lakhmisara

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি:  জমে উঠেছে লক্ষ্মীপুজোর বাজার। কিন্তু যাঁদের হাত ধরে দেবী লক্ষ্মীর পা পড়বে আমবাঙালির ঘরে ঘরে, জলপাইগুড়ির সেই পটশিল্পীদের ঘরে কিন্তু লক্ষ্মীদেবীর কৃপার বড়োই অভাব।

একটা সময় ছিল যখন ঘরে ঘরে ধনদেবীর আরাধনার জন্য ব্যবহার হত পটচিত্র বা সরা। গোলাকার মাটির পাত্রে আঁকা থাকত লক্ষ্মীদেবীর প্রতিকৃতি। সরারও অনেক রকমফের ছিল। এক পুতুল, দুই পুতুল, পাঁচ পুতুল। শিল্পীদের হাতে আঁকা সেই সরার দৃশ্যপট ছিল দেখার মতো। যে সরা বা পটচিত্র যত সুন্দর হত, তার দামও তত বেশি হত। চাহিদা ছিল, তাই ভালো বিক্রিও ছিল। জলপাইগুড়ির পালপাড়া, মোহিতনগর, ময়নাগুড়ি-সহ অনেক জায়গায় সরা বা পটশিল্পীরা রয়েছেন।

lakhmi photoকিন্তু দিনকাল বদলেছে। তার সঙ্গে বদলেছে মানুষের রুচিও। ধীরে ধীরে সরার জায়গা দখল করেছে কাঠামোতে তৈরি রঙচঙে ঝলমলে প্রতিমা। বাজার কেড়েছে ফ্রেমে বাঁধানো বা ল্যামিনেশন করা ঝকঝকে দেবী লক্ষ্মীর ছবিও।

লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগের দিন বুধবার অর্থাৎ আজ জলপাইগুড়ির দীনবাজারে গিয়ে দেখা গেল সরার তুলনায় লক্ষ্মীর প্রতিমা অনেক বেশি এসেছে বিক্রির জন্য। ল্যামিনেশন করা বা ফ্রেমে বাঁধানো লক্ষ্মীর ছবির চাহিদাও তুঙ্গে। কারণ দেখতে সুন্দর হওয়ার পাশাপাশি টেকসই বেশি। এক বার কিনে রাখলে সারা বছর কাজে লাগে। তুলনামূলক ভাবে সরার দাম কম হলেও তার তত চাহিদা নেই। যেখানে একটি মাঝারি সাইজের প্রতিমার দাম ৪০০ টাকা,  একটি বাঁধানো ছবির দাম ২০০ টাকা সেখানে একটি বড়ো সরার দাম মেরেকেটে ৯০ টাকা। তা-ও আমবাঙালি সরার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, ঝুঁকেছে ঝকমকে ছবি বা রঙচঙে প্রতিমার দিকে।

shop in jalpaiguri with lakhmisara and lakhmi idolআর এতেই দুশ্চিন্তায় সরাশিল্পীরা। বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে শেখা এই নিপুণ শিল্প এখনও তাঁরা যত্ন করে ধরে রেখেছেন। কিন্তু এই ভাবে কত দিন চলবে তাঁরা জানেন না। অনেকে বাধ্য হয়ে সরা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমাও তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছেন। না হলে এই পুজোর বাজারে ক’টা টাকা আমদানি হবে কী করে। ক্রেতারা যা চায় তাই তো তুলে দিতে হবে তাদের হাতে। যেমন মিনু বিশ্বাস। তিনি জানালেন, এ বার বিক্রির জন্য সরা এনেছেন ৪০টি আর প্রতিমা এনেছেন ১০০টি।

ব্যবসায়ী সঞ্জয় বিশ্বাস জানালেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এ বার সরার দাম বেড়েছে, তাই চাহিদা আরও কমেছে। বাড়িতে পুজোর জন্য ২৫০ টাকা দিয়ে একটি লক্ষ্মীপ্রতিমা কিনে পাণ্ডাপাড়ার শম্পা সরকার জানালেন, পটের থেকে প্রতিমাই তাঁদের বেশি পছন্দ। আবার অনেককে দেখা গেল ফ্রেমে বাঁধানো ছবি কিনতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই শিল্পে তালিম নিতে আগ্রহী নয়, কারণ চাহিদা নেই, তাই রোজগারের সম্ভাবনাও নেই।

জলপাইগুড়ি পালপাড়ার শিল্পী সরস্বতী পাল আগে সপরিবার শুধুই লক্ষ্মীর পট বা সরা তৈরি করতেন। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন প্রতিমা তৈরিতেও হাত দিয়েছেন। তিনি জানালেন, তাঁকে কাজে সাহায্য করলেও তাঁর ছেলেমেয়েরা এই পেশায় আসতে চায় না। কারণ একটাই, অনিশ্চয়তা। প্রতিযোগিতার বাজারে যে ভাবে পট বা সরাশিল্প ধুঁকছে, তাতে অচিরে হারিয়ে যাওয়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here