ভোট আসে ভোট যায়, দাদনপাত্রবাড়ের লবণ কারখানা পরিত্যক্তই পড়ে থাকে

সরকারের নিজস্ব জমি থেকেও পুরোনো শিল্প বন্ধ হয়ে যায় শুধুমাত্র আধুনিকরণ ও দূরদৃষ্টির অভাবে।

0
abandoned salt factory
পরিত্যক্ত লবণ কারখানা।
সুদীপ মাইতি

হাজার একরের মতো জমিতে ছোটো গাড়ির কারখানা করা যাবে না। উর্বর কৃষিজমি হিসাবেই তাকে রাখতে হবে।  অন্য দিকে নদীচরে প্রায় পতিত জমিতে কেমিক্যাল হাব করা যাবে না। ওখানে অন্য কিছু করতে হবে। এই   দুই জায়গায় নতুন শিল্প গড়তে জমি হস্তান্তরের  টানাপোড়েনে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতায় থাকা একটি সরকার পালটে গিয়েছিল ২০১১ সালে।  অথচ ১৬০০ একরের বেশি জমি নিয়ে  গড়ে ওঠা একটি চালু শিল্প বন্ধ হয়ে গেলেও কোনো সরকারের কাছে এর কোনো গুরুত্বই থাকে না।  বছর বছর ভোট আসে ভোট যায়।  অথচ কি সরকারি কি বিরোধী, কোনো দলই এটা নিয়ে সে ভাবে  ভাবার জায়গায় নেই সেই নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে। জমি নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে এমনই বৈপরীত্য বহন করে চলেছে ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের হাতে গড়া রাজ্যের একমাত্র লবণ তৈরির কারখানা।

বেঙ্গল সল্ট ফ্যাক্টরি। নন্দীগ্রামের জেলা  পূর্ব মেদিনীপুরের  দাদনপত্রবাড়ে অবস্থিত। আরও নির্দিষ্ট করে বললে এটি মন্দারমণি পর্যটনকেন্দ্রের ঠিক পাশেই। ভোটের বাজারেও এই বন্ধ শিল্প নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। এত একর সরকারি জমি পতিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, অথচ কেউ এর কোনো গুরুত্ব দেয় না।  অন্য দিকে এখানে কাজ হারানো প্রায় দেড়শো শ্রমিক আজ কোথায় কী অবস্থায় আছেন তার খোঁজ কেউ রাখে না।  আর তাঁদের বকেয়া মেটানোর কথা তো বহু দিন ধরে আলোচনাতেই নেই।

আরও খবর কেন নাথুরাম গডসেকে স্বাধীন ভারতের ‘প্রথম হিন্দু সন্ত্রাসবাদী’ বললেন কমল হাসান

হুগলি জেলার সিঙ্গুরের পাশাপাশি যে আন্দোলন রাজ্যের বাম সরকারকে সরিয়ে দিয়েছিল সেটি হল পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম আন্দোলন।  অথচ সেই জেলায় রাজ্যের একমাত্র  একটি লবণ কারখানা সেই নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে বন্ধ। আর তার সঙ্গে পতিত হয়ে পড়ে রয়েছে ষোলোশো একরের বেশি জমি। আক্ষরিক অর্থে ষোলোশো পঞ্চাশ একর। আবার এর মধ্যে প্রায় নশো একর জমি  বেদখল হয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিমত।

মহাত্মাজির ডাকে ১৯৩০ সালের লবণ আন্দোলন ও ডান্ডি অভিযানের যে রেশ দেশের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল তারই হাত ধরে ১৯৩৪ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি লিমিটেডের। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র নিজে ১৯৪১ সালে  প্রায় আশি বছর বয়সে  ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে এখানে এসে থেকেছেন। লবণ উৎপাদন প্রক্রিয়ার দেখভাল করেছেন নিজের হাতে। সেই শুরু। তখন এক দিকে নিজেদের দেশীয় পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো, অন্য দিকে এই কারখানাকে লাভজনক করে তোলার চেষ্টা। দু’টোতেই সফল হয়েছিল এই বেঙ্গল সল্ট ফ্যাক্টরি।   স্বাধীনতা পরবর্তীকালে   পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজ উদ্যোগে এতে আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ে। তার পিছনে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ও ছিলেন। সমুদ্রের লোনা জল থেকে খাওয়ার জন্য এবং বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্য এখানে লবন উৎপাদন শুরু হয়। এর জন্য  সরকার ধীরে ধীরে প্রায় ১৬৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে।  যার ফলে এই শিল্প এক লাভজনক  ব্যবসায় পরিণত হয়। বছরে কমবেশি ছ’ মাস এখানে বেশি পরিমাণে লবণ উৎপাদন হত,  যাকে পিক সিজন বলা হত। তা ছাড়া   বর্ষার সময়টুকু বাদ দিলে বছরের বাকি সময়েও কিছু কিছু উৎপাদন হত। বলতে গেলে সারা বছরই শ্রমিকদের কমবেশি কাজ থাকত। ওই ছ’ মাস  প্রায় তিন চারশো শ্রমিক এখানে কাজ করার সুযোগ পেতেন। এক একটি মরশুমে   গড়ে এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ কেজি লবণ উৎপন্ন হত। কোনো কোনো বছরে এক কোটি পঁচাত্তর কেজি লবণও উৎপাদন হয়েছে বলে জানালেন আজও মাটি কামড়ে পড়ে থাকা কারখানার ম্যানেজার মদনমোহন দাস।              

এ ভাবেই চলতে থাকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত।  প্রাকৃতিক পরিবেশের বদল, আধুনিকীকরণ না হওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ  এবং সর্বোপরি ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতি ও তাঁর দেখানো পথকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগের অভাব – এ সব কারণেই এই শিল্প ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় বলে কারখানায় সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের অভিমত। অথচ আজও এই এলাকায়  ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমুদ্রের লোনা জল থেকে সেই পুরোনো পদ্ধতিতেই লবণ উৎপাদন হয়ে চলেছে। আর তা লাভজনক না হলে তাঁরা করছেনই বা কেন?  অথচ সিঙ্গুর কারখানার জন্য যে জমি লাগত তার প্রায় দ্বিগুণ জমি নিয়ে গঠিত রাজ্যের একমাত্র লবণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। শুধু তা-ই নয় এত বিশাল পরিমাণের সরকারি জমি ধীরে ধীরে বেহাত হচ্ছে দেখেও,  সরকার বা  রাজনৈতিক দলগুলির কারো কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।

এলাকার মানুষদের প্রশ্ন, কৃষিজমিতে  শিল্প গড়তে এখন আপত্তি থাকলেও এত জমি নিয়ে বহু বছর আগে তৈরি শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে কেন? আর নুনের চাহিদা তো বাজারে যথেষ্ট। দরকার শুধু সরকারের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্য সরকারের ঘোষিত পিপি মডেল তো এখানেও চালু করা যায়। 

আরও পড়ুন “এমনটা আগে জানলে সানিকে ভোটে লড়তে দিতাম না!” কেন এমন কথা বললেন ধর্মেন্দ্র?

আগে বিভিন্ন সময়ে  ভোটের বাজারে এই বিষয়টি নিয়ে নেতারা এলাকায় আসতেন। কিছু কিছু প্রতিশ্রুতি দিতেন শ্রমিকদের। কখনও কখনও এই জমিতে নতুন শিল্প গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন পুরোনো শ্রমিকদের নতুন করে কাজ ফিরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে  এলাকার আরও মানুষকে নতুন করে কাজে যুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। সেই সূত্র ধরেই কখনও কখনও আলোচনায় উঠে এসেছে এখানে  হাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়। সেই স্বপ্ন দেখাতে মন্ত্রী-অফিসাররা পর্যন্ত কাগজপত্তর নিয়ে এলাকায় বসে মিটিংও করে গেছেন। কিন্তু ভোট যাওয়ার পর সে সব উদ্যোগ কোনো অদৃশ্য কারণে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কিন্তু এখন ভোটের বাজারেও কেউ আসে না। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে সরকারের নিজস্ব জমি থেকেও পুরোনো শিল্প বন্ধ হয়ে যায় শুধুমাত্র আধুনিকরণ ও দূরদৃষ্টির অভাবে। আর নতুন শিল্প গঠনের কথা উঠলে সরকারও পরিবর্তন হয়ে যায়। সত্যি এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here