গরিফায় ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’-এর তৃতীয় প্রচার কর্মসূচিতে ‘জীবনের জয়গান’

0

বঙ্কিম দত্ত

‘জীবনের জয়গান’ এই শিরোনামে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে উত্তর ২৪ পরগনার গরিফা অঞ্চলে গরুরফাঁড়ি মঙ্গলেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হল এক বর্ণাঢ্য জমায়েত। ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’-এর এটি ছিল তৃতীয় প্রচার কর্মসূচি। ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘নৈহাটি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’।

গত রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টে থেকে রাত্রি সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এই জমায়েত চলে।  বিভিন্ন সংগঠন ও বন্ধুদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই জমায়েত প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রধানত সাংস্কৃতিক বিভিন্ন মাধ্যমকে ব্যবহার করে চলে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যেমন কবিতালেখ‍্য, গান, ভিডিও প্রদর্শনী, স্লাইড-সহ আলোচনা, ইত্যাদি। বিভিন্ন বক্তা পরিবেশরক্ষার গুরুত্বটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তুলে ধরার চেষ্টা করেন অঞ্চলের মানুষের এবং উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে।

পরিবেশরক্ষার দাবিতে ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’ গত কয়েক মাস ধরে সচেতনতা-প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ মেরামতের দাবিতে রাস্তায়ও নামছে। এই উদ্যোগের প্রথম সফল ও প্রাণবন্ত কর্মসূচি ছিল ২০২১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নৈহাটিতে স্টেট ব্যাংক সংলগ্ন অঞ্চলে এবং দ্বিতীয় কর্মসূচি ছিল ৩ অক্টোবর কল্যাণীতে। এরই ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ রবিবার গরিফায় হাজির করল তাদের তৃতীয় কর্মসূচি।

আমরা কি মনুষ্যজাতি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যেতে চাই? আমরা কি চাই না আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে? চাইলে কিন্তু সমাধান আকাশ থেকে পড়বে না, সক্রিয় হওয়া জরুরি এবং এক্ষুনি। অন্তত বিজ্ঞানীরা ও পরিবেশবিদরা তা-ই বলছেন।

বেশির ভাগ সময়েই জেনে আর কখনও বা না বুঝে আমরা অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর পণ্যের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছি। বিজ্ঞাপনে মোহগ্রস্ত হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি দিগ্‌বিদিক, তৈরি হয়েছে পণ্যের পাহাড়, জমা করছি রাশি রাশি আবর্জনা। উৎপাদন চালু রাখতে ও মুনাফার হার বজায় রাখতে জঙ্গল সাফাই হয়েই চলেছে।

শক্তি সরবরাহের জন্য মাটি ফুঁড়ে তোলা হচ্ছে পেট্রোলিয়াম কয়লা-সহ নানান খনিজ। তৈরি হচ্ছে গ্রিনহাউজ গ্যাস। চরম ভাবে দূষিত হয়েছে বায়ু-জল-জমি। বহু প্রাণ অবলুপ্ত হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে কোটির বেশি উপকারী অণুজীব। পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়েই চলেছে, গলছে বরফ, বাড়ছে সমুদ্র জলের উচ্চতা, ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টিপাত।

তাপপ্রবাহে যেমন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে তেমনি ক্ষতি হচ্ছে ফসলের। মেঘভাঙা অসময়ের বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে পাহাড়, ভেসে যাচ্ছে জনপদ, নষ্ট হচ্ছে চাষাবাদ, চলে যাচ্ছে কত প্রাণ। কোথাও জঙ্গলে আগুন লাগছে, কোথাও শহরে-গ্রামে দিনের পর দিন গলা পর্যন্ত জল। এই তো কয়েক মাস আগেও আমেরিকার নিউইয়র্কের মতো আধুনিকতম শহর বন্যায় ভাসছিল, যা অভূতপূর্ব। আর আটলান্টিকের অন্য প্রান্ত তখন জ্বলছে দাবানলের লেলিহান শিখায়।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত আইপিসিসি’র রিপোর্ট জানিয়েছে, পৃথিবীর গড় উষ্ণতা আর সামান্য বাড়লেই এমন সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘনঘন আসতেই থাকবে, যা রোধ করার কোনো উপায়ই থাকবে না। জলবায়ু-সাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে কয়েক বছরের মধ্যেই। এই ভাবে চলতে থাকলে খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত ভাবে বিপর্যস্ত হবে মানবসভ্যতা। মনে রাখতে হবে জীববৈচিত্র্যের নিরিখে এই সভ্যতা ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির পর্বে প্রবেশ করেছে।

এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী স্বল্পসংখ্যক মানুষ এবং বর্তমান চালু ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক লাভের জন্য কিছু মানুষ প্রকৃতির সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত ও ধ্বংস করে চলেছে, কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার অধিকার। কোভিডের মতো জুনোটিক ভাইরাস এই প্রকৃতি বিনাশকারী ব্যবস্থাকে উলঙ্গ করে দেখিয়ে দিয়েছে, অনেক মানুষ মারা গেছেন। নানা অসুস্থতার কারণে মৃত্যুমিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতি দিন। বহু নতুন ধরনের বিপজ্জনক ভাইরাস বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বরফের তলা থেকে বার হয়ে আসবে ও আরও মৃত্যু ঘটাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

জলবায়ু বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা এখন আর রিপোর্ট পড়ে জানতে হয় না। প্রবল গরম, তাপপ্রবাহ, প্রচন্ড বৃষ্টি, ধস, একের পর এক সাইক্লোন, বন্যা – এই ধরনের ধ্বংসকাণ্ড আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে অনবরত। মৃত্যু দেখছি, অকল্পনীয় দুর্দশায় পড়েছি অনেকেই। দূষিত পরিবেশের কারণে ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধি ঘরে ঘরে, ডায়াবেটিস বাড়ছে জোরকদমে, কিডনির অসুখ, হার্টের অসুখ কমবয়সিদেরও থাবা বসাচ্ছে। পরিবারের বড়ো থেকে ছোটো, অনেকেরই অ্যালার্জি-হাঁপানি-শ্বাসকষ্ট। এর পরও কি মনে হয় — সবই তো ঠিক আছে, আমি তো একা কিংবা এই সব ভয় দেখানোর কথা! তা হলে বলতেই হয় আপনি নিজেকে ভালোবাসেন না, সন্তানকে বা অন্যকে তো নয়ই। 

কিন্তু সবাই চুপচাপ বসে নেই। ছাত্র-যুবসমাজের একটা প্রতিনিধিত্বমূলক অংশ পৃথিবী জুড়ে পরিবেশরক্ষার দাবিতে সরবে পথে নেমেছেন। সাথ দিচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানকর্মী, পরিবেশবিদরা। ধীরে হলেও সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষরাও এগিয়ে আসছেন এই লড়াইয়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই নৈহাটি ও সংলগ্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ‘পরিবেশ বিষয়ক একটি নাগরিক উদ্যোগ’।

রবিবার গরিফার জমায়েতে বক্তৃতা করেন বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী শংকর তালুকদার, ডাক্তার শংকর সরকার, মানবাধিকার কর্মী সোমনাথ বসু, গণবিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী দেবজিৎ চক্রবর্তী, পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী ত্রিদিব দস্তিদার, ফ্রাইডেস ফর ফিউচার (FFF)-এর সংগঠক কৌস্তভ বসু। কবিতা-আলেখ্য ‘বন্ধুত্ব’ পরিবেশন করেন শিক্ষিকা সুপর্ণা ও অনিন্দিতা পাত্র। সংগীতের মাধ্যমে প্রকৃতি-পরিবেশ ও মানুষের সম্পর্কটি তুলে ধরেন কনক ঘোষ, সজল কর ও শ্রীণি তালুকদার এবং গরিফার ‘অগ্নিবীণা সাংস্কৃতিক সংস্থা’ ও ‘হালিশহর বিজ্ঞান পরিষদ’।

পরিবেশ বিপর্যয় ও তার সমাধানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্লাইড সহযোগে তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা করেন বিজ্ঞানশিক্ষক ও পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সন্তোষ সেন। সভা পরিচালনা করেন এই প্রতিবেদক, গণবিজ্ঞান আন্দোলনের এক কর্মী।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, পরিবেশরক্ষার দাবিতে সর্বস্তরে সচেতনতার প্রসার ও  আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নৈহাটি-কল্যাণী পরিধিতে যে ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’ গড়ে উঠেছে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।

এই যৌথ প্রচেষ্টা চায়, এই ধরনের উদ্যোগ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক। আসুন, বিপর্যস্ত ‘প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ও পুনরুৎপাদনের’ স্লোগানকে সামনে রেখে সকলে এগিয়ে আসি, হাতে হাত রেখে, পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে চলি। তবেই বাঁচবে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, বাঁচবে মানবসভ্যতা।

আরও পড়তে পারেন

পরিবেশের বিপর্যয় মানে সভ্যতার বিলুপ্তি – এই আওয়াজ তুলে সংঘবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে কল্যাণীতে প্রচার কর্মসূচি

পরিবেশ রক্ষার দাবিতে নৈহাটিতে ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’ আয়োজিত অবস্থান বিক্ষোভ

পাহাড় বাঁচাতে অযোধ্যা পাহাড়ে ‘প্রকৃতি বাঁচাও ও আদিবাসী বাঁচাও’ মঞ্চের উদ্যোগে জনচেতনা র‍্যালি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন