্যাণেশ্বর শিব প্রতিষ্ঠিত নন, তিনি স্বয়ম্ভুলিঙ্গ। যে শিবলিঙ্গ কোন মানুষ দ্বারা নির্মিত নয় বা যার মূল দেখতে পাওয়া যায় না তিনিই স্বয়ম্ভু। মন্দিরের গর্ভগৃহের মেঝেতে রয়েছে একটি শ্বেতপাথরের বেদি। বেদির মাঝে আটকোনা গর্ত, তার ভিতরে কালো পাথরের অমসৃণ শিবলিঙ্গ। মেঝেতে বসে একটু ঝুঁকে লিঙ্গ স্পর্শ করতে হয়।

গর্তের ভিতরে স্বয়ম্ভু লিঙ্গ।

কিন্তু এখানে কী করে আবির্ভূত হলেন স্বয়ম্ভু লিঙ্গ? এর পিছনে যে কাহিনি আছে, তা খুবই প্রচলিত। বিভিন্ন স্বয়ম্ভু লিঙ্গের আবিষ্কারের সঙ্গে এই বহুল প্রচলিত কাহিনিটি জড়িত। এখানেও সেই কাহিনি শোনালেন মন্দিরের সেবায়েত মৃন্ময় রায় চৌধুরী।

তিনি জানালেন, এক সময়ে এই বালি অঞ্চল বেতবনে পরিপূর্ণ ছিল। এই বেতবনের কিছু দূরে এক গোয়ালা বাস করতেন। তাঁর একটি গোরু রোজ সকালে ছাড়া পেলেই সেই বনে চলে যেত এবং খানিকক্ষণ পরে ফিরে আসত। গোরুটি ফিরে এলে গোয়ালা আর দুধই পেতেন না। গোয়ালা এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখলেন, গোরুটি একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর দুধ ঢালছে। সেই প্রস্তরখণ্ডের মাথায় একটি মণি জ্বলজ্বল করছে। বিস্মিত গোয়ালা গোরুটিকে ঘরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখলেন। সেই দিন রাতেই স্বপ্নাদিষ্ট হন গোয়ালা। মহাদেব তাঁকে আদেশ করলেন, “বাছা, তুমি তোমার গাভীকে বেঁধে রেখো না, সে প্রতি দিন আমার মাথায় দুধ ঢেলে যায়। আমি এখানে কল্যাণেশ্বর রূপে বিরাজমান।” সেই থেকে গোয়ালা নিজের সাধ্যমতো বাবার সেবা করতে থাকেন এবং প্রসঙ্গত বলা যায়, বাবা কল্যাণেশ্বরের প্রথম সেবায়েত সেই গোয়ালাই। তার পরে এক ভণ্ড সাধুর চোখে পড়ে সেই মণি-যুক্ত শিবলিঙ্গটি। সে অর্থের লোভে সেই মণিটি তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।

সেই সময়ে এই অঞ্চলের ছয়আনি জমিদার ভগবতী প্রসন্ন রায় বাবার একটি মন্দির নির্মাণ করে দেন এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন মানুষের সহায়তায় গড়ে ওঠে বালির কল্যাণেশ্বর শিবমন্দির। লোককথায় জানা যায়, তৎকালীন সময়ে মানসিংহ এসেছিলেন বাবা কল্যাণেশ্বরকে দর্শন করতে।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ঠিক কবে প্রথম কল্যাণেশ্বর-দর্শনে এসেছিলেন তা বলা না গেলেও তিনি যে বহু বার এসেছেন এই মন্দিরে, তার বহু সাক্ষ্য পাওয়া যায় তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্তদের লেখনীতেই। স্বামী ব্রহ্মানন্দ তখন ঠাকুরের রাখালরাজ। কল্যাণেশ্বর দর্শনে এসেছিলেন ঠাকুরের সঙ্গে। সে বার কল্যাণেশ্বর দর্শন করে ঠাকুরের সমাধি হয়। স্বামী ব্রহ্মানন্দ লিখেছিলেন, “কল্যাণেশ্বরকে দর্শন করে ঠাকুরের সমাধি হয়েছিল, তিনি কখনও ঠাকুরের এমন সমাধি দেখেননি।”

ঠাকুর কল্যাণেশ্বরকে দেখে বলেছিলেন, “এর জড় কাশী অবধি চলে গেছে।” শুধুমাত্র ঠাকুরই নন, এই মন্দিরে এসেছিলেন শ্রীশ্রীমা সারদাদেবী, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে রামকৃষ্ণ মিশনের বহু মহারাজ। একটি প্রচলিত প্রথা রয়েছে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে, তা হল প্রতি সোমবার বেলুড় মঠ থেকে একজন সন্ন্যাসী আসেন বাবা কল্যাণেশ্বরকে পুজো করতে। এই প্রথা আজও অব্যাহত রয়েছে।

কল্যাণেশ্বর শিবমন্দিরে সিদ্ধেশ্বরী কালী

কল্যাণেশ্বর মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে আরও মন্দির – মা সিদ্ধেশ্বরী কালী, শ্রীবিষ্ণু, গণেশ, হনুমানজির মন্দির। শিবমন্দিরের সামনে রয়েছে ঘাটবাঁধানো বিশাল পুকুর। শিবরাত্রি ছাড়াও এখানে দুর্গাপুজো, দীপান্বিতা কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়।

মৃন্ময়বাবু জানালেন, শিবরাত্রির ব্রত শুরু হওয়ার আগে থেকেই ভক্তরা উপস্থিত হয়ে যান মন্দিরে এবং চতুর্দশী তিথি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাবার মাথায় জল ঢালা শুরু হয়ে যায়। শিবরাত্রির দিন সারা রাত ভক্তদের ভিড় থাকে এবং শেষ প্রহরে বাবার একটি বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি আরও বলেন, নিত্যপূজায় সকালে চালের নৈবেদ্যভোগ এবং সন্ধ্যায় লুচিভোগ নিবেদন করা হয়। কেবলমাত্র চড়কের দু’ দিন আগে বাবার অন্নভোগ হয়।

মৃন্ময়বাবু জানালেন, গত বছর করোনা ভাইরাসের কারণে মন্দিরে প্রবেশ বন্ধ ছিল। তবে এ বছর শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে ভক্তদের মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। মন্দিরে সব কিছুই পালন করা হচ্ছে সমস্ত প্রশাসনিক নিয়মবিধি মেনে।

আরও পড়ুন: সাবর্ণদের প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরে শিবরাত্রির আয়োজন   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.