নিজস্ব প্রতিনিধি: শালা, মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে…

পিছন থেকে সমর্থকদের উল্লাস- ‘জিও গুরু’!

Loading videos...

শুক্রবার বরানগরে বিজেপির ‘তারকা’ প্রার্থী পার্নো মিত্রর সমর্থনে ‘মহাতারকা’ মিঠুন চক্রবর্তীর রোড শো শুরু হল ডিজে বক্সের এমনই কিছু গরমাগরম সংলাপে। তবে শুধু এটাই নয়, রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বরানগর কেন্দ্রের ভোট প্রচারের আঙ্গিকে যুক্ত হল আরও বেশ কিছু চমকদার উপকরণ। কার্যত মিঠুন চক্রবর্তীর রোড শো ঘিরে ভোট প্রচার সংস্কৃতির ভোলটাই যেন বদলে গেলো!

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় এ দিন শুরু হওয়ার কথা ছিল ‘মিঠুন’দার রোড শো। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁলেও কর্মী-সমর্থক তো দূরের কথা, নেতৃত্বের কাছেও জবাব নেই, কখন শুরু হবে। সিঁথির মোড় সার্কাস ময়দান নাগোয়া কাশীনাথ দত্ত রোড তখন ডিজে বক্স লাগানো একাধিক গাড়ি, প্রচারের গাড়ি, ডঙ্কা পার্টি, শ’খানেক পুলিশ কর্মী, সংবাদমাধ্যমের গাড়ি এবং দলের কর্মী-সমর্থকে ছয়লাপ।

ঢাক বাজছে তবে ঢাকি নেই। মাইকে দর্শক ডাকছে ঢাকের বাদ্যি। তৃণমূল, সিপিএমের মতো অন্যান্য রাজনৈতিক দল বাংলার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে ভোটের প্রচারে ঢাকিদের ব্যবহার করছে। কিন্তু বিজেপির এ দিনের প্রচারে দেখা গেল ডঙ্কা পার্টিকে। জানা গেল, ডঙ্কা, কুড়কুড়ি, ঝুনঝুনি বাজনদার সাত জনের এই দলকে ভাড়া করা হয়েছে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে। বাজাতে হবে ঘণ্টা পাঁচেক। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গ ঢাক বিজেপির এই জমকালো কর্মসূচিতে মাইক-বন্দি! সোনার বাংলা গড়ার ডাক দিয়েছে বিজেপি, অথচ বাংলার ঢাককে মাইক-বন্দি করে ঢাকি নেই কেন?

বরানগর বিজেপির এক নম্বর মণ্ডলের এক নেতা বললেন, “উপর থেকে যা নির্দেশ এসেছে তেমন ভাবেই আয়োজন”। অদূরে ডিজে বক্সে হিন্দিতে বাজছে রাম ভজন। তাতে চলছে মহিলা সমর্থকদের যেমন খুশি তেমন নাচো। কখনো বেজে উঠছে ‘আমি মিঠুন চক্রবর্তী, জলঢোঁড়াও নই, বেলেবোড়া নই, জাত গোখরো…’। ডিজে কণ্ঠে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তো রয়েইছে।

কর্মীদের জন্য বিলি হচ্ছে বিজেপির স্লোগান লেখা টি শার্ট। সেটা চাহিদার তুলনায় যে অনেক কম সে কথা জানালেন বণ্টনকারী এক নেতা। বললেন, সবাই চাইছে কিন্তু দেওয়া যাচ্ছে না। কাড়াকাড়ি পড়ে যাচ্ছে। শুধু টি-শার্ট নয়, বিলি হল পদ্ম ছাপ উত্তরীয়, টুপি, ব্যাজ এবং মোদী মুখোশ।

রাজনৈতিক মহলের মতে, বরানগর কাশীপুর গণহত্যার সাক্ষী, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুকে ছ’বার বিধানসভায় পাঠানো বরানগরের মানুষ বরাবরই রাজনৈতিক সচেতন। তবে এ বারের ভোটে বিজেপির সৌজন্যে এখানে ভোটযুদ্ধে জুড়েছে গ্ল্যামার। প্রার্থী টলিউড অভিনেত্রী, আর তাঁর প্রচারে বলিউড অভিনেতা। এক রত্তি শিশুকে কোলে নিয়ে রোড শো-এ অংশ নেওয়া মহিলাকে দেখে মনে হতেই পারে রাজনৈতিক ডাককে ছাপিয়ে যাচ্ছে সেলিব্রিটি দর্শনের তাগিদ। ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলবে তো?

জবাবে বরানগর বিজেপির তিন নম্বর মণ্ডলের এক নেতা বললেন, “অবশ্যই, মিঠুন চক্রবর্তী বাংলার সন্তান। তাকে ফাঁসানো হয়েছিল। অপমান করা হয়েছিল। এ বারের ভোটে মানুষ তার যোগ্য জবাব দেবে। রাজ্যের সমস্ত অবাঙালিরা পরিবর্তন চাইছেন, বাঙালিরাও একই কথা বলছেন। মিঠুন চক্রবর্তীর ডাক তাঁদের সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। বরানগরের ১০০ জনের মধ্যে ৮০ জন ভোটারই মিঠুনের ডাকে সাড়া দিয়ে বিজেপিকে ভোট দেবেন”।

অবশেষে সাড়ে ১১টা নাগাদ সুসজ্জিত গাড়িতে দেখা গেল মিঠুনকে। রোড শো তখন গোপাললাল ঠাকুর রোড ধরে ডানলপের দিকে এগোচ্ছে। দোকান ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসা এক দোকানদারকে প্রশ্ন- কেমন দেখলেন?

উত্তর, “বলতে গেলে আমার জীবন ধন্য হয়ে গেল মহাগুরুকে এত কাছ থেকে দেখে”।

আর ভোটটা?

– সেটা তো অন্য কথা। সিনেমার পর্দায় মিঠুনকে দেখে বড়ো হয়েছি, আজকে একেবারে কাছ থেকে দেখলাম। ভোট কাকে দেব, না দেব সেটা অন্য বিষয়।

তার মানে ‘রথ’ দেখলেও ‘মত’ যে অন্য পথে যেতে পারে, তেমন ইঙ্গিতও মিলল রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একাধিক দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলে।

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এ দিন মিঠুনের রোড শো যে সিঁথি সার্কাস ময়দান থেকে শুরু হয়, সেখানেই রয়েছে বরানগর কাশীপুর গণহত্যার শহিদদের উদ্দেশে ‘অমর শহিদ স্তম্ভ’। গায়ে গা লাগানো তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়। জানতে চাওয়া হল, মিঠুনকে দিয়ে রোড শো করাচ্ছে বিজেপি। তাঁকে দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ। ভোটে কতটা প্রভাব পড়বে?

প্রশ্ন শেষ না হতেই কার্যালয়ের ভিতর থেকে সপাটে জবাব- “মিছিল কোথায়? আমরা কিছুই দেখিনি”!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.