7th bangladesh book fair
smita das
স্মিতা দাস

“দু’ দেশের মধ্যে বই আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা খুবই জটিল। তার ফলে স্টক শেষ হয়ে গেলে বই আনাটা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পাঠকের চাহিদা থাকলেও তা দিয়ে ওঠা যায় না। তাই দু’ দেশের সরকার যদি বই আনা-নেওয়ার ব্যবস্থাটা সহজ করে দেন তা হলে দু’ দেশের পাঠকসমাজই উপকৃত হবেন। তাই ভারত সরকারের কাছে দাবি অন্তত বই আদানপ্রদানের ব্যবস্থার জটিলতাটা কমিয়ে দেওয়া হোক। এই নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছেও দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু এক দেশ করলেই তো হবে না। দু’ তরফ থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে” – খবর অনলাইনকে বললেন, নৌরজ কিতাবেস্তান প্রকাশনার মালিক তথা প্রকাশক মঞ্জুর খান চৌধুরী।

সপ্তম বাংলাদেশ বইমেলার জায়গা বদল। তার ওপর প্রথমেই বৃষ্টি। কী মনে হয়েছিল?

মঞ্জুরবাবু বলেন, “৪৬ বছরের দেশ বাংলাদেশ। ক্ষুদ্র দেশ, কাজের পরিসরও ক্ষুদ্র। কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি, স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসি”। তাই আশা ছাড়েননি তাঁরা।

‘জলরঙ বসন্ত’ নামের একটা কবিতার বই প্রকাশ করা হয়েছে এখানে। সেটার স্টক শেষ। ১২০ রকমের বইয়ের মধ্যে আরও বেশ কিছু বইয়ের স্টকও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আনানো যায়নি। তিনি বলেন, এখানে বিষয়ভিত্তিক বইয়ের চাহিদা বেশি। তাঁদের বই কলেজ স্ট্রিট, লেক টাউনের কয়েকটি দোকানে পাওয়া যায় তবে সংখ্যায় খুবই কম।

বাংলাদেশ বইমেলা নিটোল বইমেলাই। সেখানে স্বাদ বদল মানে বইয়ের রকমফের। এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ছুটে চলা। নানান স্বাদের বইয়ের ভিড়।

parvez aktar
পারভেজ আকতার।

কলকাতার শিশুদেরও বাংলায় লেখা বইয়ের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এটা দেশে খুশি বাংলাদেশ শিশু অ্যাকাডেমির অন্যতম প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত মহম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই প্রকাশনার কাজ ছোটোদের নিয়েই। তাই এখানে নানা রকমের বই রয়েছে ছোটোদের জন্য। ছোটোদের ৭৮ রকমের বিভিন্ন স্বাদের বই আনা হয়েছে, স্টক প্রায় শেষ। সাত বছরের মধ্যে এই বছরই বেশি বইয়ের কাটতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি জানান, কলকাতায় দু’টো বই মেলাতেই তাঁরা উপস্থিত থাকেন।

মেলাতে চলতে ফিরতে দেখা হয়ে যেতেই পারে দু’ দেশের কোনো লেখকের সঙ্গে। এমন আশা করাটা খুব একটা ভুল না। তেমনই দেখা হয়ে গেল ও-পার বাঙলার জনপ্রিয় লেখক পারভেজ আকতারের সঙ্গে। তিনি বলেন, কলকাতা নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা সব সময়ই ভালো। কলকাতা সব বিষয়েই সাহায্য করে। বইমেলা নিয়েও করে। কলকাতার পাঠকরা বাংলাদেশের অনেক বই পড়েন। তাঁর লেখা উপন্যাসের বই ‘রাত এগারোটার আগে’ মুক্তি পেয়েছে এই মেলাতেই। তিনি বলেন, কলকাতা আর বাংলাদেশ একই। তবে এখানের মানুষজন বাংলাদেশের বই একটু কম পড়েন। তুলনায় বাংলাদেশের মানুষরা এখানের বই বেশি পড়েন। তাই এখানকার পাঠকদের কাছে তাঁর অনুরোধ, ও-পার বই বেশি করে পড়ুন। তবেই তো মনের আদানপ্রদানটাও বাড়বে।

বাংলাদেশ বইমেলা মোহরকুঞ্জে প্রথম বার। কেমন লাগছে?

অনিন্দ্য প্রকাশনীর ম্যানেজার মামুদুল হাসান মামুন খবর অনলাইনকে বললেন, অন্য বার অ্যাকাডেমি প্রাঙ্গণে হয়। প্রচুর লোক আসে ঠিক। কিন্তু বই কেনার লোক তুলনায় কম থাকে। কিন্তু এখানে যাঁরা আসছেন তাঁরা সবাই বই কিনছেন। ফলে বিক্রিটা অন্য বারের তুলনায় বেশি। তাই বলা যায় এই বছরই সেরা। এই প্রকাশনী মূলত ভ্রমণ সংক্রান্ত বই বের করে। তা ছাড়া অন্যান্য বইও আছে। ‘কবিতার এ পার ও পার’ কবিতার বই। এ বছর প্রকাশ পেয়েছে। এটার চাহিদা খুবই বেশি। যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাক না কেন অনিন্দ্য প্রকাশনীর পাঠকরা ঠিকই স্টল খুঁজে নেন। তিনি বলেন, ৭০০ রকমের বই আনা হয়েছিল। মেলায় বিক্রির একটা লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। বলা ভালো সেই লক্ষ্য পূরণ হতে আর বেশি বাকি নেই।

তবে বিপরীত অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন ভাষাচিত্র প্রকাশনার ম্যানেজার তনবীর। তিনি বলেন। অন্য বারের বই মেলা বেশি জমজমাট ছিল। এ বারের কিছুটা কম। পাঠকের সংখ্যা কম। ভাষাচিত্র থেকে মূলত সিনেমা, নাটক বেশি বেরোয়, এর চাহিদাও বেশি। প্রায় ৪০০ রকমের বইয়ের মধ্যে ৩০০ রকমের বই এখানে আনা হয়েছে। তার মধ্যে ‘আমি একদিন নিখোঁজ হব’ এই কবিতার বইটার স্টক শেষ হয়ে গিয়েছিল। আবার আনা হয়েছে। এর প্রায় ২৫০ কপি শেষ হতে চলেছে।

bangladesh bookfairপাশাপাশি কথা হল কয়েক জন পাঠকের সঙ্গেও। মেলা নিয়ে বেশ কিছু পাঠকের বক্তব্য হল, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার মতো এর প্রচার অত বেশি নয়। তাই লোক সমাগম অনেকটাই কম। অত ভালো একটা উদ্যোগ উপযুক্ত প্রচারের অভাবে মার খাচ্ছে। অনেক পাঠক আছেন যাঁরা জানতেই পারেন না। তাই বিভিন্ন মাধ্যমে যদি প্রচার বাড়ানো যায় তা হলে পাঠক, বিক্রেতা দু’ পক্ষেরই সুবিধা হবে।

কথা হচ্ছিল স্বাতী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে, এ-পারের মানুষ, লেখালেখি করেন। তিনি বলেন, ও দেশে অনেক বইমেলাতেই তিনি গেছেন, ভালো লাগে। এখানেও ও দেশের অনেক বন্ধু, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হল। খুব ভালো লাগল। স্বাতী জানান, তাঁর লেখা ‘ভালোবাসার এ পার ও পার’ বইটা বাংলাদেশে বেরিয়েছে। এটা একটা ভীষণ ভালো উদ্যোগ। তিনি মনে প্রাণে কামনা করছেন এর পরিসর ভবিষ্যতে আরও বাড়ুক। সফল হোক।

‘বাংলা অ্যাকাডেমি’-র ক্যাটালগার রেজাউল কবির বলেন, তাঁরা চার বছর আসছেন। এ বারে নতুন জায়গা। কিন্তু জায়গা নতুন হলেও বিক্রিতে শীর্ষে এই বছরই। এত দ্রুত বই শেষ হয়ে যাবে এটা তাঁর কল্পনাতীত ছিল। প্রায় ৫০০ বই বিক্রি হয়েছে। বেশি বিক্রি হয়েছে লোকসংস্কৃতির বই, বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা বইটি। বলা যায় পাঠকের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। পাঠক আর প্রকাশনার জন্য দু’ সরকারের এটা একটা দারুণ উদ্যোগ।

২০১১ সালের পর আবার এ বছর। মাঝের বছরগুলোয় লোকবলের সমস্যা ছিল। তাই আসা হয়নি। এ বার সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠেছে ‘প্রথমা’। এ বার থেকে প্রতি বছরই বাংলাদেশ বইমেলায় পাওয়া যাবে তাঁদের, বললেন প্রথমার সহযোগী ব্যবস্থাপক জাকির হুসাইন। বৃষ্টিতে প্রথমে সমস্যায় পড়তে হলেও এখন ভালোই চলছে। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা প্রকাশনী এই ‘প্রথমা’। তিনি বলেন, এই প্রকাশনীর বইয়ের চাহিদা বাংলাদেশে যেমন, কলকাতাতেও তেমন। এ বারে ‘বিপুলা পৃথিবী’ বইটা আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। এই মেলাতেও বইটা ‘বেস্টসেলার’। মূলত মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, আত্মজীবনী, গবেষণাধর্মী বই-ই বেশি। ৩০০ রকমের বই আনা হয়েছে মেলাতে। এই মেলার ৫০টা স্টলের মধ্যে সব থেকে বেশি বিক্রি হয়েছে বলা যায় প্রথমা-র বই। মেলার ব্যবস্থা, আয়োজন, বই বিক্রির পরিমাণ সব মিলিয়ে খুশি তাঁরা।

কলকাতায় ‘বাংলাদেশ বইমেলা’ নিয়ে পাঠকমহল আর প্রকাশক, উভয়ের বক্তব্যে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, এমন একটা উদ্যোগে খুশি সকলেই। কিন্তু বই আদানপ্রদানের সমস্যাটা দু’ পারের মধ্যে একটা বেড়া। সেই বেড়ায় যদি একটা সহজ দরজা থাকত তা হলে রসিক পাঠককে গ্রন্থরসের ভাণ্ডার দিতে পেরে স্বাভাবিক ভাবেই খুশি হতেন রসের পাচক আর সরবরাহকারীরা। তাই এ ব্যাপারে কি আর একটু ভেবে দেখা যায়? প্রশ্ন রইল সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে।

ছবি রাজীব বসু

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here