দু’চোখেই অন্ধকার! মাধ্যমিকের গণ্ডি টপকালো মামার মুখে পড়া শুনে মুখস্থ করা সোমাশ্রী

0

ইন্দ্রানী সেন, বাঁকুড়া: দৃষ্টিশক্তিজনিত প্রতিবন্ধীদের পড়াশুনায় ব্রেইল পদ্ধতি এখন বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আর্শীবাদ। অত্যাধুনিক এই পদ্ধতির ব্যবহারে সহজেই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগকে হাতিয়ার করে উপকৃত হচ্ছেন দৃষ্টিশক্তিজনিত প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীরা। এত কিছুর পরেও প্রশ্ন ওঠে তখনই যখন প্রত্যন্ত গ্রামে এক হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে অত্যাধুনিক এই পদ্ধতি থেকে বঞ্চিত হয়ে শুধুমাত্র মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছা শক্তির উপর ভর করে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করে বর্তমানে বাঁকুড়ার পাত্রসায়রের বেলুট হাইস্কুলের ছাত্রী সোমাশ্রী মালিক।

শুধুমাত্র যোগাযোগের অভাবে ব্রেল পদ্ধতিতে পড়াশোনার সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এই কৃতী ছাত্রী।
কী ভাবে পড়াশোনা করতে, এই প্রশ্নের উত্তরে সোমাশ্রী বলেন, প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়ম করে মামা তাঁর পাঠ্য পুস্তক পড়ে শোনাতেন। আর তা শুনে শুনেই তার পড়া মুখস্থ করে যেত।

সামনে কঠিন লড়াই, এর পর কী হবে ভাবে পড়াশোনা করবে সে বিষয়ে ভেবে উঠতে পারছে না সোমাশ্রী ও তার পরিবার। এতো দিন তাকে মামা যে ভাবে পড়াশুনায় সাহায্য করে গিয়েছেন, তাতে সে কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে সোমাশ্রী। পছন্দের বিষয় ইতিহাস ও বাংলা। মাধ্যমিকে প্রাপ্ত নম্বর ৩৮৮। সোমাশ্রীর এই সাফল্যে খুশির হাওয়া এলাকা জুড়ে।

ইন্দাসের তারিগ্রামে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম সোমাশ্রীর। একেবারে ছোটো বয়সে জন্মান্ধ নাতনী সোমাশ্রীকে পাত্রসায়রের দয়ালপুর গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে মানুষ করেন তাঁর মামা দাদু বুধন আঁকুড়ে। সেখান থেকেই আরো পাঁচ জন সাধারণ ছেলে-মেয়ের মতো গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে স্থানীয় বেলুট হাই স্কুলে ভর্তি হয় সে। এ বার পাত্রসায়র গার্লস হাই স্কুল পরীক্ষাকেন্দ্রে একজন ‘রাইটারে’র সাহায্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় একশো শতাংশ দৃষ্টিশক্তিজনিত প্রতিবন্ধী সোমাশ্রী মালিক।

নয় নয় করে সোমাশ্রীর দাদুর বয়স প্রায় আশি ছুঁই-ছুঁই। নাতনির পড়াশোনার জন্য কখনও বাঁশের ঝুড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন আবার কখনও তালশাঁস বিক্রি করে সামান্য কিছু বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করছেন। টানাটানির সংসারে নাতনির জন্য কোন সরকারি সাহায্য পায়নি বলে জানিয়েছেন দাদু বুধন আঁকুড়ে। তাঁর কথায়, সরকারি সাহায্য যদি পাওয়া যায়, তবে খুব সুবিধা হয়। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান তাপস বাড়ি বলেন, “সোমাশ্রী আমাদের জেলার গর্ব ওর পাশে আছি”।

[ মাধ্যমিকে সফল হয়েও ভবিষ্যতের প্রশ্নচিহ্নগুলো পিছু ছাড়ছে না সাঁওতালডিহির দীপ্তির ]

তবে আশার খবর ও আছে এই বিরাট কর্মযজ্ঞে সোমাশ্রীর পাশে সব সময়ই দাঁড়িয়েছে তাঁর স্কুল। বেলুট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক দিলীপকুমার রায় গর্বিত তাঁর এই ছাত্রীকে নিয়ে। তিনি বলেন, “একেবারে পঞ্চম শ্রেণি থেকেই সোমাশ্রীর সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার পাশে আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন”। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “একাদশ শ্রেণিতেই এই স্কুলে ভর্তি হবে। ভর্তি ফি-সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ তার স্কুল বহন করবে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here