কলকাতা: দিনটা ছিল উষ্ণতম, কিন্তু সন্ধের পরে নেমে এল দুর্যোগ। শহরের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী কালবৈশাখীর দাপটে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল কলকাতা। কলকাতা ও হাওড়ায় মারা গিয়েছেন মোট ৯ জন। কলকাতায় চার জন ও হাওড়ায় পাঁচ জন।

শহরে কত যে গাছ পড়েছে তার হিসেব নেই। সড়ক, রেল, মেট্রো ও বিমান চলাচল সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পুলিশ ও পুরসভা কর্মীদের যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে নেমে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

চাঁদনিতে অটোর ওপর গাছ পড়ে মারা গিয়েছেন দু’ জন। বেহালায় গাছ পড়ে মারা গিয়েছেন মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি। আনন্দপুরে বাড়ি ভেঙে মারা গিয়েছেন এক জন। হাওড়ার ডুমুরজলা স্টেডিয়ামের কাছে গাছ পড়ে এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। এবং ওই শহরেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও এক জনের। হাওড়ার বেলুড়ে দু’ জন, আন্দুল রোডে এক জন মারা গিয়েছেন।

কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ (উদ্যান) দেবাশিস কুমারও স্বীকার করেছেন, গাছ পড়ে তছনছ হয়ে গিয়েছে শহর কলকাতা। কত গাছ পড়েছে, সংখ্যাটা এখনই বলা না গেলেও, সংখ্যাটা যে বিপুল তা জানিয়েছেন মেয়র পারিষদ।

মঙ্গলবার এই মরশুমের উষ্ণতম দিন ছিল কলকাতায়। বিকেলের পর থেকেই ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সেই ঝড় যে এতটা তীব্র বেগে আছড়ে পড়বে সেটা কোনো ভাবেই আন্দাজ করা যায়নি।

এ দিন রাত আটটা নাগাদ ঝড় শুরু হয় কলকাতায়। গতিবেগে ঝড়টি আয়লাকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিমি হলেও কোথাও কোথাও ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩৮ কিলোমিটার। এই ঝড়ের ফলে কলকাতার অন্তত অগুনতি জায়গায় গাছ পড়ে গিয়েছে। পার্ক স্ট্রিট, কাঁকুড়গাছি, হাজরা রোড, শোভাবাজার, স্টার থিয়েটার, ফেয়ারলি প্লেস, বিজন সেতু, রেড রোড-সহ একাধিক জায়গা থেকে গাছ পড়ার খবর এসেছে। সব ক’টি জায়গাতেই গাছ সরানোর কাজে নেমে পড়েছেন পুরসভার কর্মীরা।

norwester

বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রেল এবং মেট্রো যোগাযোগ ব্যবস্থাও। শিয়ালদহ ও হাওড়া থেকে কোনো দিকেই আপাতত ট্রেন ছাড়ছে না। শহরতলির বহু স্টেশনেও বহু ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। অসংখ্য যাত্রী বিভিন্ন স্টেশনে আটকে রয়েছেন। রাত ১০টাতেও শিয়ালদহ ও হাওড়ায় থিকথিকে ভিড়। কখন ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে রেল কর্তৃপক্ষ বলতে পারছে না। অন্য দিকে দমদমের কাছে মেট্রোর লাইনে গাছ পড়ে যাওয়ায় ব্যাহত মেট্রো চলাচলও। সন্ধে ৭.৫০-এর পর দমদম বিমানবন্দর থেকে কোনো বিমান ওড়েনি। শহরে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ। অফিসফেরত হাজার হাজার যাত্রী অপেক্ষা করছেন বাড়ি ফেরার জন্য। কিন্তু কখন তাঁরা ফিরতে পারবেন সে নিয়ে সংশয় রয়েছে।

রাজ্যের বহু জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। হুগলি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিষ্প্রদীপ রয়েছে।

বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা ওয়েদার আল্টিমার কর্ণধার রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মধ্যাংশে তৈরি হওয়া ঘূর্ণাবর্তকে কাজে লাগিয়ে এই ঝড়টি এ দিন তৈরি হয়েছিল ছোটোনাগপুরে। কিন্তু কলকাতায় ঢোকার মুখেই সেটি স্থানীয় জলীয় বাষ্পকে সঙ্গী করে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাধারণ ভাবে কালবৈশাখীর পূর্বাভাস দেওয়া গেলেও, এই ধরনের গতিবেগ আন্দাজ করা যে খুব মুশকিল ব্যাপার সেটাও জানিয়েছেন রবীন্দ্রবাবু।

তবে তীব্র দহনের পর প্রবল ঝড়বৃষ্টির ফলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কলকাতায়। এই স্বস্তি অবশ্য বেশিক্ষণ থাকবে না। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ফের চড়বে পারদ। তবে সন্ধের পরে ফের আরও এক দফা কালবৈশাখীর বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শহরে।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন