মৃণাল মাহাত

শীত বরাবরই বাঙালির কাছে প্রিয়। বড়োদিনের পিকনিক থেকে শুরু করে পৌষের পাটিসাপটা, জঙ্গলমহলের বাকা পিঠে বাঙালির কাছে একটা আলাদা বিশেষত্ব নিয়ে আসে। আর শীতের আমেজকে আরও একটু স্পেশাল করে দেয় খেজুর রস থেকে তৈরি নলেন গুড়।

কিন্তু, আগামী দিনে আমজনতার রসনা তৃপ্তি করতে নলেন গুড় থাকবে তো? সেই সংশয়েই দেখা দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেরা আর এই পেশায় আসতে চাইছেন না।

শালবনি ব্লকের একেবারে পশ্চিমদিকের শেষপ্রান্তের গ্রাম ধচাটি। এই গ্রামে প্রায় দেড়শটি সাঁওতাল পরিবারের বাস। তাদের মধ্যে প্রায় কুড়িজন নলেন গুড় বানানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কয়েকবছর আগে পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে চারজন এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কথা হচ্ছিল মধ্যপঞ্চাশের যোগেন্দ্র হাঁসদার সঙ্গে। তিনি আঠারো বছর বয়স থেকে খেজুর গুড় বানানোর সঙ্গে যুক্ত। যোগেন্দ্রবাবু বলেন, “বাপ কাকাদের দেখে আমিও এই পেশায় এসেছিলাম। তারপর তিরিশ ধরে এই কাজ করেছি। কিন্তু, গত বছর থেকে আর এই কাজ করিনা। বয়স হচ্ছে। আর আগের মত গাছে উঠতে পারি না। আমার ছেলেও আর এই কাজে আগ্রহী নয়। তাই বাধ্য হয়ে গুড় বানানো বন্ধ করে দিলাম”। যোগেন্দ্রবাবুর ছেলে বিমল হাঁসদা। যিনি সাঁওতালি সাহিত্যে এম.এ পাশ করেছেন। তিনি বলেন, “কী করে আর করব। ছোটোবেলা থেকে আমরা পড়াশোনা করেছি। এখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। অভ্যাসও নেই। লাভ নেই এমন নয়, কিন্তু, এত কায়িক শ্রম করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়”।

নলের গুড়ের আরেক শিল্পী যোগেন্দ্রবাবুর খুড়তুতো ভাই লালচান্দ হাঁসদা বলেন, “আমিও গত বছর পর্যন্ত গুড় তৈরি করেছি,কিন্তু এ বছর থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। আমার ছেলেরা কলেজে পড়ছে।আমি চাই না, তারা এ পেশায় আসুক। খেজুর রস থেকে গুড় তৈরি করা খুবই পরিশ্রমসাধ্য কাজ। প্রতিমুহূর্তে দূর্ঘটনার আশঙ্কা। গাছের অত উপর থেকে একবার পড়লে পঙ্গু হয়ে যেতে পারি। হতে পারে মৃত্যও। আমি চাই না ছেলেরা এই পেশায় আসুক। সরকারি চাকরি যদি হয় তো ভাল, নাহলে অন্য কোন বিকল্প পেশা বেছে নিক ছেলেরা”।

কেন নতুন প্রজন্মের ছেলেরা এই পেশায় আর আসতে চাইছে না? এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ধনঞ্জয় দেবসিংহ বলেন, “প্রথম কারণ, পেশাটা প্রচণ্ড পরিশ্রমসাধ্য ও বিপদসঙ্কুল। দ্বিতীয়ত, শিল্পীদের সংগঠিত না থাকা। এর ফলে ফড়েরা নির্দিষ্ট কোনো দাম না দিয়ে যার কাছে যেমন দরে গুড় কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে শিল্পীরা। প্রশাসন থেকেও শিল্পীদের জন্য কোনরকম বিমা বা উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়নি। এর ফলে শিল্পীরা এই পেশার ক্ষেত্রে একটা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। স্বভাবতই নতুন প্রজন্মের ছেলেরা আর এই পেশায় আসতে চাইছেন না”।

ধচাটি গ্রামেরই আরেক তরুন শিল্পী কালীচরন হাঁসদা চান তার ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তিনি বলেন, “আমি আমার ছেলেমেয়েকে বাইরের ভাল স্কুলে রেখে পড়াচ্ছি।আমি কেন তাদেরকে এই পেশায় নিয়ে আসব? যতদিন শক্তি আছে,ততদিন অবশ্য আমি করে যাব”।

খবর অনলাইন খোঁজ নিয়ে দেখেছে, জঙ্গলমহলের বাকি গ্রামগুলিরও একই অবস্থা। দলে দলে যুবকরা মহারাষ্ট্র, গুজরাট, সেকেন্দ্রাবাদে কাজ করতে চলে যাচ্ছে। বাপঠাকুরদার এই পেশায় কেউই আসতে চাইছেন না।তবে কি এই ঐতিহ্যময় পেশা একদিন বন্ধ হয়ে যাবে জঙ্গলমহলে? সেই আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে আদিবাসী গ্রামগুলিতে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন