প্রলয়ঝড়ে বিধ্বস্ত সুন্দরবনে ত্রাণকাজে স্বাস্থ্যকর্মীরা

0
জল শুধু জল।

দীপঙ্কর ঘোষ  

দু’ পাশে যত দূর চোখ যায় জল, শুধু জল। মাঝখান দিয়ে শুধু পথ। না এটা কোনো সুন্দর সমুদ্রবিথীর বর্ণনা নয়। এ আমাদের উম্পুন-বিধ্বস্ত সুন্দরবন। অকুস্থল থেকে স্বাস্থ্য-শ্রমিকরা যে ছবিগুলো পাঠিয়েছেন সেগুলো দেখে এটাই মনে হয়।

আজ শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ‍্যোগ (Shramajibi Swasthy Udyog) আর ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের (ডব্লিউবিডিএফ, WBDF) উদ্যোগে স্বাস্থ্যশিবির বসেছিল সেখানে। অত‍্যন্ত আশার কথা এই স্বাস্থ্যশিবিরের দিকে ইউনিসেফ (UNICEF) সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ।

পৌঁছে গেলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

এই যুগ্ম প্রয়াসের মধ‍্যে দিয়ে যে কাজগুলো করা হবে সেগুলোর সারসংক্ষেপ দেওয়া যাক।

প্রাথমিক কাজ হল, প্রতিটি দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছোনো। তার জীবনযাপনের ন‍্যূনতম চাহিদাগুলো মেটানোর চেষ্টা করা। অর্থাৎ খাদ‍্য আর মাথার ওপরে সাময়িক ছাদের ব‍্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করা এবং সুরক্ষা পদ্ধতি বুঝিয়ে দেওয়া। কারণ প্লাবিত অঞ্চলে পেটের রোগ মহামারি হিসেবে দেখা দেয়।

দ্বিতীয়ত, একটা খুব বড়ো কাজে হাত দিয়েছে এই ছোট্ট সংগঠন দু’টো। তা হল  নোনা জলে প্লাবিত এবং দূষিত পুকুরগুলো সংস্কার করা। প্রাথমিক ভাবে এই রকম পঞ্চাশটা পুকুরের সংস্কার করা হবে। এটা ভীষণই প্রয়োজনীয় কাজ।

এই প্রাথমিক কাজগুলো মিটে গেলে গৃহহীন নাগরিকদের মাথার ওপর পাকা ছাত তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ ও ডব্লিউবিডিএফ-এর আছে।

হিঙ্গলগঞ্জের স্বাস্থ্যশিবির থেকে একজন স্বাস্থ্য-শ্রমিক ও চিকিৎসক জানালেন –

“আজ সকালে ক্যাম্প করা হল হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের রূপমারি-কুমিরমারি-বাইনাড়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে বাইনাড়া পুরো অঞ্চল এবং কুমিরমারি ও রূপমারির আংশিক অঞ্চল বেশ ক্ষতিগ্রস্ত এ বার। আয়লাতে এই অঞ্চল খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। স্থানীয়দের মতে, আয়লার চেয়ে এ বার ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। সঠিক সময়ে যথাযথ ভাবে বাঁধ মেরামতি হলে এই অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হত না। বেশির ভাগ বাড়িই জলের তলায়, অনেকের বাড়ি ভেঙে গিয়েছে। বেশ কিছু পরিবার এখনও বড়ো রাস্তায় অস্থায়ী ত্রিপলের চালা করে আছেন। এক‌ই চালার তলায় মানুষ, জন্তু গাদাগাদি করে কোনোক্রমে দিন কাটাচ্ছেন। সরকার থেকে এই অঞ্চলে ত্রিপল ও ৩০০ গ্রাম করে চিঁড়ে দিয়েছে। 

অস্থায়ী ছাউনি করে রাস্তাতেই বাস।

রেশন ব্যবস্থা আরও সঙ্গীন। রেশন দেওয়া হয় ৬ বা ৭ মাস ছাড়া ছাড়া। এত দেরি করে রেশন দেওয়ার জন্য ওই হিসেবের রেশন নিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশ কষ্টকর। আটা নিয়ে বাড়িতে ৬ মাস রাখা যায় না। নষ্ট হয়ে যায়। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়ে রেশন ডিলারকেই জিনিস ন‍্যূনতম দামে বিক্রি করে দিতে হয়। লকডাউনের পর এখনও রেশন আসেনি এই অঞ্চলে। সামনের সপ্তাহে হয়তো রেশন আসতে পারে।

শনিবার দুপুর পর্যন্ত আমরা ১৬৫ জন রোগী দেখলাম। এই অঞ্চলে বেশির ভাগ মানুষ চামড়ার সমস্যায় ভুগছেন। পানীয়জলের সমস্যাও বেশ। ডায়েরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে শুরু করেছে।”

এ ছাড়াও স্বাস্থ‍্যকর্মীদের আরও একটি দল কুলতলিতে স্বাস্থ‍্যশিবির করছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বন‍্যার জল থাকায় স্বাস্থ‍্যকর্মীরা পৌঁছোতে পারেননি। কিন্তু ওখানেও কম‍্যুইনিটি কিচেন অনেক আগে থেকেই চালু করা হয়েছে।

হিঙ্গলগঞ্জের প্রতিবেদনে বুঝলাম দেশের দুর্গত নাগরিকদের মুখে খাবার তুলে দিতে অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছেন বহুনিন্দিত নিগৃহীত স্বাস্থ‍্যকর্মীরা।

(লেখক পেশায় চিকিৎসক)

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন