Anirban Roy main accuse in Uttam Mahanto case

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : “লিপিকা বাটাম দিয়ে মেরেছে, শ্বেতা মোহন্তও মেরেছে। আমি সেখানে ছিলাম” — উত্তম মোহন্ত খুনে স্বীকারোক্তি ধৃত অনির্বাণের। অনির্বাণের স্বীকারোক্তিতে এই মামলা অন্য দিকে মোড় নিল বলে মনে করা হচ্ছে।

সোমবার বেলা ১টা নাগাদ জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তম মোহন্ত হত্যা মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত পুলিশ হেফাজতে থাকা অনির্বাণ রায়কে। সঙ্গে ছিলেন কোতোয়ালি থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার এবং পুলিশ আধিকারিক শংকর দাস। সেখানে সংশোধনাগারের একটি ঘরে নিয়ে আসা হয় জেলবন্দি লিপিকাকেও। পুলিশের পরিকল্পনা ছিল দু’জনকে মুখোমুখি বসিয়ে আরও একবার জেরা করার। কিন্তু সূত্রের খবর, অনির্বাণকে সামনে দেখেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে লিপিকা।

অন্য তরুণীর সঙ্গে অনির্বাণের সম্পর্ক, মুরগির রক্ত দিয়ে চিঠি লিখে প্রেমের অভিনয় করে লিপিকাকে প্রতারণার কথা তুলে অনির্বাণকে একহাত নেয় লিপিকা। অনির্বাণের পেছনে যে সে বহু টাকা খরচ করেছে তা-ও পুলিশ আধিকারিকদের জানিয়ে দেয়। নিজের জীবনে অনির্বাণের উপস্থিতি আর চায় না বলেও লিপিকা স্পষ্ট জানায়। এর আগে গত বুধবারও দু’জনকে মুখোমুখি জেরার সময় বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিল এই প্রেমিকযুগল।

তবে আজ ছেড়ে দেয়নি অনির্বাণও। স্বামীকে খুন করার পেছনে যে স্ত্রী লিপিকা এবং মেয়ে শ্বেতার হাত রয়েছে তা সেখানে উপস্থিত পুলিশ আধিকারিকদের সামনেই বলে দেয় অনির্বাণ। এর পরেই অনির্বাণ ও লিপিকা বচসায় জড়িয়ে পড়ে।

অনির্বাণ রায়।

ভাইয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর উত্তম মোহনন্তর দাদা স্বপন মোহন্ত কোতোয়ালি থানায় যে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন, তাতে দাবি করা হয়েছিল, সম্পত্তির পাশাপাশি অনির্বাণের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার জন্যই উত্তম মোহন্তকে খুন করে লিপিকা এবং অনির্বাণ। এখন সেই অনির্বাণ নিজেকে বাঁচাতে তাকে এবং তার তরুণী মেয়েকেও ফাঁসাতে চাইছে, এটা মেনে নিতে পারছে না লিপিকা।

সূত্রের খবর, এ দিন জেরায় লিপিকা দাবি করেছে নিজেকে বাঁচাতে উত্তম খুনের দায় তার আর মেয়ে শ্বেতার ঘাড়ে চাপাতে চাইছে অনির্বাণ। প্রায় ঘন্টাখানেক দু’জনকে মুখোমুখি বসিয়ে রাখেন পুলিশ আধিকারিকরা। তাদের অভিযোগ-পালটা অভিযোগের ফাঁকে নিজেদের প্রশ্নও ছুড়ে দিচ্ছিলেন পুলিশ আধিকারিকরা। জেরা শেষে সংশোধনাগার থেকে বের হওয়ার সময় যথেষ্ট ক্ষিপ্ত দেখাচ্ছিল অনির্বাণকে। নিজেই চিৎকার করে বলতে থাকে “মেরে দেওয়ার পর এখন অস্বীকার করছে”। সংবাদমাধ্যমের কাছেও সে দাবি করে, বাটাম দিয়ে উত্তমকে মেরেছিল লিপিকাই। পরে শ্বেতাও মেরেছিল। সে নিজেও সেখানে ছিল বলে স্বীকারোক্তি অনির্বাণের। যদিও পুলিশ সূত্রে খবর, অনির্বাণ বার বার বয়ান বদলাচ্ছে। কারণ রবিবারের বয়ানের সঙ্গে সোমবারের বয়ানে বিস্তর অমিল।

রবিবার দফায় দফায় জেরা করা হয় পুলিশ হেফাজতে থাকা অনির্বাণকে। টানা জেরায় ভেঙে পড়ে অনির্বাণ। পুলিশের দাবি, জেরায় অনির্বাণ জানায়, ঘটনার দিন (২৯  জুন) সকালে লিপিকা আম-মুড়ির সঙ্গে কিছু তরল পদার্থ মিশিয়ে উত্তমকে খাওয়ায়। কিন্তু ঝিমিয়ে পড়লেও উত্তমের মৃত্যু হয়নি। ঘণ্টা দুয়েক এ রকম চলার পর একটি কাঠের মোটা বাটাম এনে অনির্বাণের হাতে দেয় লিপিকা। তার মাথায় একটি গামছা জড়ানো ছিল। সেটি দিয়ে লিপিকা উত্তমের মাথায় মারতে বলে অনির্বাণকে। অনির্বাণ মারার পর উত্তম সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়।

এই সেই বাটাম।

জেরায় স্বীকারোক্তির পর জলপাইগুড়ি শহর থেকে প্রায় দু’ কিলোমিটার দূরে দেবনগর এলাকায় গদাধর নদীর ক্যানেলের কাছে অনির্বাণকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই একটি ঝোপের মধ্যে লুকোনো গামছা জড়ানো ৪২ ইঞ্চির বাটামটি বের করে দেয় অনির্বাণ। পুলিশের দাবি, অনির্বাণ জেরায় জানিয়েছিল, পালিয়ে যাওয়ার আগে সেই এইখানে বাটামটি লুকিয়ে রাখে। যদিও সোমবার জেরার সময় অনির্বাণ জানিয়েছে, সে নয়, লিপিকাই বাটাম দিয়ে মেরেছিল, পরে শ্বেতাও মারে। সে সামনেই দাঁড়িয়েছিল।

বারবার এই বয়ান বদল ভাবাচ্ছে পুলিশকেও। আসল ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে পুলিশকে কি বিভ্রান্ত করতে চাইছে সে? উঠছে সে প্রশ্নও।

তবে এই ঘটনায় কিছু প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। এর আগে পুলিশের দাবি ছিল, বিষক্রিয়ায় উত্তমের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে আগে বাটাম দিয়ে আঘাতের কথা বলা হয়নি। এ দিকে সূত্রের খবর অনুযায়ী, পোস্টমর্টেমে বিষক্রিয়ার কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও সেই রিপোর্টে মাথার পেছনে একটি ক্ষতচিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও পুলিশ এখনও বিষক্রিয়ার দাবি থেকে পিছিয়ে আসেনি। তাদের বক্তব্য, ভিসেরা রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না।

তবে বিষ হোক বা বাটাম, উত্তম মোহন্তকে যে খুন করা হয়েছে তাতে নিশ্চিত পুলিশ। তদন্তও সে ভাবে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যেই উত্তম মোহন্তর মেয়ে অভিযুক্ত শ্বেতা মোহন্ত কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে জামিন পেয়ে গিয়েছে। একই ধারায় অভিযুক্ত তিন জনের মধ্যে একজন জামিন পেয়ে যাওয়ায় স্বভাবতই চাপে রয়েছে পুলিশ। তাই দ্রুত এই ঘটনার চার্জশিট আদালতে জমা দিতে চান তদন্তকারী আধিকারিক সুব্রত সরকার। পুলিশ চেষ্টা করছে যাতে মূল অভিযুক্ত লিপিকা এবং অনির্বাণ রায়ের ‘কাস্টোডি ট্রায়াল’ হয়। অনির্বাণের পুলিশি হেফাজতের মেয়াদও আগামী শুক্রবার শেষ হয়ে যাবে। তাই এর মধ্যে তাকে আরও জেরা করে সমস্ত তথ্য জেনে নিতে চায় পুলিশ। প্রয়োজনে তাকে ফের লিপিকার মুখোমুখি বসানো হতে পারে। নিজেদের পথের কাঁটা সরাতে যারা খুনের মতো অভিযোগে জড়িয়েছেন, সেই প্রেমিকযুগলের তৃতীয় বার মিলনে আর কী কী তথ্য বেরিয়ে আসে তার জন্যই এখন পুলিশের অপেক্ষা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here