injured sudha devi

নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: সন্তান বা সন্তানসম পরিবারের সদস্যরা কি ‘মা’ শব্দটার অর্থ ভুলে যাচ্ছে? প্রায় প্রতি দিন মা বা শাশুড়ির ওপর অত্যাচারের ঘটনা সামনে আসায় এই প্রশ্নটাই এখন বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে।

বুধবার জলপাইগুড়ির নিউটনপাড়ায় বৃদ্ধা শাশুড়ির ওপর অত্যাচারের অভিযোগ সামনে এসেছিল। বৃহস্পতিবার ফের বিরাশি বছরের এক বৃদ্ধা জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে হাজির হলেন জলপাইগুড়ির প্রোটেকশন অফিসার সইফুল্লা আহমেদের কাছে। এ বারের ঘটনাস্থল জলপাইগুড়ি জেলার ক্রান্তিহাট। একটি ছোট্টো জনপদ। বছর বিরাশির সুধা রায় সাহা। আজ দুপুরে যখন তিনি প্রোটেকশন অফিসারের কাছে আসেন, তখনও তাঁর মাথা জুড়ে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা, হাতে কালশিটে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাহায্য নিয়ে কোনো রকমে জলপাইগুড়ি এসেছেন।

তাঁর অবস্থা দেখে রীতিমত চমকে যান সইফুল্লা সাহেব। তাঁর দফতর পারিবারিক হিংসা রুখতে কাজ করে। জলপাইগুড়ি জেলাশাসকের দফতরের অধীনেই রয়েছে দফতরটি। প্রায় প্রতি দিনই অত্যাচারিত গৃহবধূ বা শাশুড়ির ঘটনা সামনে আসে। কিন্তু অশীতিপর এক বৃদ্ধাকে এই ভাবে আহত অবস্থায় দেখে তিনিও কিছুটা অসহায় হয়ে পড়েন। তাঁকে নিজের ঘরে বসিয়ে এমন অবস্থার কারণ জানতে চান। কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন বৃদ্ধা। পরে ভাঙা গলায় জানান, মেজো ছেলের বউ এবং তরুণী নাতনি এই অবস্থা করেছে তাঁর, যাতে ইন্ধন জুগিয়েছে মেজো ছেলে রঞ্জন।

সুধা দেবী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। এখন পেনশনভোগী। স্বামী অনেক দিন আগেই গত হয়েছেন। তিন ছেলে এবং দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সম্পত্তির বেশির ভাগটাই তাঁদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। নিজের সম্বল বলতে এক ফালি জমিতে দু’টি ঘর এবং পেনশনের দশ হাজার টাকা। সমস্যার সূত্রপাতও সেই সবকে ঘিরেই। অন্য ছেলেমেয়েরা বাইরে থাকে। শুধু মেজো ছেলে রঞ্জন সাহা, স্ত্রী নমিতা এবং মেয়ে শুক্লাকে নিয়ে পাশেই থাকেন।

sudha devi filing complaints before protection officer
প্রোটেকশন অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করছেন সুধা দেবী।

বৃদ্ধার শেষ সম্বল ঘর-সহ এক ফালি জমিটুকু তাঁদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দেন মেজো ছেলে রঞ্জন ও তাঁর স্ত্রী। বৃদ্ধার অভিযোগ, পেনশনের টাকাটাও হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বৌমা ও নাতনি। কিন্তু সেই কথা না মানাতেই দীর্ঘদিন ধরেই শুরু হয়েছে অত্যাচার। অকথ্য গালিগালাজের পাশাপাশি গায়ে হাত তোলাও বাদ যায় না। আগে খেতে দিলেও এখন তা বন্ধ। বৃদ্ধাই নিজে কোনো রকমে দু’টি চাল-ডাল ফুটিয়ে নেন। তবে তাতেও রেহাই নেই। পেনশনের টাকাটা যাতে খরচ করে না ফেলেন তার জন্য সুধাদেবীকে বাইরে বের হতে দেওয়া হয় না। গত রবিবার এই পেনশনের টাকা নিয়েই কথা কাটাকাটি হয়। সেই সময় পুত্রবধূ নমিতা এবং নাতনি শুক্লা কুয়োর পাড়ে তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে যায়। তার পরও তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে টের পেয়ে পাড়াপড়শিরাই বৃদ্ধাকে নিয়ে ক্রান্তি গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সোমবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও নিজের বাড়িতে যাওয়ার সাহস পাননি সুধাদেবী। যদি আবার মারে! আপাতত ছোটো মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাতেও শান্তি নেই। গুণধর মেজো ছেলে বোনকেও হুমকি দিতে ছাড়েননি মাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য।

সুধাদেবী হাসপাতালে থাকার সময় বিষয়টি জানতে পেরে উদ্যোগী হয়েছিল ‘ইন্সপায়ার’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তারাই বৃহস্পতিবার বৃদ্ধাকে নিয়ে প্রোটেকশন অফিসারের কাছে আসেন। সংগঠনের সদস্য পূজা সরকার জানিয়েছেন, বৃদ্ধার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা লড়াই চালিয়ে যাবেন। বৃদ্ধার আক্ষেপ, “শিক্ষিকা হয়ে কত জনকে মানুষ করেছি। অথচ নিজের ছেলেকেই মানুষ করতে পারলাম না”।

যদিও যোগাযোগ করা হলে বৃদ্ধার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী রঞ্জন সাহা সমস্ত ঘটনাই উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বেশি বয়েস হয়ে যাওয়াতে মা ভুলভাল কথা বলেন। পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটেছে বলে দাবি তাঁর। তবে বৃদ্ধার ছোটো মেয়ের ঘরের নাতনি রুদ্রাণী সরকার জানিয়েছেন, মামা-মামীই ঘটনার জন্য দায়ী। একই দাবি জানিয়েছেন ‘ইন্সপায়ার’-এর সভাপতি প্রিয়াঙ্কা চন্দও।

প্রোটেকশন অফিসার সইফুল্লা আহমেদ বৃদ্ধার কথা শুনে যতটা দুঃখিত ততটাই ক্ষুদ্ধ। পেটের সন্তান বা সন্তানসম পূত্রবধু, নাতনির এমন ভূমিকা খুবই ন্যাক্কারজনক, জানিয়েছেন তিনি। বৃদ্ধার সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনি ভাবে আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা নিয়ে উদ্যোগী হবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রোটেকশন অফিসারের পাশাপাশি জলপাইগুড়ির মহুকুমা শাসক রঞ্জন দাসকেও লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন সুধাদেবী। তবে অভিযোগ জানালেও সুধাদেবীর বক্তব্য, তিনি নিজের বাড়িতে ফিরতে পারলেই খুশি। ছেলে,পুত্রবধূ বা নাতনির যেন বড় কোনো শাস্তি না হয়, আকুতি তাঁর।

এই বোধহয় ‘মা’, যার অর্থ ‘অর্থলোভী’ স্বার্থপর সন্তানেরা ভুলে গিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here