ড্রপ আউট বা ফেল করারাও কিন্তু ফাটিয়ে রেজাল্ট করতে পারত

0

নিজস্ব প্রতিনিধি: যে মেয়েটা বা যে ছেলেটা এই সে দিন পড়াশোনা ছেড়ে দিল, ক্লাস ফাইভ সিক্স-সেভেন বা এইটে, ওদের অনেকের আজীবন একটা কষ্ট থেকে যাবে। কেন একটু সুযোগ পেলাম না পড়াশোনাটা করার!

সেই কবে থেকে এই নিয়মই চলে আসছে। কিন্তু সুযোগ আর শিক্ষিত শিক্ষক পেলে, ফেল করা ছেলেমেয়েদেরও প্রায় সবাই বলার মতো রেজাল্ট করতে পারে।

এই কথাগুলো নতুন নয়। আজকের নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যাঁরা এগুলো বিশ্বাস করেন, বলেন, চর্চা করেন, তাঁরা ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া বরাবরই মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু। এমনই এক সংখ্যালঘুদের প্রক্রিয়া সম্প্রতি চলল এ রাজ্যে, খুব ছোট্ট আকারে। পশ্চিম বর্ধমানে পাণ্ডবেশ্বরের কাছাকাছি গৌরবাজার গ্রামে ‘আরশিনগর’ নামের এক আখড়ায়, শ্রুতি বিশ্বনাথের ওয়ার্কশপ বা কর্মশালায়।

শ্রুতি বিশ্বনাথ মহারাষ্ট্রের পুণে থেকে এসেছিলেন। মহারাষ্ট্রীয় লোকগান থেকে শুরু করে কবির-মীরা-সহ সহজ সাধকদের গান আর জীবন নিয়ে চর্চা করেন শ্রুতি। একই সঙ্গে ছোটোদের সঙ্গে সময় কাটান। ছোটোদের শেখান, ছোটোদের থেকে শেখেন।

শ্রুতির এই তিন দিনের ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিলেন দক্ষিণবঙ্গের নানা জায়গা থেকে, নানান অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান থেকে আসা জনা পনেরো ছাত্রছাত্রী।

গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর ওয়ার্কশপটি হয়। রোজ সকাল ন’টায় শুরু হতো। চলত বারোটা পর্যন্ত। মাঝে একটা ছোটো টিফিন ব্রেক। ছাত্রছাত্রীদের সবাই বাংলাভাষী। অনেকেই ইংরেজি বলা বা বোঝা তো দূরে থাক, হিন্দিও জানে না। শ্রুতি আবার বাংলা বলতে পারেন না। বোঝেনও না তেমন। ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ গান জানে, গান শেখে। আবার কেউ কেউ নয়। একজন দোভাষী সঙ্গে ছিলেন। অভিভাবকদের বা অন্যান্য বড়োদের ওয়ার্কশপে থাকতে দেওয়া হয়নি। তাঁদের ডাকা হয়েছিল তৃতীয় বা শেষ দিনের শেষ আধ ঘণ্টায়। সেখানে ছ’টা গান হয়েছিল। কোরাস। শ্রুতি আর ওঁর ছাত্রছাত্রীদের কোরাস। ছ’টা গানের মধ্যে দু’টো মহারাষ্ট্রীয় লোকগান, দু’টো কবির, একটা মীরা এবং একটা ইংরেজি লোকসঙ্গীত।

এই ওয়ার্কশপ ছিল সঙ্গীত ভিত্তিক। কিন্তু শুধু গান নয়, সবাই মিলে নিজেদের নানা রকম ভাবনাচিন্তাও শেয়ার করেছে। গ্রেটা থুর্নবার্গ, পরিবেশ, নদীনালা ইত্যাদি ইত্যাদি। ছাত্রছাত্রীরা যে যার নিজের গভীরতম ইচ্ছে বা বাসনা
(deepest desire) নিয়ে লিখেছে। শ্রুতির সঙ্গে কথা বলেছে তা নিয়ে। তার সঙ্গে চলেছে গান শোনা, গান শেখা, গান গাওয়া, গান বোঝা।

ওপরে যে ভিডিওটা দেওয়া হয়েছে, সেটা শেষ দিনের শেষ পর্ব, যেখানে অভিভাবকরা বা অন্যান্য বড়রা দর্শক-শ্রোতা হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। ছবি তোলা বা রেকর্ডিংয়ের অনুমতি ছিল।

সেখানে উপস্থিত কলকাতা থেকে যাওয়া এক সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা দেখেশুনে প্রশ্ন করেছিলেন— “এতগুলো অন্য ভাষার গান এই এত অল্প সময়ের মধ্যে কী করে শিখল এই বাচ্চারা?” তাঁর অভিজ্ঞতায়, চেনা দুনিয়ায় অবিশ্বাস্য লেগেছিল। বিস্মিত হয়েছিলেন অন্যান্যরাও। সত্যি ভাবার মতো প্রশ্ন। কী করে এত তাড়াতাড়ি ওরা শিখল! শিক্ষা নিয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা অতীতের প্রায়োগিক অভিজ্ঞতার আলোচনা করার মতো জায়গা এখানে নেই। শুধু ছোটো করে বলা যেতে পারে— সুযোগ আর পরিবেশ পেলে, শিক্ষিত শিক্ষক পেলে, দেশ বা সমাজের সদিচ্ছা থাকলে, অনেক অনেক ড্রপ আউট ছাত্রছাত্রীও ফাটিয়ে রেজাল্ট করতে পারে।

[ আরও পড়ুন: সাম্প্রদায়িকতার তর্ক-বিতর্কে আঁটোসাঁটো দু’টি বই ]

রেজাল্ট মানে শুধু স্কুলের মার্কশিট না ধরলেই মঙ্গল। তবে ধরলেও এই কথাটা সত্যি প্রমাণিত হবে।

ছবি: প্রশান্ত ঘোষ এবং রঞ্জন দত্ত

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.