নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : মাঝখানে কাঁটাতার। কয়েক ঘণ্টার মোলাকাত। তার জন্যই বছরভর অপেক্ষা দু’ পারের অসংখ্য পরিবারের।

জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের ভোলাপাড়া, খালপাড়া। এখানে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। মাঝখানে কাঁটাতার। দু’ পাশে দু’ দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়া পাহারা। এ-পারে আসতে হলে লাগবে পাসপোর্ট, ভিসা। চাইলেই তা সম্ভবও নয় সব সময়। দরকার টাকার, দরকার সময়ের।

অথচ আপনজনেরা রয়েছে যে ও-পারে। তাঁদের জন্য মন কাঁদে, দেখতে মন চায়। কিন্তু উপায় কী? দু’ দেশের আইনি বেড়া ডিঙিয়ে তা যে সম্ভব নয়।

এই কথা ভাবিয়েছিল স্থানীয় বিধায়ক খগেশ্বর রায়কেও। মূলত তিনিই প্রথম উদ্যোগ নেন। দু’ দেশের প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা করে বার করেন উপায়। মিলনমেলা, এই মেলা দু’ পারের আপনজনদের মিলিয়ে দেয়, খানিকক্ষণের জন্য হলেও।

২০০৯ সালে প্রথম বার হয় মিলনমেলা। বাংলা বছরের শেষ দিন, চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় এখানে। এ বারও সকাল ১০টা থেকে কাঁটাতারের দু’ পাশে ভিড় জমতে থাকে। এ-পারের সুখানি, ভোলাপাড়া, খালপাড়া-সহ জলপাইগুড়ি জেলার বহু দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন আপজনদের দেখতে, কথা বলতে। ও-পারে রয়েছে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা। সেখান থেকেও দলে দলে মানুষ চলে আসেন এই ভোলাপাড়া-খালপাড়া সীমান্তে। গোটা একটা বছর পর আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে মোলাকাত হয়। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না। কাঁটাতারের মধ্য দিয়েই ভালোবাসা বিনিময় হয়। ছেড়ে আসা আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে ফেলে আসা দিনগুলি নিয়ে কথা হয়। যেমন পঞ্চাগড়ের মজিদুর রহমান দেখা করতে এসেছিলেন ভাইপো আব্দুল লতিফের সঙ্গে। বছরভর জমে থাকা কথা মনের আগল খুলে বেরিয়ে আসছিল দু’জনের। কারণ সময় যে বড্ড কম। চৈত্রের রোদ উপেক্ষা করে সুখানির মজিদা বিবি তাঁর ৯ মাস বয়সি কন্যাকে নিয়ে এসেছেন তাঁর খালাম্মাকে দেখানোর জন্য। ফুটফুটে নাতনিকে প্রথম দেখে চোখে জল চলে আসে মর্জিনা বেগমের।

শুধু দেখা বা কথা নয়, বিনিময় হয় নববর্ষের শুভেচ্ছা, উপহার। ও-পারের বহু মানুষ পদ্মার ইলিশ নিয়ে এসেছিলেন আপনজনদের জন্য। এ-পার থেকেও উপহার যায় ও-পারে। ৪ ঘণ্টা সীমান্ত গমগম করে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে। এই একটা দিন আইনের রক্তচক্ষুও আপাত-বন্ধ থাকে। তবে সতর্ক পাহারায় থাকেন দু’ দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ-প্রশাসন। 

বেলা দু’টোর পর বিদায় নেওয়ার পালা। সময় যে বাধা। বিদায়বেলায় সকলের চোখেই জল। সান্ত্বনা এইটুকুই, বছর শেষে  ফের দেখা হবে। এই আশায় বুক বেঁধে ধীরে ধীরে ঘরমুখী হন সকলে। অনেকে ফিরে ফিরে যেতে যেতেও পেছন ফিরে তাকান, যদি আরও একটু দেখা যায় প্রিয়জনকে। তবে ততক্ষণে আপনজনেরা দুর-অস্ত। মাঝখানে পাহারায় আইনের অতন্দ্রপ্রহরীরা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here