ওয়েবডেস্ক: জেলা তো বটেই, রাজধানী কলকাতার বড়ো হাসপাতালগুলিতেও রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের (Coronavirus outbreak) শুরুর দিকে যে ভাবে আক্রান্তদের চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল, এখন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় কি তাতে কোনো খামতি দেখা দিচ্ছে?

শেষ কয়েক দিনে কোথাও সন্দেহভাজন কোভিড-১৯ (Covid-19) রোগীর ভরতি নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানা, পাশাপাশি অন্য রোগে আক্রান্তের পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা পেতেও ‘হেনস্থা’র অভিযোগ উঠছে।

Loading videos...

একটি মৃত্যু এবং ভাইরাল ভিডিও

গত সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ওই ভিডিয়োয় দেখা যায়, জয়নগরের ২৬ বছরের যুবক অশোক রুইদাসের বাবা ছেলেকে হারিয়ে হাহাকার করছেন। তাঁর কথায়, “আমার ছেলের করোনা হয়নি, টাইফয়েড হয়েছিল। সব কাগজপত্র আমার কাছে রয়েছে”। মৃতের মামাতো ভাই আনন্দবাজার পত্রিকার কাছে জানান, সপ্তাহখানেক ধরে দক্ষিণ বারাসতের একটি নার্সিংহোম ভরতি ছিলেন অশোক। রক্তপরীক্ষায় তাঁর টাইফয়েড ধরা পড়ে। সোমবার তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে উপসর্গের কথা শুনে তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেও জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের উপসর্গ শুনে তাঁকে ১০২ অ্যাম্বুলেন্সে করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মেডিক্যালে দ্রুত ভরতির পরামর্শ দেওয়ার পর কাগজপত্র তৈরি করতে করতেই জরুরি বিভাগের বাইরে স্ট্রেচারে শোওয়ানো অশোকের মৃত্যু হয়।

তবে এসএসকেএম-শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ঘোরার পর মেডিক্যালে ভরতির আগেই মৃত্যু হলেও প্রশ্ন উঠছে দক্ষিণ বারাসতের ওই নার্সিংহোমের ভূমিকা নিয়েও। প্রায় সপ্তাহখানেক ফেলে রাখার পর কেন রোগীকে কলকাতায় পাঠানো হল?

একই দিনে মেডিক্যাল চত্বরে আরও একটি মৃত্যু

ওই দিনই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে মৃত্যু হয় লক্ষ্মী সাই নামে এক বৃদ্ধার। ঠনঠনিয়ার বাসিন্দা ওই ৬৫ বছরের বৃদ্ধার মেয়ে শুক্লা দাবি করেন, গত কয়েক দিন ধরেই জ্বরে ভুগছিলেন মা। সঙ্গে ছিল ক্লান্তিভাব, বমি, গায়ে ব্যথা এবং অল্প শ্বাসকষ্ট।

ওই দিন শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে পরিবার। কিন্তু জ্বর হয়েছে শুনে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যেতে রাজি হয়নি। শেষমেশ একটি ভ্যানরিকশা জোগাড় করে তাঁকে মেডিক্যালে নিয়ে আসা হয়। দাবি করা হয়, গেট পেরনোর সময়ও তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অভিযোগ অন্য রোগেও

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজকে কোভিড-১৯ হাসপাতাল ঘোষণা করা হলেও সম্প্রতি রাজ্য সরকার জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি মেনে নিয়ে অন্য রোগের চিকিৎসারও অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু সেখানেও নন-কোভিড রোগীরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠছে।

এশিয়ানেট নিউজ বাংলায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায়, সম্প্রতি অ্যাবডোমিনাল ডিস্টেনশন (পেট ফাঁপা) সমস্যায় আক্রান্ত মালদহের কালিয়াচকের বাসিন্দা শ্যামাদেবীকে নিয়ে কখনও অটোয়, কখনও বা ভ্যানে শহরের এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন তাঁর দিদি। হাতে টাকা শেষ, এখন আশ্রয় নিয়েছেন মেডিক্যাল কলেজের চত্ত্বরেই। দিদির দাবি, “কোথাও ভরতি নিচ্ছে না। এই হাসপাতাল বলছে, করোনা না হলে ভরতি নেব না। কোথায় যাব”?

এমনটাও অভিযোগ, এ রকমই শ’য়ে শ’য়ে রোগী প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহির্বিভাগ খোলা হলেও করোনা নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ না হলে ভরতি নেওয়া হচ্ছে না।

সমন্বয়ের খামতি?

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছর বাইশের মনীষা দাস সন্তানসম্ভবা অবস্থায় মেটিয়াবুরুজের একটি হাসপাতালে ভরতি হন। দিন তিনেক আগে সন্তানপ্রসবের পর তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তাঁকে সন্দেহভাজন করোনা আক্রান্ত হিসেবে পাঠানো হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। কিন্তু জরুরি বিভাগে যাওয়ার পর রোগিণীকে ভরতি করা নিয়ে টালবাহানা শুরু হয়।

পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছোয় যে, জরুরি বিভাগের পাশে স্ট্রেচারে শোওয়ানো অবস্থায় তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। নাকে নল গোঁজা অবস্থায় ঘণ্টা দুয়েক এ ভাবে পড়ে থাকার পর স্বাস্থ্য ভবনের হস্তক্ষেপের পর তাঁকে ভরতি নেওয়া হয়।

কতকটা একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে হয় হাওড়ার নলপুরের বাসিন্দা ৩৬ বছরের এক যুবককেও। হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে তিনি এনআরএস হাসপাতালে ভরতি হয়েছিলেন। সেখানে অস্ত্রোপচারের আগে নমুনা পরীক্ষায় তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ হন।

জানা যায়, এর পরই এনআরএস কর্তৃপক্ষ মেডিক্যাল কলেজে তাঁর জন্য বেড নিশ্চিত করার পর সেখানে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু মেডিক্যালে আসার পর অ্যাম্বুলেন্সের চালককে জানানো হয়, স্বাস্থ্য দফতরের ফোন না পেলে রোগীকে ভরতি করা যাবে। এ ভাবেই ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর দুই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আলোচনার পর তাঁকে ভরতি নেওয়া হয়।

জানা যায়, দিন তিনেক আগেও চারটে হাসপাতাল ঘুরে ভরতি হতে না পারায় ইছাপুরের ১৮ বছরের এক তরুণের মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবার আত্মহত্যার হুমকি দেওয়ার পর মেডিক্যাল কলেজে ভরতি নেওয়া হলেও শেষমেশ মারা যায় ওই তরুণ।

মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

মেটিয়াবুরুজের মনীষা দাসের হয়রানির প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ তথা সুপার ইন্দ্রনীল বিশ্বাস আনন্দবাজারের কাছে বলেন, “করোনা রোগী ছাড়া করোনা সন্দেহভাজন যে সমস্ত রোগী মৃতপ্রায়, তাঁদেরই এখানে ভর্তির নির্দেশ রয়েছে। ওই প্রসূতির এখানে ভর্তি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মানবিকতার খাতিরে তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়েছে”।

এখান থেকেই প্রশ্ন উঠছে, তা হলে অন্য হাসপাতাল থেকে কেন মেডিক্যালে পাঠানো হচ্ছে করোনা সন্দেহভাজনদের? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সব রোগীকে ভর্তি নিলে কোভিড পজিটিভ রোগীদেরই শয্যা দেওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। সবাই সব কিছু জানেন”। একই প্রসঙ্গে এসএসকেএম হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ রঘুনাথ মিশ্র বলেন, “জ্বর, শ্বাসকষ্ট হলে আমাদের সে সব রোগীকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজেই পাঠানোর কথা”।

অব্যবস্থার অভিযোগ জেলাতেও

ক্যানিং কোভিড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলছে চিকিৎসাধীন রোগীদের একাংশ। করোনা প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকেই ৫১ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতাল তৈরি হয়েছে ক্যানিং স্টেডিয়ামে। কিন্তু হাসপাতালের অব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ উঠছে।

চিকিৎসাধীন রোগীদের একাংশের অভিযোগ, হাসপাতালে পর্যাপ্ত স্নানের জল নেই। এমনকী পানীয় জলও পাওয়া যাচ্ছে না প্রয়োজন মতো। চিকিৎসক অথবা নার্সরা ঠিক মতো চিকিৎসাও করছেন না। কয়েক জন অভিযোগ করেছেন, জানলা দিয়ে ওষুধ ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। সময় মতো মিলছে না খাবার। করোনা রোগীদের বারবার গরম জল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও, সেটাও পাওয়া যাচ্ছে না।

সম্প্রতি এই হাসপাতালের ‘অব্যবস্থা’ নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন রোগীরা। সেই ভিডিয়োয় একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, যে অভিযোগগুলি তোলা হয়েছে, সেগুলি সঠিক নয়। রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। পাম্প খারাপ থাকায় কয়েক দিন জল নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। তবে সেই সমস্যা এখন আর নেই!

ছবি: বিজনেস টুডে থেকে

https://www.facebook.com/khaboronline/videos/1489210347928615/?eid=ARAzl97LALu6_mKoobF5cZKLjD-Ebvp9-Ipzid1qfomGGlBMiSisQ602Dd6EDsN6DWvgcCSKsS0B3UcN

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.