নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : বিঘার পর বিঘা চাষের জমি, চা-বাগান তলিয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, নদীর তীরে থাকা বাসিন্দারা নিজেরাই নিজেদের বাড়ি-ঘর ভেঙে মালপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিস্তা আর জলঢাকা নদী সংলগ্ন গ্রামগুলির এটাই চিত্র এখন জলপাইগুড়ি জেলায়।

পাহাড় এবং সমতলে চলতি সপ্তাহে কয়েক দিন টানা বৃষ্টির ফলে জলস্তর অনেকটাই বেড়েছে তিস্তা এবং জলঢাকা নদীর। তার ফলেই শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। রাজগঞ্জ ব্লকে তিস্তার ভাঙনে তলিয়ে গিয়েছে ধান-পাট-বাদাম খেত। বিঘার পর বিঘা চাষের জমি এখন জলের তলায়। মান্তাদারি, মিলনপল্লি, তাপসীভিটা এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ছয় হাজার পরিবার। ধনপতি রায় নামে মান্তাদারির এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, যে ভাবে তিস্তা নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করেছে তাতে যে কোনো দিন তাঁর বসতবাড়ি জলের তলায় চলে যাবে। মিলনপল্লির খলেন বর্মণ জানিয়েছেন, তাঁর পাঁচ বিঘে চাষের জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। ফলে চাষাবাদ বন্ধ রেখে দিনমজুরির রাস্তা বেছে নিতে হয়েছে।

এ দিকে জলঢাকা নদীর জলস্রোতে ভাঙন শুরু হয়েছে ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি ও রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন গ্রামে। নদীগর্ভে চলে গিয়েছে পান বাগান, সুপারি বাগান এবং ছোটো ছোটো চা-বাগান। খেমন পাড়া, পানবাড়ি, বর্মণপাড়া সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় তিনশো বিঘা জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পানবাড়ির উপেন্দ্রনাথ রায়ের একটি ছোটো চা-বাগান এখন নদীগর্ভে। ক্ষিতেন রায় নামে একজন জানিয়েছেন, তাঁর পান-সুপারি বাগানের অনেকটাই এখন জলের তলায়। এমনকি এলাকার একটি কাঁচা রাস্তাও জলের তলায় চলে গিয়েছে।

নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে চা-বাগানও।

এ দিকে বৃষ্টির ফলে জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় দফায় দফায় তিস্তা ব্যারেজ থেকে জল ছাড়া হচ্ছে। সেই জলের তোড়ে ময়নাগুড়ির পদমতী (১) এলাকায় একটি মাটির বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে জল ঢুকে পড়েছে। জলবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় চারশো পরিবার। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ একটাই, প্রশাসনের কাছে অবস্থার কথা বারবার জানানো হলেও তেমন কোনো ব্যাবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তাঁরা নিজেরাই বাড়িঘর ভেঙে মালপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যাঁদের সেই উপায় নেই, তাঁরা জলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছেন।

বস্তুত এই ভাঙন-সমস্যা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই বর্ষাকালে এই সব এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীর জলস্রোত বেশি থাকায় শুরু হয় ভাঙন। জল কমতে থাকলে ভাঙনের পরিমাণ আরও বাড়ে। নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলি অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গায় হওয়ায় জলবদ্ধতার সমস্যায় পড়ে। সেচ দফতরের ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি, বর্ষায় নদীর স্রোত এত বেশি থাকে যে এর মোকাবিলা করাও সম্ভব হয় না। জলের পরিমাণ কমতে শুরু করলে তখন সেচ দফতর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ শুরু করতে পারে।

তবে সোমবার ময়নাগুড়ির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে যান জলপাইগুড়ির জেলাশাসক রচনা ভগত। এখানে প্রায় তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত। জেলাশাসক জানিয়েছেন, রাজগঞ্জ ব্লকেও জেলা প্রশাসনের তরফে প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে। সেচ দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, বাঁশের প্ল্যাংকিং দিয়ে আপাতত ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। জল কমলে শুরু হবে সংস্কারের কাজ। জেলাশাসক জানিয়েছেন, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হয়েছে। বন্যাপরিস্থিতি তৈরি হলে, তার যাতে মোকাবিলা করা যায়, তার জন্য স্পর্শকাতর জায়গাগুলিতে ফ্লাড  কন্ট্রোল রুম তৈরি করা হয়েছে।  ত্রাণশিবির খোলার পাশাপাশি প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here