nadir shah and his wife rakhi

নিজস্ব সংবাদদতা, জলপাইগুড়ি: রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে ট্রেজারি কর্তার অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে। নাদির শাহ নামে ওই আধিকারিকের বুধবার গভীর রাতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় নিজের সরকারি আবাসনে।

শুক্রবার জলপাইগুড়ি হাসপাতাল মর্গে তার দেহ ময়নাতদন্ত হয়নি। দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক আশিস সরকার জানিয়েছেন, কিছু লক্ষণ দেখে মৃত্যু স্বাভাবিক নয় বলেই মনে হয়েছে। এটা আত্মহত্যার ঘটনা নাও হতে পারে, জানিয়েছেন চিকিৎসক। কোতোয়ালি থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করেছেন মৃত আধিকারিকের বাবা।

deadbody of nadir
নাদির শাহের দেহ।

জলপাইগুড়ি ট্রেজারি অফিসের অতিরিক্ত ট্রেজারি আধিকারিক ছিলেন নাদির শাহ। তাঁর বাড়ি কলকাতার বড়বাজারে। বছর দেড়েক আগে মুর্শিদাবাদের রাখির সঙ্গে বিয়ে হয়। গত জানুয়ারি মাসে জলপাইগুড়িতে বদলি হয়ে আসেন। তিনি স্ত্রী রাখিকে নিয়ে জলপাইগুড়ির রাজবাড়ি পাড়ায় কম্পোজিট কমপ্লেক্সে সরকারি আবাসনে থাকতেন। বুধবার রাতে নাদির শাহের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় সেই আবাসনেই। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ওই দিন রাত ১টা নাগাদ স্ত্রী রাখি তাঁদের জানান, গলায় ফাঁস দিয়ে তাঁর স্বামী আত্মহত্যা করেছেন। ওই আবাসনেরই বাসিন্দা স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের সাহায্যে তাঁকে রাতেই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকে তাঁর স্ত্রী রাখি উধাও হয়ে যান। এখানে মৃত নাদির শাহের বাড়ির কেউ না থাকায় তাঁর দেহ বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে জানা যায় রাখি প্রশাসনিক কর্তাদের সাহায্যে জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসে রয়েছেন। ওই দিন রাতে নাদিরের বাবা নাসির শাহ জলপাইগুড়ি আসেন। তিনিও সার্কিট হাউসেই রাত্রিবাস করেন। কিন্তু মৃতের স্ত্রী বা বাবার আড়ালে থাকা এবং কোনো কথা বলতে না চাওয়ায় ঘটনা নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়।

শুক্রবার জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তাকে ঘিরে জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ট্রেজারি দফতরের কর্তাদের পাশাপাশি মর্গে আসেন অতিরিক্ত জেলাশাসক সুমেধা প্রধান। তবে তিনি কিছু বলতে চাননি।

যদিও মর্গে দেহ দেখার পর চিকিৎসক জানিয়ে দেন এখানে এর ময়নাতদন্ত সম্ভব নয়। মৃতদেহের কিছু লক্ষণ দেখে ডাঃ আশিস সরকার জানিয়েছেন, এটা আত্মহত্যা নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাইক্রোস্কোপি এগজামিশনের দরকার রয়েছে, যা মেডিক্যাল কলেজেই সম্ভব। তবে এটি খুন কিনা তা এখনই বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ওই চিকিৎসক। শুক্রবার বিকেলেই দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে।

nadir's father nasir shah
নাদিরের বাবা নাসির শাহ ও অন্যান্য ব্যক্তি।

এ দিকে অভিযোগ উঠেছে, দেহ ময়নাতদন্ত নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন মৃতের বাবা নাসির শাহ। চিকিৎসকের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলতে রাজি হননি তিনি। শুধু বলেছেন, পরে সব জানাবেন। রহস্যজনক ভাবে কিছু বলতে চাননি মৃতের স্ত্রী রাখিও।

যদিও রাখি শাহর ভাই এবং মৃতের শ্যালক তাহের শেখ কিন্তু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন তাঁর জামাইবাবুর বিরুদ্ধে। তাঁর দাবি, এর আগেও একটি বিয়ে করেছিলেন নাদির শাহ। সেই সম্পর্ক লুকিয়ে রাখীকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর সে কথা জানতে পারার পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে অশান্তি চরমে ওঠে রাখীর। তাহেরের আরও অভিযোগ, একাধিক মহিলার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল নাদির শাহের, যাঁদের মধ্যে একজন জলপাইগুড়ির। যা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকত। রাখী বেশ কয়েক বার সে কথা জানিয়েছিলেন তাঁর পরিবারকে।

rakhi's brother taher sheikh
রাখির ভাই তাহের শেখ।

একই বক্তব্য পাওয়া গিয়েছে ওই সরকারি আবাসনের অন্য বাসিন্দাদের কাছ থেকে। সুরজনী চ্যাটার্জি নামে এক প্রতিবেশী গৃহবধূ  জানিয়েছেন, ওই দম্পতির ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তা এতটাই উচ্চগ্রামে হত যে অন্যান্য ফ্ল্যাট থেকেও তা শোনা যেত। ঘটনার দিনও দীর্ঘক্ষণ ধরেই ঝগড়ার আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল, জানিয়েছেন আবাসনের বাসিন্দারা। রাত ১টা নাগাদ ঘর থেকে বের হয়ে রাখিদেবী চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডাকতে থাকেন। রাখিদেবী প্রতিবেশীদের জানিয়েছিলেন, তাঁর স্বামী ফাঁস লাগিয়েছেন। তখন আবাসনেরই বাসিন্দা স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিক তাঁর ফ্ল্যাটে যান।

সূত্রের খবর, তখন নাদির শাহের দেহ বিছানায় শোয়ানো ছিল। এর পর ওই আধিকারিকের সাহায্য নিয়েই অ্যাম্বুলেন্স ডেকে স্বামীর দেহ নিয়ে জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসক জানিয়ে দেন, তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এর পর রাখিদেবী আর ওই আবাসনে ফিরে যাননি। দিনভর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। যা নিয়ে বিস্মিত তাঁর প্রতিবেশীরাও। এর পর বিকেলে জানা যায়, জেলা প্রশাসনিক কর্তাদের তত্ত্বাবধানে তিনি সার্কিট হাউসে রয়েছেন। রাতে সেখানেই এসে ওঠেন মৃতের বাবা নাসির শাহ। শুক্রবার দুই পরিবারের অন্যরাও জলপাইগুড়ি আসেন। বিকেলে কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন নাসির শাহ। ছেলের মৃত্যু খুন কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগপত্রে।

তবে প্রথম থেকেই এই ঘটনা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে পরতে পরতে। উঠছে অনেক প্রশ্ন। ছেলের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেও কেন মৃতের বাবা কিছু বলতে নারাজ? ছেলের অতীতের ঘটনা ঢাকতেই কি মুখে কুলুপ এঁটেছেন তিনি? আসার পর থেকেই বউমা রাখিকে সংবাদ মাধ্যম থেকে আড়ালে রাখার প্রক্রিয়া চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। যদিও থানা থেকে বের হওয়ার সময় এক ফাঁকে রাখিদেবী জানিয়েছেন, তিনি পরে কথা বলবেন। এ দিন মর্গে এবং গোটা ঘটনায় প্রশাসনিক আধিকারিকদের তৎপরতাও অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যার উত্তর পাওয়া দুষ্কর। মর্গে তদারকি করতে আসেন জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলাশাসক। তাঁর কাছে এই মৃত্যুর বিষয় নিয়ে জানতে চাওয়া হলেও তিনি কিছু বলতে চাননি।

সূত্রের খবর, পুলিশের কাছে মৃতের স্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি পাশের ঘরে ছিলেন। গোঙানির আওয়াজ পেয়ে স্বামীর ঘরে গিয়ে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। অথচ প্রতিবেশীরা গিয়ে নাদির শাহকে বিছানায় শোয়ানো অবস্থায় পেয়েছিলেন। প্রশ্ন তা হলে দেহ ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামাল কে? এক জন মহিলার পক্ষে একা এ কাজ কি করা সম্ভব? ঘটনার পর স্ত্রী রাখি প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে আড়ালে থাকলেন কেন, প্রশ্ন রয়েছে তা নিয়েও। থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করলেও নির্দিষ্ট কারও নাম সেখানে দেননি মৃতের বাবা।

তবে জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন, মৃতের বাবা খুনের অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেইমতো তদন্তও শুরু হয়েছে। শুক্রবার রাতে ওই ফ্ল্যাটটিও সিল করে দিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ পরিষ্কার হবে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here