বাবার মৃত্যুতে ধৃত শ্বেতাকে ‘রাজসাক্ষী’ করতে চায় পুলিশ

0
3027

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : বাবার মৃত্যুতে গ্রেফতার শ্বেতা কি এ বার ‘রাজসাক্ষী’ হতে চলেছেন? নিজেকে বাঁচাতে মা লিপিকা ও মায়ের প্রেমিক অনির্বাণের বিরুদ্ধে বয়ান দেবেন শ্বেতা? এটাই এখন জোর জল্পনা সব মহলের। সূত্রের খবর, শ্বেতাকে রাজসাক্ষী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ। তাকে বোঝানো হয়েছে, তিনি রাজসাক্ষী হলে এই মামলা থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন।

বস্তুত পুলিশ এই মুহূর্তে বহু চর্চিত এই ঘটনার তদন্ত নিয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে। সূত্রের খবর, সম্প্রতি উত্তম মোহন্তর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এসে পৌঁছেছে তদন্তকারী অফিসারের। সেখানে কী ভাবে উত্তম মোহন্তর মৃত্যু হয়েছে তা পরিষ্কার ভাবে বলা হয়নি। উল্লেখ নেই বিষক্রিয়ারও। যদিও উত্তম মোহন্তর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর থেকেই পুলিশের দাবি ছিল আম-দুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল তাঁকে। একই অভিযোগ করেছিল উত্তমবাবুর পরিবারও। তার ভিত্তিতে প্রথমে স্ত্রী লিপিকা মোহন্ত ও পরে মেয়ে শ্বেতা মোহন্তকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্টে হাতে দড়ি বাঁধার চিহ্ন, মাথায় আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হলেও পাকস্থলীতে বিষক্রিয়ার উল্লেখ নেই। যদিও এ বিষয়ে জেলার পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন, ভিসেরা রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত এই ধরনের ঘটনায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয় না। এই ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ভুল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন উত্তম মোহন্তর দাদা স্বপন মোহন্ত।

যদিও ভিসেরা রিপোর্ট কবে আসবে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন পুলিশ কর্তারাই। তাই ঝুঁকি না নিয়ে শ্বেতাকে রাজসাক্ষী করার দিকেই জোর দিচ্ছেন তদন্তকারী অফিসার। শ্বেতা তাঁর মা আর তাঁর প্রেমিকের বিরুদ্ধে বয়ান দিলে তদন্তের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে পুলিশের কাছে।

ভবিষ্যতে নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখা, অভিনয় ও মডেলিং-এর নামী প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী শ্বেতা মোহন্ত পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতে থেকে এমনিতেই ভেঙে পড়েছেন। বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই তরুণীর ভেঙে পড়ার সুযোগই নিতে চাইছে পুলিশ। যদিও রাজসাক্ষী হবেন কি না তা এখনই স্পষ্ট করেননি শ্বেতা।

পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজত শেষে বুধবার জলপাইগুড়ি আদালতে নিয়ে আসা হয় শ্বেতাকে। বিচারকের সামনে পেশ করার আগে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে শ্বেতা জানিয়েছেন, ঘটনা সম্পর্কে যা জানতেন তা ইতিমধ্যেই তদন্তকারী অফিসারকে জানিয়ে দিয়েছেন। নতুন কিছু বলার নেই তাঁর।

আজ আদালতে ফের তাঁকে নয় দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে চান তদন্তকারী অফিসার। সরকারপক্ষের আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জি আদালতে জানিয়েছেন, এই ঘটনার অন্যতম চক্রী অনির্বাণ রায়কে পাকড়াও করতে সাহায্য করতে পারেন শ্বেতা। তা ছাড়াও ঘটনার দিন ও তার আগে-পরে কিছু ঘটনার মধ্যে এখনও কিছু ‘মিসিং-লিংক’ রয়ে গিয়েছে। সেই সব ‘মিসিং-লিংক’ খুঁজে বের করতে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন শ্বেতাকে নিয়ে তাঁদের ভাড়ার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে লিপিকার লেখা আধপোড়া চিঠি উদ্ধার করে পুলিশ। উত্তম মোহন্তর লেখা একটি ডায়েরি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। এই সব ‘মিসিং-লিংক’ জানার জন্যই শ্বেতার পুলিশ হেফাজতের প্রয়োজন বলে জানান প্রদীপবাবু। যদিও এর বিরোধিতা করেন শ্বেতার আইনজীবী সন্দীপ দত্ত এবং স্বরূপ মণ্ডল। ময়নাতদন্তের রিপোর্টকে হাতিয়ার করে আইনজীবী সন্দীপ দত্ত আদালতে জানান, উত্তম মোহন্তর মৃত্যুর ঘটনায় বিষক্রিয়ার কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। গ্রেফতারের পর ইতিমধ্যেই টানা পাঁচ দিন জেরা করা হয়েছে শ্বেতাকে। তাঁর নতুন করে কিছু জানানোর নেই পুলিশকে। তাই শ্বেতাকে জামিন দেওয়ার আবেদন জানান আইনজীবী সন্দীপ দত্ত। সেই সঙ্গে লিপিকা মোহন্ত এবং ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ধনঞ্জয় চতুর্বেদীর জামিনেরও আবেদন জানানো হয়।

দু’ পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর শ্বেতা-সহ সকলের জামিনের আবেদনই খারিজ করে দেন বিচারক। সেই সঙ্গে শ্বেতাকে আরও আট দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

২৯ জুন জীবনবিমা নিগমের ডেভেলপমেন্ট অফিসার উত্তম মোহন্তর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় নিজের ভাড়া ফ্ল্যাটে। সম্পত্তির লোভে এবং নিজেদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে স্ত্রী লিপিকা ও তার প্রেমিক অনির্বাণ রায় উত্তম মোহন্তকে আম-দুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে সেটি খাইয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ করে উত্তমবাবুর পরিবার। এর পরেই একের পর এক নাটকীয় মোড় নিতে থাকে এই ঘটনা। মৃত উত্তমের দাদা স্বপন মোহন্তর অভিযোগের ভিত্তিতে পর দিন গ্রেফতার হন স্ত্রী লিপিকা। ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ধনঞ্জয় চতুর্বেদীও। তাঁর এখন জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে রয়েছেন। ঘটনার পর দিনই বিপদ বুঝে পালিয়ে যায় প্রেমিক অনির্বাণ। পুলিশ এখনও হন্যে হয়ে তার খোঁজ চালাচ্ছে। এর পর ১৩ জুলাই গ্রেফতার হন মেয়ে শ্বেতাও।

স্বাভাবিক ভাবেই খুনের অভিযোগে স্ত্রী ও কলেজ পড়ুয়া তরুণী মেয়ের গ্রেফতারির খবরে চাঞ্চল্য ছড়ায় শহর জুড়ে। এখন নতুন পরিস্থিতিতে ঘটনা কোন নাটকীয় মোড় নেয় তাই নিয়ে সব মহলে চলছে জল্পনা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here