পাপিয়া মিত্র

রাতে কান পাতলে আজও মনে হয় কেউ নূপুর পরে চলেছে। কিন্তু বাড়ির আরাধ্য দেবতা তো শান্তশিষ্ট। তিনি এক জায়গায় আসীন। তবে এ কীসের ধ্বনি? ছম-ছম-ছম। এমনটাই মনে হয় ময়রাবাড়িতে।

এক দুই নয়। একবারে ষোলো চূড়ার রথ, সাজানো থাকতো ছোট ছোট ঘণ্টিতে। আর সেই রথ যখন চলত তখন মনে হত জগন্নাথদেব যেন পায়ে নূপুর পরে চলেছেন। সেই আবহ বাড়ির মানুষজনের মনে গেঁথে গিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এক এক করে খুলে গিয়েছে ঘণ্টি। ক্রমে মিলিয়ে গিয়েছিল সেই ধ্বনি। ময়রাবাড়ির এই রথ উৎসব যে বছর ৭৫ বছরে পড়ল সেই বছর আবার সাজানো হয়েছিল। এমনটাই জানিয়েছেন বাড়ির বড় কর্তা কৃষ্ণপদ ময়রা। সেই সাজানো এখনও থাকে তবে উৎসবের পরে ঘণ্টি খুলে রাখা হয়।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর স্টেশন থেকে রায়দিঘি সড়কপথে কাশিনগর গ্রাম। এই গ্রামে বিখ্যাত ‘জগন্নাথ বাড়ি’র কর্তা মতিলাল ময়রা ১৩৩৮-এ জগন্নাথদেবকে নিজ গৃহে প্রতিষ্ঠা করেন। তখনকার দিনে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে রক্ষণশীল পরিবারের কর্তারা সখ-আহ্লাদ পূরণ করার জন্য অন্য উপায় খুঁজতেন। বেশিরভাগ বাড়ি পুজোপাব্বনকেই বেছে নিত। সেই ভাবে শুরু ময়রাবাড়ির রথ উৎসব।

জগন্নাথদেব প্রতিষ্ঠা হল ২১ ফুট উঁচু রথে। কিন্তু এত বড় রথ থাকবে কোথায়? উপায় বাতলে দিলেন তৎকালীন জমিদার বরোদাপ্রসাদ রায় চৌধুরী। জায়গা দিলেন থাকার আর পথ দিলেন রথ চলার। রক্ষণশীল বাড়ির ঠাটবাট বজায় রাখতে মতিলালবাবু একা জগন্নাথকেই প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন। রথযাত্রার পরে দেবতা থাকবেন কোথায়? সখ্য পাতানো হল এলাকার গঙ্গাবিষ্ণু ঘরামির (রায়) সঙ্গে। মাসিরবাড়ি পাতানো হয়ে গেল। রথ গিয়ে দাঁড়াল তেলিপুকুরের ধারে আর দেবতা চলে যান মাসির ঘরে।

সেই থেকে ময়রাবাড়ির বিরল উৎসব একা জগন্নাথ ঘিরে। এই বছর উৎসব ৮৬ তে পা দিল, জানালেন বাড়ির সদস্য কৃষ্ণপদবাবুর ভাইপো পার্থ ময়রা। প্রবল বর্ষণের মধ্যে হইহই করে রথ বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। সঙ্গে চলল নামসংকীর্তন সহযোগে ভক্তের দল। এক দিনের জমজমাট এই মেলায় কৃষ্ণচন্দ্রপুর, বাপুলিবাজার, কৌতলা, সুধিরহাট, চাঁদপাশা, অর্জুনতলা, পুরন্দরপুর থেকে বহু মানুষ এই উৎসবে যোগ দিয়েছেন। ময়রাবাড়ির জগন্নাথ খেতে ভালবাসেন ক্ষীরের সন্দেশ, নারকেলনাড়ু। মাসিরবাড়ি থেকে ফিরে নিজের বাড়িতে আহার করেন পাঁচরকম ভাজা, নানা তরকারির সঙ্গে গব্যঘৃতের লুচি। এই আহারের পদ নিয়ে আরও এক আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

আরও : রথযাত্রা

ছবি: সুমন সাহা

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here