নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: অন্নপ্রাশনে মুখে পরমান্ন তুলে দিচ্ছেন ‘মামা’ সাংসদ বা বিধায়ক। কোলে নিয়ে আদর করছেন ‘পিসি’ জেলাশাসক বা ‘মাসি’ সভাধিপতি। শুক্রবার জলপাইগুড়ি জেলা জুড়ে আইসিডিএস সেন্টারগুলিতে দেখা গেল এমনই চিত্র।

শুক্রবার পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ পালন। চলবে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই আট দিন বেশ কয়েকটি কর্মসূচি নিয়েছে জেলা প্রশাসন এবং সুসংহত শিশুবিকাশ প্রকল্প দফতর (আইসিডিএস)।

আজ প্রথম দিন আয়োজন করা হয়েছিল অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানের। উদ্দেশ্য। ছ’ মাস বয়স থেকেই মায়েরা যাতে শিশুদের মুখে ভাতের মতো আধাশক্ত স্বাভাবিক খাবার তুলে দেয়, সে বিষয়ে সচেতন করা।

জেলায় আইসিডিএস সেন্টারের সংখ্যা ৩৮২৯টি। আজ সমস্ত সেন্টারেই কলাগাছ, ফুলের মালা, কুলো-প্রদীপ দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল। ধুতি, পাঞ্জাবি, কপালে চন্দনের ফোঁটা এবং টোপর মাথায় তৈরি খুদেরাও। হাজির পুরোহিত। এর পর প্রশাসনিক আধিকারিক এবং জনপ্রতিনিধিরা পৌঁছে যেতেই শুরু হয়ে যায় অনুষ্ঠান।

জলপাইগুড়ির মণ্ডলঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের সওদাগরপাড়া প্রি প্রাইমারি স্কুলের আইসিডিএস সেন্টারে সাড়ে দশটা নাগাদ আসেন জেলাশাসক রচনা ভগত,  সাংসদ বিজয় চন্দ্র বর্মণ এবং আইসিডিএস-এর জেলা কার্যক্রম আধিকারিক পীযূষ সাহা। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, সংগীতানুষ্ঠানের পর শুরু হয় অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান।

স্থানীয় টিংকু সরকারের ছ’ মাসের ছেলে শিবমকে ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে মুখে পায়েস তুলে দেন ‘মামা’ বিজয় চন্দ্র বর্মণ এবং ‘পিসি’ রচনা ভগত। তাঁদের হাত থেকে মিষ্টি পায়েস হাসিহাসি মুখে খেয়েও নেয় শিবম। এর পর সাজুগুজু করে হাজির প্রত্যেক খুদের মুখে একে একে পায়েস তুলে দেন অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিক। তাদের মায়েদের মুখে তখন উজ্জ্বল হাসি। প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলির পক্ষে সব সময় মুখেভাত বা অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তাই আজকের উদ্যোগে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি তাদের আনন্দও দিয়েছে। আর জেলাশাসক বা সাংসদের হাতে অন্নপ্রাশন তো মায়েদের কাছে তো আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। খুদে শিবমের মা রিংকু সরকার বলেই ফেললেন, ছেলে বড়ো হলে তাকে আজকের দিনের এই স্মৃতি শোনাবেন। অনুষ্ঠানের শেষে খুদের জন্য থালা, বাটি, গ্লাস উপহার দেওয়া হয় তাদের মায়েদের হাতে। বেশ কিছু সেন্টারে হেলথ্‌ ড্রিংক-এর প্যাকেটও দেওয়া হয়েছে উপহারে।

জেলার সমস্ত আইসিডিএস সেন্টারেই এই ভাবে সাড়ম্বরে মুখেভাতের আয়োজন করা হয়েছিল। কোথাও গিয়েছেন সেখানকার বিধায়ক, আবার কোথাও প্রশাসনিক আধিকারিকরা।

মালবাজারের নেপুচাপু চা বাগানের একটি আইসিডিএস সেণ্টারে প্রশাসনের অনুরোধে অংশ নেন ওই চা বাগানের ম্যানেজার এবং আধিকারিকরা। ডুয়ার্সে সব চা বাগানেই সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন বাগান কর্তৃপক্ষ।

এই ভাবে জেলা জুড়ে চলে কয়েক হাজার শিশুর মুখে প্রথম স্বাভাবিক খাবার তুলে দেওয়ার পালা। সেই সঙ্গে মায়েদের সচেতন করা, কোন বয়সে কী ধরনের খাবার দেওয়া উচিত।

অন্যান্য জেলার তুলনায় জলপাইগুড়িতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম। তবে চা বাগান অধ্যুষিত এবং একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় তা এখনও রয়ে গিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা জেলায় ১৩%-এর মতো। এর কারণ মায়েদের এবং পরিবারের সচেতনতার অভাব। আইসিডিএস-এর জেলা কার্যক্রম আধিকারিক পীযূষ সাহা জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা ৫%-এর নীচে নিয়ে যাওয়া। সেই উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন।

মুখে ভাত তুলে দেওয়ার পর জেলাশাসক রচনা ভগত মায়েদের সচেতনার বার্তা দেন। সাংসদ বিজয় চন্দ্র বর্মণ জানিয়েছেন, আইসিডিএস সেন্টারগুলির পরিকাঠামো যাতে আর ভালো করে তোলা যায় তার জন্য সচেষ্ট হবেন।

তবে শুধু আজ নয়, গোটা সপ্তাহটা ধরেই আরও বেশ কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। যেমন সোমবার সেন্টারগুলিতে অ্যাপ্রন এবং কুক-ক্যাপ দেওয়া হবে। শিশুদের রান্নার সময় বাইরের কোনো জীবাণু খাবারে না আসে, সেই সবাধনতা অবলম্বন করতেই এই ব্যবস্থা। বৃহস্পতিবার থেকে সমস্ত সেন্টারে রাখা হবে একটি করে ‘নিউট্রিশন বাস্কেট’। সেখানে মায়েরা নিজেদের সাধ্যমতো যে কোনো শাক,  সবজি দিয়ে যাবেন। শিশুদের খাবারে সেই সমস্ত শাক, সবজি ব্যবহার হবে। এটি সারা বছরই চলবে। শেষ দিন অর্থাৎ আগামী শুক্রবার থাকছে চিন্তাভাবনা আদানপ্রদানের ব্যবস্থা। সেণ্টারগুলিতে যাবেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। মায়েদের সুবিধে-অসুবিধে তাঁদের মুখ থেকেই শুনবেন এবং তাঁদের প্রয়োজনমতো পরামর্শ দেবেন। জেলা থেকে অপুষ্টি দূর করতে সব রকম প্রচেষ্টা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলাশাসক রচনা ভগত। আইসিডিএস জেলা কার্যক্রম আধিকারিক পীযূষ সাহা জানিয়েছেন, জলপাইগুড়িকে অপুষ্টি-মুক্ত জেলায় পরিণত করে আগামী প্রজন্মকে সুস্থ সবল রাখাই তাঁদের প্রয়াস।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন