Bandana Parab
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত ছবি

সমীর মাহাত, ঝাড়গ্রাম: লোক সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর জঙ্গল মহল এলাকায় সারা বছর ধরে যে সমস্ত লোক উৎসব পালিত হয়, তার মধ্যে বাঁদনা পরব অন্যতম। বাঁদনা শব্দটি প্রাচীন, যার পরিবর্তিত রূপ বন্দনা। এই পরব মুলত ‘গো মাতার’ বন্দনা বা পুজো করা। প্রতি বছর কালীপুজোর অমাবস্যার সময় এই উৎসব গোটা জঙ্গল মহল ও কুড়মি জনজাতি অধ্যুষিত বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় পালিত হয়। কোনো অঞ্চল বা এলাকায় গোরুর “আউসা” বা “খুরৈয়া” রোগ-অসুখ হলে, সেই এলাকায় পরব বন্ধ থাকে।

এই পরবের মুলত তিনটি পর্যায়। যেগুলি হল ঘট ডিঙানো, ঘর জাগা ও গোরু খুঁটান। তবে তার প্রস্তুতি শুরু হয় লক্ষ্মীপুজোর পর থেকেই। বিশেষত মাটির বাড়ির দেওয়াল ও গোয়াল ঘরকে চাকচিক্য করার কাজে মহিলাদের ঘুম ছুটে যায়। অমাবস্যার তিন বা পাঁচ দিন আগে থেকে গোরু, মহিষের সিংয়ে তেল মাখানো হয়।

অমাবস্যার বিকেলে মাঠে গ্রামের সমস্ত গোরুকে জড়ো করা হয়। সৃষ্টি ও বসুমাতার প্রতীক হিসেবে গোবরের উপর একটি ডিমকে পূজারি বা লায়াকে দিয়ে পুজো করানো হয়। গোরুর পালকে তার উপর দিয়ে ডিঙিয়ে দৌড়ো করানো হয়। যাঁর গোরু ডিম ভাঙবে, তাঁর বাড়ি থেকে শুরু হয় ঘর জাগা বা “ঝাঁগোড়” বা অহিরা গীত। এই গৃহকর্তা মাঠ থেকে পূজারি বা লায়াকে কাঁধে চাপিয়ে বাড়িতে এনে, হলুদ জলে পা ধুইয়ে নতুন বস্ত্র দান করেন।রাতে শুরু হয় অহিরা গীতের মাধ্যমে ঘরে ঘরে গোরু জাগানো। সারা রাত গোয়ালে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা ও গোরুকে ঘাস খেতে দেওয়া হয়। এই পর্বের গান গুলি এই রূপ, “অহিরে, কেহ ত কাঁদে ভাইরে, জনমের জনমে রে/কেহ ত কাঁদে আধারাতি,কেহ ত কাঁদে ভাইরে দেড় প্রহর রাতি রে / আর খুজে দসর দুয়ার।” এটি প্রশ্ন সূচক গান। গানের মাধ্যমেই উত্তর দেওয়া হয়।

পরের সকালে তুলসী থানে কৃষিজ যন্ত্রপাতি লাঙল, মই-এর ও গোয়াল ঘরে তিনটি মাটির গোলায় শালুক রেখে পুজো করা হয়। এই পরবের পৃথক আল্পনা দেওয়া হয়। এক দিন বিশ্রামের পর হয় গোরু খুঁটান বা বুড়ি বাঁদনা। গোরুকে ফুল মালা পরিয়ে লড়াই যোগে নাচানো হয়। এই পর্বের গান হল, “অহিরে, এত দিন চরালি ভালা কচায় খুঁদিয়েরে, আইজ ত দেখিবে মরদানি/ চার পায়ে নাচবি, দুয় শিংয়ে মারবি,রাখবি বাগাল ভাইয়ের নাম”।

সমাজের সব শ্রেণীর লোক এই উৎসবে শামিল থাকে। প্রাক্তন মন্ত্রী চূড়ামণি মাহাতো ও প্রাক্তন বিধায়ক চুনীবালা হাঁসদাকে একই সঙ্গে এই অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে। লোক সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ ড.ক্ষিতীশ মাহাতো বলেন, “বাঁদনা পরবের ব্যপ্তি অনেক বড়ো, মূলত গো বন্দনা, মেল বন্ধন ও সম্প্রীতির মহা পরব।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here