Connect with us

দুর্গা পার্বণ

হাতে সময় স্বল্প! নবমীতে অব্যাহত জনজোয়ার

ওয়েবডেস্ক: বৃষ্টির ভ্রুকুটি নেই! আকাশ মুখ ভার করে থাকলেও নবমীর সারাটা দিন ছিটেফোঁটার দেখা মেলেনি। তবুও কিছুটা হলেও মন খারাপ বাঙালির। দিনের হিসেবে রাত পোহালেই দশমী, কিন্তু তিথি অনুযায়ী এ দিনই শুরু হয়ে গিয়েছে দশমী। মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর পালা। স্বাভাবিক ভাবে হাতে স্বল্প সময়েই মণ্ডপে-মণ্ডপে ঢল নেমেছে দর্শনার্থীর।

এ দিন সকাল থেকেই উৎসবমুখর মানুষ বেরিয়ে পড়েছেন প্যান্ডেলে ঢুঁ মারতে। এ দিন সকালে নবমীর বিশেষ যজ্ঞ, ধুনুচি নাচের পর বেশ কিছু সর্বজনীন পুজোয় চলছে প্রতিবারের মতোই ভোগ বিতরণ। আবার এ দিনও বাবু রাজচন্দ্রের মতো বেশ কিছু বনেদি বাড়ির পুজোয় প্রাচীন প্রথা মেনে কুমারীর পুজোর আয়োজনও হয়। পুজোর শুরুর দিন থেকেই যে ভাবে বৃষ্টির চোখ রাঙানি অব্যাহত ছিল, এ দিন তাতেও মিলেছে স্বস্তি।

স্বাভাবিক ভাবেই দিনভর রাস্তায় জনস্রোত সমানে এগিয়েছে। আর মাত্র একটা দিন, রাত পেরোলেই পড়ে যাবে মহাদশমী। তার পরই সেই বিষাদের সুর। বিদায় জানানোর পালা। শুরু হয়ে যাবে ঘাটে-ঘাটে বিসর্জন। তবে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত আর গুপ্তপ্রেস, দু’টি পঞ্জিকা মতে দশমী তিথির শুরু এবং শেষের সামান্য ফারাক রয়েছে।

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা নির্ঘণ্ট মতে, দশমী তিথি আরম্ভ সোমবার বেলা ১২.৩৮টা থেকে। দশমী তিথি শেষ আগামী মঙ্গলবার দুপুর ২.৫০ মিনিট পর্যন্ত। এর পরই দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পুজো ও বিসর্জন।

গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা নির্ঘণ্ট মতে দশমী তিথি শুরু হয়েছে সোমবার বেলা ৩.০৫টা এবং শেষ হচ্ছে আগামী মঙ্গলবার বিকেল ৪.১৯টায়। অর্থাৎ, সোমবার নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকেই দশমী বিহিত পুজো ও বিসর্জন প্রথাসিদ্ধ।

তবে শুধু মহানগর নয়, রাজ্যের সর্বত্রই এ দিন আবহাওয়া মোটের উপর ভালো থাকায় ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন দর্শনার্থীরা। শহরতলি এবং জেলার পুজোগুলিতেও মহানবমীতে মানুষের উৎসাহ চোখে পড়ার মতোই।

দুর্গা পার্বণ

মল্লিকবাড়ির ঠাকুরদালানে মা সিংহবাহিনীকে দর্শন করেই শ্রীরামকৃষ্ণ হয়েছিলেন সমাধিস্থ

শুভদীপ রায় চৌধুরী

‘সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্।/চতুর্ভুজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্।।/ শঙ্খশার্ঙ্গসমাযুক্তবামপাণিদ্বয়ান্বিতাম্।/ চক্রঞ্চ পঞ্চবাণাংশ্চ দধতীং দক্ষিণে করে।।/ রক্তবস্ত্রাপরিধানাং বালার্কসদৃশীতনুম্।/ নারদাদ্যৈর্মুনিগণৈঃ সেবিতাং ভবসুন্দরীম্।।

অর্থাৎ দেবী জগদ্ধাত্রী সিংহেস্কন্ধে আরূঢ়া, নানা অলংকারে সেজে আছেন ও নাগরূপে যজ্ঞোপবীতধারিণী। দেবীর বাম দিকে রয়েছে শঙ্খ ও শার্ঙ্গধনু এবং ডান দিকে রয়েছে চক্র এবং পঞ্চবাণ। দেবী রক্তবস্ত্র ধারণ করেছেন এবং মুখমণ্ডল প্রভাতসূর্যের ন্যায় রক্তবর্ণা। নারদাদিমুণিগণ তাঁর নিত্যসেবা করে থাকেন – এ রকম বর্ণনাই করা রয়েছে দেবী জগদ্ধাত্রীর ধ্যানমন্ত্রে।

মূলত ‘জগদ্ধাত্রী’ এই শব্দটির প্রাথমিক অর্থ হল যিনি জগতকে ধারণ করে আছেন বা বলা যেতে পারে যিনি জগতের পালিকা মহাশক্তি, তিনিই জগদ্ধাত্রী। যিনি নিত্যা, শাশ্বতী এবং যিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়, এই তিন গুণের প্রকাশ। দেবী রক্তবর্ণের ও তাঁর পরিধানে রক্তবস্ত্র। তদুপরি দেবীর সিংহাসনস্থ রক্তকমলে রজোগুণের প্রভাব দেখা যায় এবং তিনি স্বয়ং রজোদীপ্ত বলেই মহাশক্তিময়ী। আবার অপর দিকে তিনি করীন্দ্রাসুর নামক এক অসুরকে বধ করেছিলেন। সে জন্য অনেকে দেবীকে করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী নামেও ডেকে থাকেন।

ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কথায়, যিনি মনকরীকে বশ করতে পারেন তাঁর হৃদয়েই জগদ্ধাত্রীর উদয় হয়। সিংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতিকে জব্দ করে রেখেছে। মানুষের দুর্বল মন মত্ত হস্তীর সঙ্গে তুলনীয়। আর সেই কারণেই হাতি মহিষাসুরেরই গজরূপ। সেই চঞ্চল, দুরন্ত মনকে বশ করাই দেবী জগদ্ধাত্রীর উদ্দেশ্য।

প্রচলিত ঐতিহাসিক কাহিনি অনুযায়ী বঙ্গে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রথম শুরু করেছিলেন দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা। আজও সেই কৃষ্ণনগরের রাজবাড়িতে ধুমধাম করে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। এ ছাড়াও চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোও বিখ্যাত তবে আজ  এমন এক প্রাচীন জগদ্ধাত্রী আলোচ্য বিষয়, যিনি অধিক পরিচিত ‘সিংহবাহিনী’ নামেই। তিনি মল্লিক বংশের মা সিংহবাহিনী।

শক্তিধারার এক বিশেষ রূপ হলেন দেবী দুর্গা। তিনি জগদ্ধাত্রী হিসাবেও পরিচিত আপামর ভক্তসাধারণের কাছে। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন সিংহবাহিনীর উল্লেখ পাই। এ ছাড়া দেবী সিংহবাহিনীর উল্লেখ পাই বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ গ্রন্থে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে দেবী সিংহবাহিনী ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজা হর্ষবর্ধনের বড়ো ভাই রাজ্যবর্ধনের কুলদেবী। মা সিংহবাহিনীর সেই উজ্জ্বলতা এবং বিগ্রহের সাজসজ্জা প্রমাণ করে যে বিগ্রহটি বহু বছরের রাজপরিবারের ঐতিহ্য।

আরও পড়ুন: সপ্তমীতে থানকাপড়ে সিঁদুর দিয়ে কলাবউকে সাজানো হয় খড়দহের নিত্যানন্দপ্রভুর প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজোয়

দেবী সিংহবাহিনীর উচ্চতা প্রায় দেড় ফুটের কাছাকাছি এবং এটি অষ্টধাতুর প্রাচীন বিগ্রহ এবং যে বিগ্রহে সোনার পরিমাণ সব চেয়ে বেশি। সিংহবাহিনীর পিছনের চালচিত্রটি রুপোর। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে পতন হয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের। সেই সময় আর্যাবর্ত জুড়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসক। এর পর দেবী সিংহবাহিনী চলে যান জয়পুরের রাজা মানসিংহের কাছে, তিনিই তাঁকে কুলদেবী হিসাবে পুজো করতেন। কিন্তু মুঘল আক্রমণে সেই আশ্রয়ও নিরাপদ হল না, তাই বিধর্মীদের হাত থেকে দেবীকে রক্ষা করতে রাজপুরোহিত বিগ্রহ নিয়ে পালিয়ে গেলেন বহু দূরে। পূর্ব বঙ্গের চট্টগ্রামে দেবীকে লুকিয়ে রাখলেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গুহায়।

সপ্তগ্রামের অন্তর্গত ত্রিবেণী নিবাসী সুবর্ণবণিক্‌ গৌতম গোত্রীয় বনমালী দে মল্লিক ১০১৪ বঙ্গাব্দে (১৬০৮ খ্রিস্টাব্দ) দেহত্যাগ করলে তাঁর পুত্র বৈদ্যনাথ দে মল্লিক ব্যবসায়িক কাজের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্যের ব্যবসা করতেন। কোন পূজারি ব্রাহ্মণের তত্ত্বাবধানে অম্বর অধিপতি রাজা মানসিংহের  কুলদেবী সিংহবাহিনী মাতার ধাতুময় বিগ্রহ থাকে তা তিনি জানতে পারেন এবং দেবীর নানান অলৌকিক কাহিনিও শোনেন।

বৈদ্যনাথ দে মল্লিক মহাশয় একদিন ভোররাতে স্বপ্নাদেশে দেখলেন, সমুদ্রের ধারে এক পাহাড়ের গুহায় পড়ে আছেন মা সিংহবাহিনী। দেবীই তাঁকে স্বপ্নাদেশে পথনির্দেশও দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে রাজপুরোহিতকে দেবী স্বপ্নাদেশে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তিনি দে মল্লিক বংশে পুনরায় স্থাপিত হবেন এবং সে জন্য বৈদ্যবংশীয় সুবর্ণবণিক্‌ বৈদ্যনাথ মল্লিকের হাতে যেন তিনি বিনা দ্বিধায় মূর্তিটি তুলে দেন।

মল্লিক মহাশয়কে মা বলেন, “তোমার ভক্তিতে আমি সন্তুষ্ট, তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে যথাবিধি পূজার্চনা করো।” সেই স্বপ্নাদেশ পেয়ে বৈদ্যনাথ মহাশয় পরদিন বিগ্রহ আনতে গেলে রাজপুরোহিত মূর্তিটি দিলেন না। দ্বিতীয় রাত্রে দেবী আবারও পুরোহিতকে স্বপ্নে বললেন, “এ নির্জনে আমার যথাযথ পূজা হচ্ছে না। আগামী কাল প্রভাতে বৈদ্যনাথ পুনরায় আসবে, সেই সময় তুমি আমাকে অবশ্যই তাঁর হাতে সমর্পণ করবে।” দেবীর কথামতো বৈদ্যনাথ দে মল্লিকের হাতে মা সিংহবাহিনীকে তুলে দিলেন রাজপুরোহিত। মল্লিক মহাশয় সানন্দে সেই বিগ্রহ নিয়ে সপ্তগ্রামে ফিরলেন এবং দেবীকে সাড়ম্বরে স্থাপন করলেন।

সে কালে বাংলার বণিকরা প্রভূত ধনশালী ছিলেন এবং বিদেশিরা তাঁদের প্রশংসাও করতেন। সপ্তগ্রাম সে কালের ব্যবসায়ীদের কেন্দ্র ছিল। কবিকঙ্কনের চণ্ডীতে তাদের কথা লিখিত রয়েছে। তাঁরা ঘরে বসে দেশবাসী ও বিদেশি বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। বণিকদের মধ্যে সত্যবাদিতা ও সততার কথা শুনে সম্রাট আওরঙ্গজেব একজন বণিককে তাঁর দরবারে এনে প্রভূত সম্পত্তি প্রদান করেন এবং তাঁর পরীক্ষায় সফল হওয়ায় তিনি সেই বণিককে দশ হাজার টাকা, হাতি-সহ বিশেষ সম্পত্তি পুরস্কার দিয়েছিলেন। ইনিই দে মল্লিক বংশের কৃষ্ণদাস মল্লিক। এই কৃষ্ণদাস মল্লিকই রাজারাম মল্লিকের পিতা এবং দর্পনারায়ণ ও সন্তোষ মল্লিকের পিতামহ। কৃষ্ণদাস মল্লিক ১০৮৬ বঙ্গাব্দে (১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) দেহত্যাগ করেছিলেন।

জোব চার্নক রাজারাম মল্লিকের পরামর্শে সুতানুটিতে এসেছিলেন। ওই সময় মল্লিকরা কলকাতায় থাকতেন না বটে তবে ব্যবসার জন্য যাতায়াত করতেন এবং পরিশেষে কলকাতায় কুঠি স্থাপন করেন। রাজারাম মল্লিকের সঙ্গে ইংরেজদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে দে মল্লিকের বংশের উত্তরসূরিরা বর্গীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে কলকাতার বড়োবাজার অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। সেই সঙ্গে সিংহবাহিনীরও পদার্পণ ঘটে এই কলকাতায়। কলকাতায় বাজার প্রতিষ্ঠা করেন রাজারাম মল্লিকের কনিষ্ঠপুত্র সন্তোষ কুমার মল্লিক।

মল্লিক বংশের প্রথম সন্তান যিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি হলেন দর্পনারায়ণ মল্লিকের একমাত্র পুত্র নয়নচাঁদ মল্লিক। তাঁর জন্ম ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে।  বলা বাহুল্য দেবীর আগমনে মল্লিক বংশের সদস্যরা ধনবান হয়ে ওঠেন। যদিও এই পরিবারের সদস্যরা বৈষ্ণব ছিলেন, তবুও তাঁরা সম্পূর্ণ শাক্তমতেই পুজো করেন দেবীর। এই ভাবে মানসিংহর কাছ থেকে অপহৃত হয়েও স্বমহিমায় আবার প্রতিষ্ঠিত হলেন মা সিংহবাহিনী।

গত প্রায় চারশো বছর ধরে মল্লিকবাড়ির বিভিন্ন শাখায় দেবী চক্রাকারে পূজা পেয়ে আসছেন সারা বছর। মূলত জগদ্ধাত্রীর রূপকল্পে তাঁর মূর্তি রচনা হলেও বেশ কিছু বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। যেমন মা সিংহবাহিনী সিংহপৃষ্ঠাসীনা নন, তিনি সিংহের পিঠে দণ্ডায়মানা। বাহন সিংহটি দেবীর ডান দিকে না থেকে রয়েছে বাম দিকে। সিংহের মুখটি অশ্বমুখী এবং সিংহের পদতলে একটি হস্তীমুণ্ড। শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব, হিন্দুধর্মের এই তিন ধারার অভূতপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায় বিগ্রহতেও। যেমন সিংহটি অশ্বমুখী, শৈব ধর্মের প্রতীক হিসাবে দেবীর সাথে সাথে দুই শিবলিঙ্গ (বাণেশ্বর ও বিশ্বেশ্বর) দেবীর সঙ্গে পূজা পেয়ে আসছেন। রাজ্যবর্ধনের সময় থেকেই দেবী সিংহবাহিনী মূলত সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক হিসাবেই পরিচিত। দেবীর সেবাধিকারী মল্লিক পরিবার বৈষ্ণব হলেও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে দেবীকে উপাসনা করে আসছেন শাস্ত্রমতেই।

শারদীয়া দুর্গাপুজোর সময়েও সিংহবাহিনীর বিশেষ সেবাপূজা হয়ে থাকে মল্লিক বংশে। দুর্গাপুজোর সূচনা ঘটে মহালয়ারও আগে কৃষ্ণানবমী তিথি থেকে। সেই দিন থেকেই চণ্ডীপাঠ শুরু হয় এবং নবমী অবধি এই চণ্ডীপাঠ চলে। তিন দিনের বিশেষ পূজা হয় সপ্তমী, মহাষ্টমী এবং মহানবমীতে। এই তিন দিন দেবী সিংহবাহিনীর দুর্গা রূপে বিশেষ পূজা হয় এবং বিশেষ প্রাচীন রীতি মেনেই আজও পুজো হয় মায়ের। সঙ্গে মায়ের ভোগদান, আরতি, শ্লোকপাঠ ইত্যাদি উপাচার তো থাকেই এই কয় দিন।

এই পুজোর সময় বাড়ির পুরুষ সদস্যরা নতুন জোড় পরেন এবং বাড়ির মহিলারা প্রাচীন গহনায় সজ্জিত হন এবং মল্লিকবাড়ির ঠাকুরদালানে সাজোসাজো রব ওঠে। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন মায়ের বোধন হয় সন্ধ্যায়। সপ্তমীর দিন সকালে নবপত্রিকা স্নান হয় গঙ্গার ঘাটে গিয়ে। মহাষ্টমীর দিন মায়ের বিশেষ পূজা হয় আর সন্ধিপূজায় ১০৮টি দীপদান হয়। সন্ধিপূজা শুরুর আগে বাড়ির মহিলারা ধুনো পোড়ানোয় যোগ দেন। কুমারীপুজোর রীতিও রয়েছে মল্লিকবংশে মহানবমীর দিন। মহালয়া থেকেই বাড়ির সদস্যরা সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার করেন।

এই মল্লিকবংশের যদুলাল মল্লিকের ঠাকুরদালানে মা সিংহবাহিনীকে দর্শন করে সমাধিস্থ হয়েছিলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ। দিনটা ছিল ১৮৮৩ সালের ২১ জুলাই, আষাঢ় কৃষ্ণা প্রতিপদ। সেই দিনটির বর্ণনা করে শ্রীম ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’-এ লিখেছেন, “যে-ঘরে সিংহবাহিনীর নিত্যসেবা হইতেছে ঠাকুর সেই ঘরে ভক্তসঙ্গে উপস্থিত হইলেন। মা সচন্দন পুষ্প ও পুষ্প-মালা দ্বারা অর্চিত হইয়া অপূর্ব শ্রী ধারণ করিয়াছেন। সম্মুখে পুরোহিত উপবিষ্ট। প্রতিমার সম্মুখে ঘরে আলো জ্বলিতেছে।…ঠাকুর সিংহবাহিনীর সম্মুখে হাতজোড় করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। পশ্চাতে ভক্তগণ হাতজোড় করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। ঠাকুর অনেকক্ষণ ধরিয়া দর্শন করিতেছেন। কি আশ্চর্য, দর্শন করিতে করিতে একেবারে সমাধিস্থ। প্রস্তরমূর্তির ন্যায় নিস্তব্ধভাবে দণ্ডায়মান। নয়ন পলকশুন্য!”

Continue Reading

দুর্গা পার্বণ

সপ্তমীতে থানকাপড়ে সিঁদুর দিয়ে কলাবউকে সাজানো হয় খড়দহের নিত্যানন্দপ্রভুর প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজোয়

নিত্যানন্দপ্রভু যখন দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন তখন একজন তাঁকে থান দান করেছিলেন। তাই তিনি তখন কলাবউকে সেই কাপড় পড়িয়েছিলেন আর সধবার চিহ্ন হিসাবে সিঁদুরের রেখা টেনে দিয়েছিলেন।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

দুর্গাপুজো বঙ্গের এক প্রাচীন উৎসব। দুর্গাপুজো শরৎ ও বসন্তু এই দুই ঋতুতেই সম্পন্ন হয়। বসন্তকালে যে পূজা হয় তা বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত এবং শরৎকালে যে পূজা হয় তা শারদীয়া নামে পরিচিত।

বঙ্গদেশের বিভিন্ন প্রাচীন বনেদিবাড়িতে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীবন্দনা করা হয়। কোনো পুজোর বয়স হয়তো ২০০ বছর, আবার কোনো পুজো হয়তো ৪০০ বছরেরও প্রাচীন। কোথাও তিনি মহিষদলনী দশভূজা রূপে পূজিতা, আবার কোথাও তিনি শিবক্রোড়ে অধিষ্ঠিতা হয়ে অভয়দান করছেন। তেমনই এক প্রাচীন পুজো হল খড়দহে শ্রীশ্রী নিত্যানন্দপ্রভুর প্রচলিত কাত্যায়নীবন্দনা, যা আজও অব্যাহত রয়েছে প্রাচীন রীতি মেনেই।

প্রসঙ্গত ১৩৯৫ শকাব্দে (১৪৭৩ খ্রিস্টাব্দ) মাঘ মাসের শুক্ল ত্রয়োদশী তিথিতে মধ্যাহ্নে বীরভূমের একচক্রা গ্রামে নিত্যানন্দপ্রভু আবির্ভূত হয়েছিলেন। পিতা হাড়াই পণ্ডিত (ওঝা) এবং মাতা পদ্মাদেবী। ছেলেবেলা থেকেই কৃষ্ণ-কৃষ্ণ খেলা, পূতনাবধ, সংকটভঞ্জন, কালীয়দমন এই সমস্ত খেলায় মেতে থাকতেন নিত্যানন্দ। ন’ বছর বয়সে নিত্যানন্দের উপনয়ন হয় এবং নিতাইচাঁদের বয়স যখন বারো (১৪০৭ শকাব্দ অর্থাৎ ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দ) তখন নবদ্বীপধামে গৌরচন্দ্রের উদয় হয়।

একদিন শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী এলেন হাড়াই পণ্ডিতের বাড়িতে আতিথ্য নিতে এবং তিনি নিত্যানন্দকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বিভিন্ন তীর্থদর্শনে – বক্রেশ্বর থেকে বৈদ্যনাথ, তার পর গয়া, কাশী, প্রয়াগ, মথুরা, বৃন্দবন ইত্যাদি নানা স্থানে ভ্রমণ করলেন। এর পর নবদ্বীপে এসে উপস্থিত হলেন প্রভু নিত্যানন্দ। এ দিকে শ্রীবাস, হরিদাসকে নিমাই বললেন নবদ্বীপে খুঁজে আসতে, কোনো মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়েছে। কেউ খুঁজে না পেলে নিমাই নিজে গেলেন নন্দন আচার্যের বাড়িতে। সেটিই প্রথম সাক্ষাৎ নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সঙ্গে চৈতন্য মহাপ্রভুর।

এর বেশ কিছু কাল পর গৌরাঙ্গের নির্দেশে সন্ন্যাসী হওয়া সত্ত্বেও প্রভু নিত্যানন্দকে গৃহাশ্রমী হতে হল। তাই ১৪৪১ শকাব্দে (১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) এক শুভক্ষণে নিতাইচাঁদের সঙ্গে বসুধা দেবীর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর প্রভু নিত্যানন্দ খড়দহে বসতি স্থাপন করলেন এবং এই বসতি স্থাপনের জন্য শ্রী পুরন্দর পণ্ডিত প্রভু নিত্যানন্দকে ২৬ বিঘা জমি দান করেছিলেন। যে স্থানে নিত্যানন্দপ্রভু বসতি স্থাপন করেছিলেন বর্তমানে সেই ভবন ‘কুঞ্জবাড়ি’ নামে পরিচিত। শ্রীনিতাইচাঁদ সঙ্গে নিয়ে আসেন অনন্তদেব, ত্রিপুরাসুন্দরী যন্ত্র ও নীলকণ্ঠ বিগ্রহ। এই বিগ্রহ নিতাইচাঁদের পারিবারিক বিগ্রহ। এই খড়দহে প্রভু নিত্যানন্দ দশভূজা মাকে কাত্যায়নী রূপে পূজা করেছিলেন। পরবর্তী কালে বহু বংশধরের বাড়িতেই পুজো হত। তবে বর্তমানে মেজোবাড়ি ও বড়োবাড়িতে সেই প্রাচীন ধারা বজায় রেখে আজও পুজো হয়।

প্রভু নিত্যানন্দ এই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন আনুমানিক ১৪৫২ শকাব্দে (১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে)। এ বছর এই বনেদি পুজো ৪৯১ বছরে পদার্পণ করল। সেই প্রাচীন ধারা ও ঐতিহ্য আজও যেন নিত্যানন্দপ্রভুর বংশধরদের পুজোতে সম্পূর্ণ ভাবে পাওয়া যায়।

এই বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব হল দেবীর দু’ পাশে অবস্থান করেন দেবীর দুই সখী জয়া এবং বিজয়া। এই বাড়িতে দেবী একচালায় ডাকের সাজে সজ্জিত হন। এ ছাড়া পরিবারের প্রাচীন গহনা দিয়েই সাজানো হয় কাত্যায়নীকে। তবে এই বাড়িতে দেবীর বাহন সিংহ কিন্তু ঘোটকাকৃতি বলেই উল্লেখ করলেন নিত্যানন্দপ্রভুর বংশধর প্রভুপাদ সরোজেন্দ্র মোহন গোস্বামী মহাশয়।

এই বাড়ির পুজোর সূচনা হয় উল্টোরথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। মহালয়ার আগে নবমীতিথিতে মেজোবাড়ির মা চণ্ডী শ্যামসুন্দর জিউ-এর মন্দিরে যান। সেখানে চণ্ডীপাঠ হয়। মা চণ্ডী আবার ফিরে আসেন প্রতিপদের দিন। আর সেই দিন থেকেই চণ্ডীর পুজো শুরু হয় খড়দহের গোস্বামীবাড়িতে।

দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিনে বোধন শুরু হওয়ার পর দেবী প্রতিমাকে বেদিতে স্থাপন করা হয়। সপ্তমীর দিন নবপত্রিকার স্নান হয়। তবে এই বাড়িতে নবপত্রিকাকে সাদা থানের কাপড় পড়ানো হয়। কারণ অতীতে নিত্যানন্দপ্রভু যখন দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন তখন একজন তাঁকে থান দান করেছিলেন। তাই তিনি তখন কলাবউকে সেই কাপড় পড়িয়েছিলেন আর সধবার চিহ্ন হিসাবে সিঁদুরের রেখা টেনে দিয়েছিলেন। সেই প্রাচীন নিয়ম আজও চলে আসছে প্রভু নিত্যানন্দের বংশধরদের পুজোয়।

এই পরিবারে কোনো রকম পশু বলিদানের চল নেই। শুধুমাত্র মাসকলাই বলিদান করা হয় এই বনেদিবাড়িতে। দেবীকে কেন্দ্র করে যে সব সহচরী অপদেবতারা থাকে তাদের উদ্দেশেই এই মাসকলাই বলিদান করা হয়।

আরও পড়ুন: অভয়ারূপে দুর্গার আরাধনা কলুটোলার ধরবাড়িতে যেখানে চৈতন্যসভায় সমাধিস্থ হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ

বাড়ির এই পুজোকে কেন্দ্র করে কলকাতার বাইরে থাকা প্রায় সমস্ত আত্মীয়পরিজন চলে আসেন পুজোর অমলিন আনন্দের ভাগীদার হতে। এই বাড়ির পুজোয় দেবীকে বিভিন্ন রকমের পদ ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয়। প্রভুপাদ সরোজেন্দ্রবাবু জানালেন, ভোগে থাকে সাদাভাত, শুক্তনি, মুগঘণ্ট, খিচুড়ি, বেগুনভাজা, মুগের ডাল, পোস্ত, চচ্চড়ি, পুষ্পান্ন, ধোঁকা, ছানার কালিয়া, চাটনি, পরমান্ন, মিষ্টান্ন ইত্যাদি। দশমীর দিন পান্তাভাত, কচুর শাক, চালতার চাটনি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। এ ছাড়া এই পরিবারে ধুনো পোড়ানোর রীতিও রয়েছে।

দশমীর দিন নিত্যানন্দ পরিবারের সদস্যদের সিঁদুরখেলার পর প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। আগে দেবীকে জোড়া নৌকায় তুলে গঙ্গাবক্ষে ঘুরিয়ে তার পর বিসর্জন দেওয়া হত। সে প্রথা আজ বন্ধ। প্রতিমা নিরঞ্জনের পর পরিবারের সকল সদস্য শ্যামসুন্দরের মন্দিরে উপস্থিত হন এবং পুরোহিত সবাইকে শ্যামসুন্দরের পরিহিত কৌপিনের টুকরো বেঁধে দেন। এই প্রথাকে প্রভু নিত্যানন্দ মিলনের প্রতীক হিসাব দেখিয়েছিলেন। এই ভাবে প্রাচীন ঐতিহ্য ও রীতিনীতি মেনে আজও খড়দহে নিত্যানন্দ পরিবারে কাত্যায়নীর আরাধনা হয় নিষ্ঠার সঙ্গে।

Continue Reading

দুর্গা পার্বণ

অভয়ারূপে দুর্গার আরাধনা কলুটোলার ধরবাড়িতে যেখানে চৈতন্যসভায় সমাধিস্থ হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ

কৃষ্ণচন্দ্র ধর ১৮৬০ সালে কলকাতায় মূর্তিপুজোর প্রচলন করলেন।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

দুর্গার আরাধনা বহু দিন ধরেই চলে আসছে এ দেশে। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের তন্ত্রসারে দুর্গাপুজোর বিবরণ রয়েছে। এই গ্রন্থে দেবীর যে ধ্যান রয়েছে সেখানে তিনি চতুর্ভূজা, সিংহবাহিনী, শঙ্খ-চক্র-ধনুর্বাণধারিণী, মরকতবর্ণা। এই তন্ত্রসার গ্রন্থেই রয়েছে দেবী দুর্গার ‘মহিষমর্দিনী’ মন্ত্র। মহিষমর্দিনী দেবীর দেহকান্তি মরকতমণির ন্যায়, ইনি মণিময় মুকুট ও কুণ্ডল দ্বারা শোভামানা, ত্রিনয়না এবং মহিষের মস্তকে উপবিষ্টা।

আবার দেবীভাগবতের মতে, পরমাব্রহ্মরূপিণী প্রকৃতি দুর্গা, রাধা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও সাবিত্রী – এই পঞ্চবিধ রূপ ধারণ করেছিলেন। প্রকৃতির প্রধান অংশরূপিণী কমলানয়না কালী, দুর্গার ললাট থেকে শুম্ভ-নিশুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধকালে আবির্ভূতা হয়েছিলেন। তিনি দুর্গার অর্ধাংশরূপিণী হলেও তেজে ও গুণে তাঁরই সমতুল্যা। তিনি কোটি সূর্যসম উজ্জ্বল বিগ্রহধারিণী, সমস্ত শক্তির মধ্যে প্রধান বলস্বরূপা ও পরম বলবতী।

আরও পড়ুন: দুর্গাপুজোয় দেবীর চক্ষুদানের সময় প্রতীকী বলিদান হয় চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবারে

প্রসঙ্গত দেবীদুর্গার নানা রূপের মধ্যে বনদুর্গার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শুভ কাজে কোথাও কোথাও এই দুর্গার পুজো হয়ে থাকে। বনদুর্গাও তন্ত্রের দেবী। বনদুর্গা মদমত্তা, তাঁর মহালোচন অঘূর্ণিত তাঁর মুখমণ্ডল ভীষণাকার, মস্তকে জটাভার, গলদেশে নরকপালের মালা। বস্তুতপক্ষে এই বনদেবীর উল্লেখ আমরা আরও বেশি পাই চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে, কারণ দেবী চণ্ডীর প্রকৃত নাম ‘অভয়া’, তাই চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের অপর নাম ‘অভয়ামঙ্গল’। এখানে দেবী মহিষাসুর বিনাশিনী নন, এখানে তিনি বন্যদেবী বিন্ধ্যবাসিনী। তিনি বনের পশুদের অভয় দান করেন অর্থাৎ তিনি পশুদের রক্ষাকারিণী। এই ‘অভয়া’ অর্থাৎ যিনি ভক্তের ভয় দূর করেন সেই বন্যদেবীর থেকেই শারদীয়া দুর্গাপুজোয় অভয়াদুর্গা মূর্তির উৎপত্তি। এখানে তিনি দশভূজা নন, তিনি দ্বিভূজা এবং পদতলে সিংহ রয়েছেন। এমন বিগ্রহ বহু প্রাচীন বনেদিবাড়িতেই দেখা যায় যেখানে বছরের পর বছর পুজো হয়ে আসছে ধারাবাহিক ভাবে।

আবার অপর এক যুক্তিতে দেবীর সঙ্গে যখন মহিষাসুরের প্রবল সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তখন মহিষাসুর মায়ার দ্বারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তখনও তিনি দেবীকে পরাজিত করতে পারছিলেন না। যখন দেখলেন যে দেবী দুর্গার কাছে তাঁর পরাজয় নিশ্চিত, তখন তিনি করজোড়ে মিনতি করলেন এবং ক্ষমাভিক্ষা করলেন। তখন দেবী দুর্গা আপন রূপ ধারণ করে মহিষাসুরকে অভয়দান করলেন। সেই থেকেই মায়ের এমন অভয়রূপ।

তেমনই এক বনেদিবাড়ি রয়েছে মধ্য কলকাতার কলুটোলা অঞ্চলে, যেখানে মায়ের  অভয়ারূপের আরাধনা হয়। এই অঞ্চলের দেবেন্দ্র মল্লিক স্ট্রিট ও ফিয়ার্স লেনের সংযোগস্থলেই বসবাস করেন ধর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দুর্গাদালানেই আজও পুজো পেয়ে আসছেন অভয়ারূপী মা দুর্গা।

এই পরিবারের আদি নিবাস ছিল চন্দননগরের সরিষাপাড়ায়। ইংরেজদের সঙ্গে লবণ ও চিনির ব্যবসা করার জন্য সেই অঞ্চল থেকে কলকাতায় চলে আসেন ধরবাড়ির আদিপুরুষ সাফুল্যরাম ধর। ব্যবসায় প্রভূত অর্থ লাভ করেই তিনি কলুটোলায় ২০ কাঠা জমির ওপর তিনমহলা বাড়ি নির্মাণ করেন। এই তিনমহলা বাড়ির মধ্যে একটি বসতবাড়ি, একটি দোলবাড়ি এবং একটি ঠাকুরবাড়ি। এই দোলবাড়ি ও ঠাকুরবাড়িতেই ছিল ঝাড়বাতির আলোয় সাজানো সাবেকি সাজসজ্জা, যেখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে কাননদেবী পর্যন্ত বিখ্যাত সব মানুষের পা পড়েছিল।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাফুল্যরাম ধরের পঞ্চমপুরুষ পূর্ণচন্দ্র ধরের বসতবাড়িতে (৩২এ ফিয়ার্স লেন) ১৮৭১ সালের শুরুর দিকে এসেছিলেন ভগবান শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, এক চৈতন্যসভায়। সে দিন আত্মহারা অবস্থায় চৈতন্য-আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে ঠাকুর সমাধিস্থ হয়েছিলেন। ওই আসনটি বর্তমানে না থাকলেও এখনও স্থানটি সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে এই পবিত্রস্থানটিতে দুর্গাপুজোর সময় হোম করা হয়।

বলা বাহুল্য ধরবাড়ির সদস্যদের আদিপরিচয় ব্যবসায়ী হলেও পরবর্তী কালে দু’টি প্রখ্যাত ব্রিটিশ কোম্পানি বেনিয়ান হিসাবে এই পরিবারের কর্তাদের নিয়োগ করেন এবং এঁদের দ্বারাই বহু আত্মীয়পরিজনের চাকরি হয়েছিল ওই কোম্পানিদু’টিতে। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় এই পরিবারের গয়নাগাটি, আসবাবপত্র, ধনসম্পত্তি লুট হয়ে গেলে তখন ওই কোম্পানিদু’টির সাহায্যেই ধরবাড়ির তৎকালীন বংশধরেরা ঘুরে দাঁড়ান।

ধরবাড়ির আদি নিবাস চন্দননগরে মায়ের পুজো হত ঘটে। কৃষ্ণচন্দ্র ধর ১৮৬০ সালে কলকাতায় মূর্তিপুজোর প্রচলন করলেন। সোজা রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে পুজোর সূচনা হয় বলেই জানালেন পরিবারের সদস্য অসীম কুমার ধর। তার পর এক শুভদিন দেখে মায়ের মৃন্ময়ীরূপ গড়ার কাজ শুরু হয় ঠাকুরদালানেই। ধরবাড়ির ঠাকুরদালানে দেবী একচালায়, ডাকের সাজে সজ্জিতা এবং দ্বিভুজা। কোনো মহিষাসুর নেই, মায়ের পদতলে দু’টি সিংহ। মা সৌম্য, শান্তস্নিগ্ধ রূপে বিরাজ করেন। এই পরিবারের একচালার বিগ্রহের চালচিত্রে মহাদেব, রাধাকৃষ্ণ এবং নবদুর্গার বিভিন্ন রূপ অঙ্কিত থাকে এবং দেবীর দুই পাশে থাকেন দুই সহচরী জয়া এবং বিজয়া।

প্রতিপদ তিথিতেই বোধন শুরু হয়, সেই দিন থেকেই চণ্ডীপাঠ, আরতি শুরু হয়ে যায়। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস হয়। সপ্তমীর দিন সকালে মতিলাল শীল ঘাটে নবপত্রিকা স্নান করানো হয়। মহাষ্টমীর দিন বাড়ির মহিলারা ধুনো পোড়ানোয় যোগ দেন এবং ধরবাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণবমতে, ‘বৃহৎনান্দীকেশ্বর’ পুরাণ মতে। সন্ধিপূজায় মাসকলাই বলিদান হয় এবং মহানবমীর দিন কুমারীপুজো ও সধবাপুজো হয়। পুজো করেন বাড়ির সধবা মহিলারাই।

এই বাড়ির পুজোর সময় চালের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। সঙ্গে থাকে নানা রকমের ফল, লুচি, কচুরি, পাঁচ রকমের ভাজা, নারকেলনাড়ু, মালপোয়া, দই, ক্ষীর, গজা, মুগের নাড়ু ইত্যাদি। ধর পরিবারের সদস্যরা বোধন থেকে মহাষ্টমী পর্যন্ত নিরামিষ আহার করেন। মহানবমীর দিন পুজো শেষ হলে ব্রাহ্মণদের মৎস্যমুখ করিয়ে তবে পরিবারের সদস্যরা মৎস্যমুখ করেন।

দশমীর দিন বরণের পর কনকাঞ্জলি দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। প্রাচীন রীতি মেনে আজও ধরবাড়ির দেবী কাঁধে করে বিসর্জনে যান। বাড়ির বয়ঃজেষ্ঠ্য সদস্যরা দেবীর সামনে চামর দোলাতে দোলাতে ঘাট অবধি যান। বিসর্জন শেষে বাড়ি ফিরে নতুন কাপড় পরে শান্তির জল গ্রহণ করেন পরিবারের সদস্যরা। এই ভাবেই শেষ হয় কলুটোলার ধরবাড়ির পুজো।

এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে বাইরের দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানালেন ধরবাড়ির বধূ শর্মিষ্ঠা ধর।   

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
রাজ্য42 mins ago

বঙ্গোপসাগরে নতুন নিম্নচাপ, তবুও এখনই টানা বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই দক্ষিণবঙ্গে

coronavirus
দেশ1 hour ago

অমিত শাহ, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পর কোভিডে আক্রান্ত আরও এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

বিনোদন1 hour ago

২৮দিন পর করোনা মুক্ত অভিষেক বচ্চন

দেশ1 hour ago

পাখির সঙ্গে সংঘর্ষ, উড়তে গিয়ে রাঁচি বিমানবন্দরে ফিরল এয়ারএশিয়ার বিমান

কলকাতা2 hours ago

অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে জানলার কাচ ভেঙে মেডিক্যালের কার্নিশে করোনা রোগী!

দেশ3 hours ago

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক লক্ষ কোটি টাকার কৃষি-কাঠামো তহবিল চালু করবেন রবিবার

দেশ4 hours ago

মুদি দোকানের মালিক-কর্মীদেরও পরীক্ষা করাতে হবে, রাজ্যগুলিকে চিঠি কেন্দ্রের

গাড়ি ও বাইক5 hours ago

করোনা মোকাবিলায় বিশেষ ভাবে তৈরি ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার ভেহিকল’ তুলে দিল হিরো মোটোকর্প

রবিবারের খবর অনলাইন

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

ঘর ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম কিনতে চান? অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ৫০% পর্যন্ত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্ক : অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ঘর আর রান্না ঘরের একাধিক সামগ্রিতে প্রচুর ছাড়। এই সেলে পাওয়া যাচ্ছে ওয়াটার...

কেনাকাটা2 days ago

এই ১০টির মধ্যে আপনার প্রয়োজনীয় প্রোডাক্টটি প্রাইম ডে সেলে কিনতে পারেন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : চলছে অ্যামাজনের প্রাইমডে সেল। প্রচুর সামগ্রীর ওপর রয়েছে অনেক ছাড়। ৬ ও ৭  তারিখ চলবে এই সেল।...

কেনাকাটা3 days ago

শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল, জেনে নিন কোন জিনিসে কত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্: শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল। চলবে ২ দিন। চলতি মাসের ৬ ও ৭ তারিখ থাকছে এই অফার।...

things things
কেনাকাটা1 week ago

করোনা আতঙ্ক? ঘরে বাইরে এই ১০টি জিনিস আপনাকে সুবিধে দেবেই দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ সাবধানতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক মাস এই নিয়মই অব্যাহত...

কেনাকাটা2 weeks ago

মশার জ্বালায় জেরবার? এই ১৪টি যন্ত্র রুখে দিতে পারে মশাকে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: একে করোনা তায় আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এই সময় প্রতি বারই মশার উৎপাত খুবই বাড়ে। এই বারেও...

rakhi rakhi
কেনাকাটা2 weeks ago

লকডাউন! রাখির দারুণ এই উপহারগুলি কিন্তু বাড়ি বসেই কিনতে পারেন

সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে মনের মতো উপহার কেনা একটা বড়ো ঝক্কি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে অ্যামাজন। অ্যামাজনের...

কেনাকাটা3 weeks ago

অনলাইনে পড়াশুনা চলছে? ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ৪০ হাজার টাকার নীচে ৬টি ল্যাপটপ

ইনটেল প্রসেসর সহ কোন ল্যাপটপ আপনার অনলাইন পড়াশুনার কাজে লাগবে জেনে নিন।

কেনাকাটা3 weeks ago

করোনা-কালে ঘরে রাখতে পারেন ডিজিটাল অক্সিমিটার, এই ১০টির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে এই অক্সিমিটার।

কেনাকাটা3 weeks ago

লকডাউনে সামনেই রাখি, কোথা থেকে কিনবেন? অ্যামাজন দিচ্ছে দারুণ গিফট কম্বো অফার

খবরঅনলাইন ডেস্ক : সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে দোকানে গিয়ে রাখি, উপহার কেনা খুবই সমস্যার কথা। কিন্তু তা হলে উপায়...

laptop laptop
কেনাকাটা3 weeks ago

ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ২৫ হাজার টাকার মধ্যে এই ৫টি ল্যাপটপ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : কোভিভ ১৯ অতিমারির প্রকোপে বিশ্ব জুড়ে চলছে লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনেকেই অফিস থেকে ল্যাপটপ পেয়েছেন।...

নজরে

Click To Expand