talks between striking students and the enquiry committee

নিজস্ব সংবাদদতা, জলপাইগুড়ি : টানা সতেরো দিন আন্দোলনের পর অবশেষে কাটল অচলাবস্থা। সোমবার থেকে স্বাভাবিক হতে চলেছে জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। উচ্চশিক্ষা দফতরের তদন্ত কমিটির সঙ্গে দফায় দফায় দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘন্টা আলোচনার পর এল প্রত্যাশিত বার্তা। যদিও আলোচনার মাঝপথে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হওয়ায় আদৌ আন্দোলন উঠবে কি না তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল সংশয়।

উচ্চশিক্ষা দফতরের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি রবিবার আসে জলপাইগুড়িতে। এ দিন বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ কমিটির সদস্যরা জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসে আসেন। এই কমিটিতে রয়েছেন কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেবকুমার মুখোপাধ্যায়, উচ্চশিক্ষা দফতরের কারিগরি বিভাগের সচিব ডাঃ অমলেন্দু বসু ও যুগ্ম সচিব প্রণবেশ দাস, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজের অধ্যাপিকা শ্রীপর্না ব্যানার্জি এবং জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলাশাসক সুমেধা প্রধান।

প্রথমেই ডেকে পাঠানো হয় চতুর্থ বর্ষের ছাত্রদের। তার পর একে একে তৃতীয়, দ্বিতীয়, এবং প্রথম বর্ষের ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠক হয় অধ্যক্ষ ডাঃ অমিতাভ রায়, কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গেও। আন্দোলনরত ছাত্ররা অধ্যাপক দীপক কুমার কোলের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ জানায়। প্রথম বর্ষের ছাত্ররাও র‍্যাগিং নিয়ে তাদের অভিযোগের কথা তুলে ধরে। সমস্ত রকম কাজকর্ম বন্ধ থাকায় কলেজের কী ক্ষতি হচ্ছে তা-ও অধ্যক্ষ এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শোনেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

তবে বেশ কিছু বিষয় ঘিরে জট দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায় যে বৈঠকে হওয়া সদর্থক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঠিক হয়েছিল, প্রতিটি বর্ষের দশজন ছাত্র প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলবে কমিটি। কিন্তু তার বাইরেও বিভিন্ন বর্ষের বেশ কিছু ছাত্র তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলতে আসে। এই নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আন্দোলনরত ছাত্রদের অভিযোগ কলেজের অধ্যক্ষ এবং অন্য অধ্যাপকরা প্রভাব খাটিয়ে ওই ছাত্রদের নিয়ে এসেছেন। ওই ছাত্রদের দিয়ে তদন্ত কমিটির কাছে আন্দোলন নিয়ে ভুল বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে আন্দোলনরত ছাত্র সৌজন্য সাহা।

quarrel between striking students and the principal
ছাত্রদের সঙ্গে অধ্যক্ষের বচসা।

যদিও অধ্যক্ষ ডাঃ অমিতাভ রায় জানিয়েছেন, ওই ছাত্ররা নিজেদের তাগিদেই কলেজের বর্তমান অচলাবস্থায় কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তদন্ত কমিটির কাছে তা সবিস্তার জানাতে এসেছিল, এখানে কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো ভূমিকা নেই। গোটা বিষয় নিয়ে অধ্যাপকদের সঙ্গে ছাত্রদের বাগবিতণ্ডার জেরে একটা উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি ঘোরালো হচ্ছে দেখে তদন্ত কমিটির ডাকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইন্দিরা মুখার্জির নেতৃত্বে পুলিশ ও র‍্যাফ মোতায়েন করা হয় সার্কিট হাউসে। পুলিশ বিক্ষোভরত ছাত্রদের সরিয়ে দেয়। ক্ষিপ্ত ছাত্ররা জানায়, তদন্ত কমিটির সঙ্গে সব রকম সহযোগিতা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা একেবারেই সন্তোষজনক নয়। শুভাশিস চন্দ নামে এক ছাত্র জানায়, তদন্ত কমিটির সঙ্গে সদর্থক আলোচনার পরও যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে এই মুহূর্তে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে তারা।

বস্তুত আলোচনায় বসার আগেই তদন্ত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে রবিবার বিকেলে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল ছাত্ররা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৈঠক শেষে আন্দোলন প্রত্যাহার নিয়ে ছাত্রদের নেতিবাচক বক্তব্য ফের জটিলতা তৈরি করে দেয়।

কলেজের অধ্যাপক দিলীপ কুমার কোলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণের দাবিতে গত ১৬ মার্চ আন্দোলন শুরু হয়। ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয় অনশন। পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেবের হস্তক্ষেপেও সেই আন্দোলন ওঠেনি। এর মধ্যেই আন্দোলনরত ছাত্রদের বিরুদ্ধে র‍্যাগিং-এর অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে সেই র‍্যাগিং-এর ঘটনা ধামাচাপা দিতেই এই আন্দোলন। থানাতেও র‍্যাগিং এবং হস্টেল ভাঙচুরের অভিযোগ দায়ের হয়। তাতে কিছুটা কোণঠাসা হলেও তাদের অবস্থানে অনড় ছিল আন্দোলনরত ছাত্ররা।

অবশেষে চলতি সপ্তাহে হওয়া একটি বৈঠকে প্রশাসনের তরফে ছাত্রদের জানানো হয় শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি তৈরি হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠিত হওয়া খবরে কিছুটা আশার আলো দেখা দেয়। আন্দোলনরত ছাত্ররাও অনেকটাই নরম হয়। সেই কমিটির সদস্যরাই রবিবার জলপাইগুড়ি আসেন সব পক্ষের বক্তব্য শুনতে।

কিন্তু বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বৈঠকের পরও জট সম্পূর্ণ কাটে না।

যদিও আশাবাদী ছিলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। কমিটির প্রধান উপাচার্য দেবকুমার মুখোপাধ্যায় জানান, তাঁরা সব পক্ষের কথা শুনেছেন, এখান থেকে পাওয়া সব তথ্য জানাবেন রাজ্য সরকারকে। সোমবার থেকেই কলেজে পঠনপাঠনের পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই ভাবে কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ অমিতাভ রায় জানান, তদন্ত কমিটির নির্দেশ মেনে তাঁরা আগামী কাল কলেজে যাবেন। কলেজের অচলাবস্থা কেটে যাবে বলেই আশা প্রকাশ করেন তিনিও।

prof. dipak kumar koley
অধ্যাপক দীপক কুমার কোলে।

এ দিকে আন্দোলনরত ছাত্ররা কলেজে ফিরে গিয়ে ফের নিজেদের মধ্যে বৈঠকে বসে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বৈঠকের পর তাদের তরফ থেকে ইতিবাচক সাড়া আসে। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ তাদের তরফে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা জানানো হয়। আন্দোলনরত ছাত্রদের পক্ষে শুভাশিস চন্দ জানায়, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং তদন্ত কমিটির সদর্থক ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়ে তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

এই বার্তা আসার পরই আশংকার কালো মেঘ কেটে যায়। জলপাইগুড়ি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মতো একটি নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠনের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসার বার্তায় খুশি কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে শিক্ষানুরাগী মহল।

যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ছাত্ররা ১৭ দিন ধরে আন্দোলন চালাল, সেই অধ্যাপক দীপক কুমার কোলে এত দিন পরে জনসমক্ষে এলেন। তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাঁর সঙ্গেও কথা বলেন। অধ্যাপক কোলে জানান, তিনি কমিটির সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। তবে কমিটিকে তিনি কী বলেছেন তা সাংবাদিকদের জানাতে চাননি।

এ দিকে মূল দাবি না মিটলেও তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলে সন্তুষ্ট ছাত্ররা। এর পর আন্দোলন তুলে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না বলে মনে করছে শিক্ষানুরাগী মহল।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন