‘লাল মাটির সরানে’ পাল তুলছে শিলাজিতের ‘নৌকা’

0

মীর রাকেশ রৌশান: শিলাজিৎ মজুমদারের ‘লাল মাটির সরানে’ শুনে ছিলাম ছাত্রাবস্থায়। তখন থেকেই বীরভূমের লালমাটির প্রতি অদ্ভুত টান জন্মেছিল। ইচ্ছে ছিল কোনো একদিন যদি যেতে পারি সেই গ্রাম, যেখান থেকে এই গানের উৎস। কি সাবলীল ভাবে বলে ফেলে ‘এ দুলার মাইনা আমা ওরা ওকাতে’। তার পর সেই ইচ্ছে বাস্তব হয়েও গেল।

ডাক পড়ল ‘বিশ্ব সঙ্গীত দিবস’ উদ্‌যাপনে শিলাজিতের গ্রামের বাড়ি গড়গড়িয়া যাওয়ার। শিলাজিৎ মজুমদারকে ব্যক্তি মানুষ অতটা জানতাম না, যতটা একজন শিল্পী হিসেবে। যাইহোক শান্তিনিকেতন থেকে ২২ কিমি এগিয়ে গেলেই গড়গড়িয়া গ্রাম। দেখতে পেলাম লাল মাটির রাস্তা খুব কম, অধিকাংশ পিচ রাস্তা। রাস্তার আশেপাশেই গড়ে উঠছে কংক্রিটের সভ্যতা। মোবাইলে নেট ছিল না তবু গড়গড়িয়া পৌঁছাতে আমার একটু অসুবিধে হয়নি কারণ গড়গড়িয়াকে অধিকাংশ মানুষ চেনে শিলাজিতের গ্রামে হিসেবে আর আমি তাঁর অনুষ্ঠানেই যাচ্ছি।

শিলাজিৎকে নিয়ে নতুন করে বলার আর কিছুই নেই। তাঁর গান থেকে অভিনয় পর্যন্ত সমস্তটাই অধিকাংশ মানুষের জানা। নতুন করে বলার বলতে ,শিলাজিৎ মজুমদারে সংগঠন ‘নৌকা’কে নিয়ে। এই ‘নৌকা’ শিলাজিতের একটি নতুন যাত্রা। যার ভিত্তি বাস্তবের সঙ্গেই জড়িয়ে। এই নৌকা এক দিন বাস্তবায়িত করবে বনখতিপুরের বাচ্চাদের সমস্ত স্বপ্ন।

শিল্পী শিলাজিতের বাইরেও ব্যক্তি মানুষ হিসেবে সে অনেক এগিয়ে ‘নৌকা’র কাজ দেখে তা বোঝা যাবে। ‘নৌকা’ এখন কাজ করছে কিছু আদিবাসী বাচ্চাদের নিয়ে। ভারতবর্ষের সমস্ত প্রান্তেই আদিবাসীরা পিছিয়ে এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্ত তাঁদের শৃঙ্খলাপরায়নতা, তাঁদের সততা, সরলতা থেকে আদি লোকসংস্কৃতি পর্যন্ত ছোট্ট বেলা থেকেই আলোড়িত করেছে শিলাজিৎ মজুমদারকে। তাঁর গানেও এই আদিবাসী লোকসংস্কৃতি প্রভাব ফেলেছে। তাঁর গ্রামের পার্শ্ববর্তী এলাকায় অনেক আদিবাসী গ্রাম আছে, তার মধ্যে একটি গ্রাম বনখতিপুর। এই বনখতিপুরের বাচ্চারা নজর কেড়েছে শিলাজিতের। তাদের দেখে মুগ্ধ হয় হয়েছেন শিল্পী শিলাজিৎ। আর সেখান থেকেই ‘নৌকা’র অন্যতম কাজ শুরু হয়।

শিলাজিতের কথায়, “একটি সংগঠন বা একজন শিলাজিৎ একটা এলাকার সমস্ত কাজ করতে পারে না, তাই আমরা একটি গ্রাম হিসেবে বনখতিপুরকে বেছে নিয়েছি। এই গ্রামের সমস্ত বাচ্চাদের শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষার দেখাশোনা করবে নৌকা। এই বাচ্চাগুলো যে দিকে বেশি উৎসাহী, নৌকা সেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত এবং সাহায্য করবে।

এ দিনের ‘বিশ্ব সঙ্গীত দিবসের’ আয়োজক ‘নৌকা’ ছাড়াও ছিল ‘অর্গানিক ইভেন্ট’ এবং ‘দা ভার্চুয়াল ব্রাদার্স’। অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল গানবাজনা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিলাজিতের অনেক ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী পৌঁছে গেছিলেন তাঁর গ্রাম গড়গড়িয়াতে। প্রথমেই সঙ্গীত পরিবেশন করে বনখতিপুরের আদিবাসী বাচ্চারা, পিছনে সঙ্গীতের তালে তালে রণপা। শ্রোতাদের হাততালি, চিৎকার দেখে একেবারে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা শিলাজিতের মুখে একগাল হাসি আর চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। এই জল দেখে বোঝা যায়, কতটা ভালোবাসার জায়গা থাকলে এমনটা মানুষ করতে পারে। সে শহর কলকাতার একজন ব্যাস্ততম শিল্পী। গ্রামের অনেক মানুষের থেকেই বলতে শোনা গেল, “গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ে ভালো চাকরি পেয়ে, ব্যবসা করে গ্রামকে ভুলে গেছে। আমাদের শিলু এত বড়ো শিল্পী হয়েও তার মাটিকে ভুলে যায়নি।”

[ ২৮টি প্রান্তিক শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নিল ইন্দাসের ‘প্রয়াস’ ]

যাইহোক অনুষ্ঠান শেষ হয় প্রায় রাত্রি ১০টায়। তার পর আবার গাড়ি করে সমস্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে বনখতিপুর। কারণ গ্রামের সকল ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এ দিন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস হিসেবে ছিল মহাভোজ, সবাই মিলে ভাত, ডাল, মাংস, চিংড়ির মালাইকারি, চাটনি, ল্যাঙচা সহযোগে খাওয়া দাওয়া। এ ছাড়া অনেকেই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন জামাকাপড়, খাবার ইত্যাদি। সব শেষে ফেরার পথে শিলাজিৎ সকলকে উদ্দেশ্যে করে বলল “জয় গুরু “, পাশের থেকে আশি নব্বই জন বাচ্চা চিৎকার করে বলে উঠল- “এনজয় গুরু”….

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.