‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ‍্যোগ’ নৈহাটিতে পালন করল ৫০তম বিশ্ব পরিবেশ দিবস

0

কৌস্তভ বসু ও সন্তোষ সেন

১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোলম শহরে ৫ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত চলে রাষ্ট্রপুঞ্জ আহূত মানব পরিবেশ বিষয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ৫-৭সম্মেলনটি বসে। সম্মেলনের প্রথম দিনই ঘোষণা করা হয়, প্রতি বছর ৫ বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হবে। এ বছর পালিত হল ৫০তম বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭৩ সালে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবসের থিম ছিল ‘পৃথিবী: আমাদের একমাত্র গ্রহ’ (Earth: our only planet’। এই বিষয়টিকেই এ বারেও বিশ্ব পরিবেশ দিবসের থিম হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

এই সমাপতন তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা বলতে পারি এবং তথ‍্য-পরিসংখ‍্যান ও বাস্তব পরিস্থিতিও এ কথা বলে, মিসিসিপি- গঙ্গা-ভলগা দিয়ে এই পঞ্চাশ বছরে অনেক জল বয়ে গেলেও অবস্থার অবনতি হয়েছে দ্রুত হারে। বিশেষ করে বিগত তিন দশকে পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে সূচকীয় ঊর্ধ্ব গতিতে। অর্থনীতির বিশ্বায়ন সারা বিশ্বকে পুঁজির অবাধ ক্ষেত্রে পরিণত করার পাশাপাশি সারা দুনিয়ায় চালান করেছে দূষণকেও। সমগ্র পৃথিবীর জল-মাটি-বায়ুতে আজ মৃত‍্যুর হাতছানি।

৭০-এর দশকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ঘোষণার অন‍্যতম কারণ ছিল পরিবেশ দূষণরোধী যান্ত্রিক ব‍্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পুঁজির বিনিয়োগ বাড়ানো। উৎপাদন ব‍্যবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে তার প্রয়োজনটা ছিল সামাজিক দাবি। যে দাবি অনেকটাই উঠে এসেছিল বড়ো কারখানার শ্রমিক ইউনিয়ন আর সত্তর দশকের আন্তজার্তিক বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের ফসল হিসাবে।

উল্লেখযোগ্য যে সাম্রাজ‍্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দশ বছরের বেশি স্থায়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধে একাধিক রাসায়নিক বিষ আকাশ থেকে ছড়িয়ে বিস্তৃত বনাঞ্চলের গাছের পাতা খসিয়ে সমস্ত ভিয়েতনামের বনভূমি, মাটি ও জল বিষাক্ত করে দেয়। এর কারণে লক্ষ লক্ষ ভিয়েতনামবাসী নিহত হন। গোটা পৃথিবী এই হত‍্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠে। এ সব থেকে মুখরক্ষারও প্রয়োজন ছিল আমেরিকা প্রোষিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির। আর এ সবের যোগফলেই সে দিনের পরিবেশ দিবসের ঘোষণা।

নৈহাটিতে পরিবেশ বিষয়ক অনুষ্ঠান।

আজ সোভিয়েত ও চিনের সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর ব‍্যক্তি পুঁজি হোক বা রাষ্ট্রীয় পুঁজি, তা অনেক খুল্লামখুল্লা। বুর্জোয়া গণতন্ত্র এখন এনজিও-র গণতন্ত্রের জন‍্য চিৎকারের কর্মসূচি। বাস্তবের অর্থ-পুঁজি আর বাজারের হাত ধরাধরি সম্পর্কে গণতন্ত্র এক সোনার পাথরবাটি। ফলে চলছে অবাধ লুঠতরাজ – মানুষ ও প্রকৃতির।

পরিবেশ নিধন বাড়ছে দিনের পর দিন। একের পর এক জ্বলছে জঙ্গল। এক দিকে পৃথিবীকে ধ্বংস করার এই কারিগরেরা মুনাফার হিসেব কষে পুঁজি বাড়াচ্ছে ক্রমশ। ‍অন্য দিকে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে পানীয় জলের সংকট। ভূউষ্ণায়ন, বরফের অতি দ্রুত হারে গলন, সমুদ্র জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলস্তরের ফুলেফেঁপে ওঠা। অসময়ে অতিবৃষ্টি-বন্যা-প্লাবন; তীব্র তাপপ্রবাহ-খরা-দাবানল, একই সময়ে ঘটছে পৃথিবীর নানান প্রান্তে। জলবায়ু পরিবর্তনের হাত ধরে এই অঘটনগুলোই আজ স্বাভাবিক ও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ডুবতে বসেছে জলের তলায়। আইপিসিসি-র রিপোর্ট মিলে যাচ্ছে ছত্রে ছত্রে।

শ্রেয়সীর নৃত্য পরিবেশনা।

আইপিসিসি-র ষষ্ঠ রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ স্পষ্ট – খুব বেশি হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের কম করে ৪০০টি উপকূলবর্তী শহর জলের তলায় তলিয়ে যাবে। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি, নয়ডার মতো মেট্রো শহরগুলিকে বলা হচ্ছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’। শহর ও শহরতলির জলাশয়-জলাভূমি উন্নয়নের করাল গ্রাসে চাপা পড়ে যাচ্ছে প্রতি দিন প্রতিনিয়ত। চার লেন-ছয় লেনের রাস্তার জন্য নির্বিচারে কাটা পড়ছে সুবৃহৎ সবুজ বনানী। গাছপালা অত্যন্ত কমে যাওয়ায় ও শহরে কৃষিকাজ না থাকায় এবং কংক্রিটের জঙ্গল আরও বিস্তৃত হওয়ায় শহরগুলোয় রোদের তাপ প্রচুর পরিমাণে ঢুকলেও তা আর বিকিরিত হয়ে ফিরে যেতে পারছে না। ফলে শহরগুলি এক একটি তপ্ত কড়াইয়ের ওপর অবস্থান করছে।

এই সব সতর্কবার্তা আজ কেবল কথার কথা বা ভয় দেখানোর বিষয় নয়। চলতি বছরে (২০২২) এপ্রিল-মে মাসে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ আর দূষিত আবহাওয়ার হাত ধরে হাঁসফাঁস করা শহরবাসী ও শহরে কাজ করতে আসা মানুষজন তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। তার আগে শীতের সময় বারবার ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে হেক্টরের পর হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায় চলে যাওয়ায় কৃষকরা সর্বস্বান্ত হলেন, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ল কৃষিপণ্যের দাম। প্রতি বছর এই ধরনের অস্বাভাবিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা বিশ্ববাসীর কাছে আরও ভয়ানক ও ভয়াবহ আকারে হাজির হবে।

অতি সাম্প্রতিক ঘটে গেল দু’টি ভয়াবহ প্রাকৃতিক (নাকি মনুষ্যসৃষ্ট) দুর্যোগ। গত ৭ মে চিন-পাকিস্তান সংযোগকারী একটি ঐতিহাসিক ব্রিজ সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পড়ল, তলিয়ে গেল জলের তলায়। পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ের সন্নিকটে চিনের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ‘হাসানাবাদ সেতু’র ভেঙে পড়ার কারণ সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে তা হল – এপ্রিল মাস জুড়ে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা ছিল ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ওখানকার গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে আট থেকে দশ ডিগ্রি বেশি। অত্যধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের কারণে একটি বিশাল আকারের বরফের পাহাড় ( শিস্পার গ্লেসিয়ার) সম্পূর্ণ রূপে গলে যায়, যার ফলে নদীতে প্রবল জলস্ফীতি ভাসিয়ে নিয়ে যায় এই সেতুকে। প্রবল জলস্রোতের কারণে সেতুর সঙ্গে সঙ্গে দু’টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, প্রচুর বাড়ি, আবাসন, প্রশাসনিক ভবনও জলের তলায় তলিয়ে গেছে।

গান শোনাচ্ছে সার্বিক।

অন্য দিকে বন্যায় বেসামাল অসম ও অরুণাচল প্রদেশ। গত ১৬ মে থেকে লাগাতার ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসে অসমের ২৯টি জেলার আট লক্ষের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। এই বিপর্যয় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সূচনা। ১৫ মে অসমে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অসমের ডিমা হাসাও জেলার হাফলং স্টেশন ভারী বৃষ্টি ও কাদার ধসে সম্পূর্ণ ভাবে প্লাবিত হয়, প্রায় গোটা জেলা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন, বাতিল ১৭ রুটের ট্রেন। উত্তর-পশ্চিম ভারত যখন তীব্র দাবদাহে দগ্ধ হচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, মেঘালয়, মণিপুর-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বড় অংশ ভয়াবহ বন্যায় বিধ্বস্ত। একরের পর একর চাষের জমি জলের তলায়, ভেঙে পড়ে একাধিক সড়ক ও রেলসেতু-সহ অসংখ্য বাড়িঘর, প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমে দিন গুজরান করছেন। অন্য দিকে চলতি বছরে ১৮০টি সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝার পূর্বাভাস আছে, তার মধ্যে ‘অশনি’র অশনি সংকেত কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে। এই প্রেক্ষিতকে সামনে রেখেই আমাদের বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন।

শক্তি ব্যবহারের বৈষম্যে ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। হিসেব কষলে দেখব পৃথিবীর প্রায় সমস্ত শক্তির ভাণ্ডার করায়ত্ত করে রেখেছে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। কখনও নদীর গতিপথকে বাঁকিয়ে বা কখনও জঙ্গল নিধন করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে।

লড়াইটা আমাদের জল-জঙ্গল-জমিকে ধ্বংস হতে দেওয়ার বিরুদ্ধে। শক্তির অপচয়ের বিরুদ্ধে। একটাই পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে পৃথিবীতে হবে সমস্ত শক্তিভাণ্ডারের সুষম বন্টন। এই চর্চাকেই জোরের সঙ্গে সামনে আনছে ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’। সাধারণ মানুষকে পরিবেশ প্রশ্নে ভাবিত করে তুলতে গান, কবিতা, অঙ্কন, নাটকের ডালি সাজিয়ে এলাকার সমস্ত সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে মিলিত ভাবে পথ চলছে এই উদ্যোগ।

আমাদের একটাই পৃথিবী, এই পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী রাখার দাবিতে ৫ জুনের অনুষ্ঠানটি নৈহাটি পৌরসভার সামনে থেকে প্রায় ৬০ জনের একটি বর্ণময় মিছিলের মাধ্যমে শুরু হয়। পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য সহযোগে বর্ণাঢ্য পদযাত্রা পিএনএসি মাঠের সামনের পার্কে এসে শেষ হয়। সেখানে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে রাত্রি ৯ টা পর্যন্ত:

দু’টি পায়রাকে খাঁচার বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়া; পার্কে বৃক্ষরোপণ; পরিবেশ বিষয়ক কবিতা পাঠ; পরিবেশকে কেন্দ্র করে ছোটোদের ছবি আঁকা; কাগজ দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি। এ ছাড়াও পরিবেশ বিষয়ক অসাধারণ মনোমুগ্ধকর গান পরিবেশন করেন একক ভাবে আমাদের বন্ধু সার্বিক এবং সমবেত ভাবে নৈহাটির অগ্নিবীণা সাংস্কৃতিক সংস্থার বন্ধুরা।

ছোট্ট বন্ধু শ্রেয়সী শানা দু’টি সুন্দর রবীন্দ্রনৃত্য পরিবেশন করে। মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশকে কেন্দ্র করে নিজের আঁকা কিছু ছবি প্রদর্শন করেন বোলপুরনিবাসী পীযূষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কিছু কথা দিয়ে এ বারের মতো আমাদের পরিবেশ বাঁচাও অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন