নিত্যানন্দের আবির্ভাবতিথি উপলক্ষ্যে মহোৎসব খড়দহে, ৭ মার্চ ১০০ মহিলা খোলবাদক নিয়ে নগরপরিক্রমা

0

শুভদীপ রায় চৌধুরী

‘জগৎ যারে ত্যাগ করে নিতাই তাকে বুকে ধরে,/ অদৃশ্য অস্পৃশ্য বলে জগৎ যারে ঠেলে ফেলে,/ ভয় নেই তোর আছি বলে নিতাই তারে করে কোলে।”

Loading videos...

১৩৯৫ শকাব্দের (১৪৭৩ খ্রিস্টাব্দ) মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে বীরভূমের একচক্রা গ্রামে নিত্যানন্দপ্রভু আবির্ভূত হন। তাঁর আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে শ্রীপাট খড়দহে চলছে মহোৎসব। কীর্তন, ৬৪ মহন্ত সেবা, ভোগ নিবেদন ইত্যাদির মাধ্যমে পালিত হচ্ছে নিত্যানন্দের আবির্ভাব উৎসব। এই উপলক্ষ্যে হবে নগরপরিক্রমা এবং বিদ্বজ্জনদের সমাবেশও।

নিত্যানন্দের আবির্ভাব উৎসব প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল মেজোবাড়ির সদস্য প্রভুপাদ সরোজেন্দ্রমোহন গোস্বামীর (নিত্যানন্দের বংশধর) সঙ্গে। তিনি জানালেন, আগামী ৬-৭ মার্চ প্রভুর আবির্ভাবতিথি উপলক্ষ্যে এক মহোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ৬ মার্চ অধিবাসের পর ৭ মার্চ প্রায় ১০০ জন মহিলা খোলবাদক নিয়ে খড়দহ পরিক্রমা করা হবে। ওই মহিলাদের খোল প্রদান করা হবে তাঁরই তত্ত্বাবধানে।

নিত্যানন্দ মহাপ্রভু ছোটোবেলা থেকেই কৃষ্ণ-কৃষ্ণ, পূতনা-বধ, শকট-ভঞ্জন ইত্যাদি খেলা খেলতে ভালোবাসতেন। ন’ বছর বয়েসে তাঁর উপনয়ন হয়। নিত্যানন্দের  বারো বছর বয়সে নবদ্বীপে এক সন্ধ্যায় গৌরচন্দ্রের জন্ম হয়। সেই সময় নিতাই একচক্রা গ্রাম থেকে গর্জন করে ওঠেন। হঠাৎ একদিন শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী এলেন হাড়াই পণ্ডিতের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করতে এবং বললেন যে তীর্থ পর্যটনে যাচ্ছেন, তাঁদের বড়ো ছেলে নিতাইচাঁদকেও নিয়ে যাবেন সঙ্গে।

সেইমতো শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরীর সঙ্গ ধরে গৃহত্যাগ করলেন নিতাই। গেলেন বক্রেশ্বর, তার পর বৈদ্যনাথধাম, গয়া, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন, দ্বারকা, গণ্ডকী হয়ে হরিদ্বার। প্রায় বিশ বছর তীর্থযাত্রা করে তিনি ফিরলেন নবদ্বীপে। নিতাইচাঁদের নবদ্বীপে আগমন হয়েছে বলে নিমাই পাঠালেন হরিদাস ও শ্রীবাসকে তাঁর খোঁজ করতে। কিন্তু তাঁরা কোথাও নিতাইয়ের খোঁজ পেলেন না। অবশেষে নিমাই গেলেন নন্দন আচার্যের বাড়িতে। সেখানেই প্রথম দর্শন হল মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গের সঙ্গে মহাপ্রভু নিত্যানন্দের।

১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে নিতাইচাঁদের সঙ্গে বসুধা দেবীর বিবাহ হয়। নিতাইচাঁদের ইচ্ছা হল খড়দহে শ্রীপাট স্থাপন করবেন। নিজের মনের ভাব প্রকাশ করলেন ভক্তবৃন্দের কাছে। শ্রীপুরন্দর পণ্ডিত এই কথা শুনে আনন্দে মেতে উঠলেন এবং মহাসমারোহে নিতাইচাঁদকে নিয়ে এলেন। বর্তমানে এই ভবন ‘কুঞ্জবাড়ি’ নামে পরিচিত।

নিত্যানন্দের আবির্ভাব তিথি উপলক্ষ্যে রবিবার অধিবাস সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার থেকে ‘কুঞ্জবাড়ি’তে শুরু হয়েছে ২৪ প্রহর নামসংকীর্তন। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে নামসংকীর্তনের বিশ্রাম হবে এবং তার পর নগরপরিক্রমা হবে। পরিক্রমার পর শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দরজিউ উপস্থিত হবেন ‘কুঞ্জবাড়ি’তে এবং ৬৪ মহন্তের জন্য মালসা-ভোগ এবং শ্যামসুন্দরের ভোগ হবে, তার সঙ্গে আরতি। ভোগারতির পর শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দরজিউ আবার নিজ মন্দিরে ফিরে যাবেন।

এর পর আগামী ৭ মার্চ সকাল ৯টায় হবে বিশেষ নগরপরিক্রমা। পরিক্রমা শুরু হবে ‘কুঞ্জবাড়ি’ থেকে, এমনটাই জানালেন প্রভু সরোজেন্দ্রমোহন গোস্বামী। নগরপরিক্রমার কেন্দ্রে থাকবেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রীখোলবাদক রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হরেকৃষ্ণ হালদার, সঙ্গে থাকছেন তাঁর কন্যা রঞ্জিতা হালদার।

কুঞ্জবাড়ি।

পরিক্রমায় ‘বলরাম স্বরূপে নিত্যানন্দের রূপ’ চিত্রপট নিয়ে যোগ দেবেন প্রভু সরোজেন্দ্রমোহন গোস্বামী। পরিক্রমা শেষে শুরু হবে মহতী ধর্মসভা, বিষয়: শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভু। মেজোবাড়ির গোপীনাথ মন্দিরে যে রাসমঞ্চ আছে সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে ধর্মসভা। ধর্মসভায় পৌরোহিত্য করবেন ড. কাননবিহারী গোস্বামী। এ ছাড়াও থাকবেন ড. নিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় (জাতীয় শিক্ষক), ড. শংকর ঘোষ (প্রাক্তন অধ্যাপক), রাধাকৃষ্ণ গোস্বামী (লেখক) প্রমুখ।

ধর্মসভার শেষে সকলকে ভোগপ্রসাদ খাওয়ানো হবে। ভোগে থাকবে খিচুড়ি, চচ্চড়ি, সাদাভাত, শুক্তনি, ডাল, পোস্ত, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, পোলাও, ধোঁকার তরকারি, ছানার তরকারি, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদি। এই ভাবে ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রভু নিত্যানন্দের আবির্ভাবতিথি উৎসব পালিত হচ্ছে খড়দহে।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরে ধুমধাম করে পালিত হচ্ছে শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্যের আবির্ভাব মহোৎসব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.