রাজা কংসনারায়ণের উত্তরপুরুষরা পরিবারের প্রাচীন অষ্টধাতু-দুর্গার পুজো করছেন জলপাইগুড়ির পাণ্ডাপাড়ায়

0
রাজা কংসনারায়ণের পরিবারের অষ্টধাতুর দুর্গা। ছবি সংগৃহীত।

জলপাইগুড়ি: অনেক সময়ই দুর্গাপুজোর সঙ্গে বারো ভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম উঠে আসে। কংসনারায়ণের অনেক কাল আগে থেকেই বঙ্গদেশে দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। কিন্তু কংসনারায়ণ যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বঙ্গদেশে যে দুর্গোৎসবের সূচনা করেছিলেন, তা বাঙালি সমাজে কিংবদন্তি তৈরি করেছিল। শোনা যায়, ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা কংসনারায়ণ প্রায় নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে দুর্গাপূজা করেছিলেন।

তার পর থেকেই কংসনারায়ণ রীতি সমগ্র বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এক চালার দুর্গাপ্রতিমা। এই চালির উপরের দিকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং নীচে গণেশ ও কার্তিক থাকেন। প্রতিমার পেছনে অর্ধ চন্দ্রাকার চালচিত্র। এই চালচিত্রে মূলত দশমহাবিদ্যা ও মহাদেবের অবস্থান। এই ধরনের চালিকে বাংলা চালি বলা হয়। এই রীতির প্রতিমার মুখের আদল অন্য রকম। দেবী প্রতিমার টানাটানা চোখ ও টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক হয়। দেবীর দুই গাল সামান্য চাপা থাকে। এই ধরনের মুখের আদলকে বলা হয় বাংলা মুখ। দেবী প্রতিমার বর্ণ গাঢ় হলুদ।

তবে কংসনারায়ণের কুলে অষ্টধাতুর দুর্গাবিগ্রহ ছিল। তৎকালীন রাজশাহীর রাজা কংসনারায়ণ রায়ের সেই বিগ্রহই বর্তমানে রয়েছে জলপাইগুড়ির পাণ্ডাপাড়া কালীবাড়ি এলাকার চক্রবর্তী পরিবারে। বিগ্রহের ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিচারে রাজ্যের সব চেয়ে প্রাচীন পুজো তাঁদেরই। বাদশাহ হুসেন শাহের আমল থেকেই এই অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি পূজিত হয়ে আসছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

বাংলাদেশের হরিপুরের পাবনায় এই পুজোর সূচনা করেন কংসনারায়ণের ছেলে মুকুন্দরাম রায়। সেই সময় হুসেন শাহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পরে বিগ্রহ নিয়ে টাঙ্গাইলে আসেন মুকুন্দরাম। রাজা শ্রীহট্ট সেনের বাড়িতে রাজচক্রবর্তী উপাধি নিয়ে বসত শুরু করেন। শোনা যায় এই বিগ্রহটি বাঁচানোর জন্য তিনি তার উপাধি পরিবর্তন করেন। মুকুন্দরাম রায় থেকে চক্রবর্তী হন। তার পরে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়িয়ে ফের যুদ্ধ করেন। তাতে জয় লাভও করেন।

কালক্রমে হল দেশভাগ। বঙ্গদেশ দু’ টুকরো হল। রাজশাহী-টাঙ্গাইল থেকে বিচ্ছিন্ন হল জলপাইগুড়ি। পাবনা-রাজশাহী-টাঙ্গাইল থেকে গেল ও পারে। মুকুন্দরামের সেই অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি নিয়ে তাঁর উত্তরপুরুষদের একাংশ চলে আসেন জলপাইগুড়িতে। জলপাইগুড়ির পাণ্ডাপাড়ায়। সেই দুর্গামূর্তির আরাধনা চক্রবর্তী পরিবারে অবিচ্ছেদ্য ভাবে চলতে থাকে এ পার বাংলায়। এবং সব রীতি মেনেই পুজো হয় চক্রবর্তী পরিবারে।      

ঐতিহাসিক এই দুর্গামূর্তিতে লক্ষ্মী-সরস্বতী নেই। আছেন কার্তিক ও গণেশ। নিত্যপুজোয় নয় রকমের ভাজা দিয়ে ভোগ দেওয়া হয় দুর্গামাকে।

দুর্গাপুজোর সময় অষ্টধাতুর এই মূর্তির পাশে মাটির মূর্তিও পুজো করা হয়। এই মূর্তিতে মা সন্তানদের নিয়েই থাকেন। কিন্তু তাঁদের অবস্থান একটু অন্য রকম। এক দিকে থাকেন গণেশ-সরস্বতী, অন্য দিকে থাকেন লক্ষ্মী-কার্তিক। পারিবারিক বিগ্রহের মতো এই মৃন্ময়ী মূর্তিরও রঙ হলুদ। বোধনের দিন থেকে অষ্টমী পর্যন্ত দেবীকে নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। খিচুড়ি, তরকারির নানা পদ, নানা রকমের মিষ্টি।

নবমী-দশমীতে দেওয়া হয় আমিষ ভোগ। নবমীতে থাকে বোয়াল মাছ আর দশমীতে ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক। চক্রবর্তী পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরাই বলেন, “বাঙালবাড়ির পুজোর ভোগে মাছ থাকবে না, তা-ও কি হয়?”

আরও পড়তে পারেন

কামারপুকুরের লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণ

সিঙ্গি গ্রামের ভট্টাচার্য বংশের ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো ‘মঠের বাড়ির দুর্গোৎসব’

হুগলির জোলকুলের ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজোর এ বার ২১৭ বছর

দু’ দিন পরেই বোধন, সাবর্ণদের আটচালাবাড়িতে শুরু হয়ে যাবে ৪১২তম বছরের দুর্গাপুজো

রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নির্দেশেই ১৭৫৭-য় শুরু হয়েছিল কলকাতার সব চেয়ে জাঁকজমকের পুজো

পাণ্ডবেশ্বরের নবগ্রামে তিন শরিকের পুজোয় মা দুর্গা আসেন ব্যাঘ্রবাহিনী রূপে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন