ইন্দ্রাণী সেন

বাঁকুড়া: অঙ্গরাগের প্রস্তুতি শেষ। চন্দনের সুবাস আর নতুন পোশাকে মন্দিরে শোভাবর্ধন করছেন স্বয়ং শ্রীশ্রী ঠাকুর ও ঠাকুরের লীলাসঙ্গী সহচরীরা। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ বলে খ্যাত বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মাতবে রাস উৎসবে।মাধবগঞ্জের রাধা মদনগোপাল জিউ মন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রাধা মদনগোপাল জিউ এগারোপাড়া ষোলোআনা কার্যকরী কমিটির প্রবীণ সহ-সম্পাদক সুজিতকুমার সরকার বলেন , এই বছর রাধাকৃষ্ণের বত্রিশ জোড়া বিগ্রহ রাস উৎসবে শামিল হবে।শুক্রবার সন্ধ্যায় বিশেষ আরতি, পুজোপাঠের মধ্য দিয়েই সূচনা হবে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের।

Bankura Ras festival

ভাগবতপুরাণে শরৎকালের পূর্ণিমার রাত্রিতে মহারাসের বর্ণনা আছে। রাসলীলা সংক্রান্ত ভাগবত পুরাণের অন্তর্গত পাঁচটি অধ্যায় পৃথক ভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল, এগুলিকে ‘রাসপঞ্চাধ্যায়ী’ বলা হয়। আবার পুরাণে বসন্তকালেও রাস উৎসবে কথা বলা হয়েছে। যদিও বাংলার গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ ভাগবতপুরাণকে মর্যাদা দিয়ে শারদ পূর্ণিমাতেই রাস পালন করেন। রাস উৎসবের সঙ্গে বিষ্ণুপুরের যোগাযোগ অত্যন্ত প্রাচীন। মধ্যযুগে রচিত বিখ্যাত বৈষ্ণবগ্রন্থ ‘প্রেমবিলাস’ থেকে জানা যায়, রাজা বীরহাম্বীরের দস্যুদল শ্রীনিবাস কর্তৃক আনা বৈষ্ণবগ্রন্থ দুর্মূল্য রত্ন মনে করে লুঠ করে। সেই লুণ্ঠিত পুথি খোঁজার উদ্দেশ্যে যখন শ্রীনিবাস রাজদরবারে যান, তখন সভাপণ্ডিত ব্যাসাচার্য রাজাকে রাসপঞ্চাধ্যায়ী পড়ে শোনাচ্ছিলেন। যদিও তাঁর ব্যাখ্যা মনঃপুত হচ্ছিল না। তখন শ্রীনিবাস আচার্য শ্রীধর স্বামীর ব্যাখ্যানুযায়ী রাসপঞ্চাধ্যায়ী ব্যাখ্যা করেছিলেন। এতেই বীরহাম্বীর গলে জল হয়ে যান। রাজার এই মত পরিবর্তনের সাক্ষীও ভাগবত বর্ণিত রাসলীলা। বিষ্ণুপুরের রাসমঞ্চটি বীরহাম্বীরই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও রাসমঞ্চে লিপি না থাকায় এ বিষয়ে যথার্থ প্রমাণ পাওয়া যায় না।

Bankura Ras festival

তবে রাসমঞ্চের পূর্বদিকে বেশকিছু প্রাচীন টেরাকোটা মূর্তিতে রাসের নৃত্যশৈলী পরিলক্ষিত হয়। বীরহাম্বীরের পুত্র রঘুনাথ সিংহের প্রতিষ্ঠিত শ্যামরায় মন্দিরটি রাস উৎসবের চিত্র ভাস্কর্যে অলংকৃত। ছোটো-বড়ো বহু রাসচক্র এই মন্দিরের টেরাকোটা কারুকার্যে ফুটে উঠেছে। প্রবেশ পথের দু’দিকে বড়ো দু’টি রাসমণ্ডলের মত শিল্প বোধহয় আর নেই।

আরও পড়ুন: শহরকে প্লাস্টিকমুক্ত করতে জেলাশাসকের উদ্যোগে পদযাত্রায় হাঁটল বাঁকুড়া

তরুণ গবেষক শুভম মুখোপাধ্যায়ের কাছে রাস উৎসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস বৈষ্ণব মতে কৃষ্ণের সর্বোত্তম লীলা। রস থেকে রাসের উৎপত্তি। ভগবানকে বলা হয়েছে ‘ রসো বৈ সঃ’। রাসকে নর্তনলীলাও বলা হয়। অর্থাৎ নৃত্যের মাধ্যমে কৃষ্ণ ও অন্যান্য গোপিনীদের বিলাস। এখানে কৃষ্ণ পরমাত্মা ও গোপীরা জীবাত্মা। প্রতি গোপীর সঙ্গেই কৃষ্ণ শারদ পূর্ণিমা তিথিতে এই রাস রসে মেতে উঠেছিলেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here