নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: জলের বোতল ১০০ টাকা, খাবার ২০০ টাকা, দশ মিনিট কথা বলতে চাইলে ২০০। আধ ঘণ্টা হলে ৫০০ টাকা। আর না দিতে পারলে গলাধাক্কা। এ রকমই অভিযোগ পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে।

চিত্রটা জলপাইগুড়ি জেলা আদালতের সদর পুলিশ হাজতের। শনিবার এমনই একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল উত্তেজনা ছড়ায় হাজতচত্বরে। হাজতের পুলিশকর্মী ও বন্দিদের মধ্যে হাতাহাতিও হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগটা নতুন নয়। বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার হয়ে অভিযুক্তরা এই হাজতে আসেন। আবার সংশোধনাগারে বিচারাধীন বন্দিদেরও তারিখ অনুযায়ী নিয়ে আসা হয় আদালতে। তাঁদের এই সদর হাজতেই রাখা হয় সারা দিন। সেখানে তাঁদের সারা দিনের খাবার, জলের ব্যবস্থা এ ভাবেই হয়ে থাকে বলে অভিযোগ। অভিযোগ, হাজতের পুলিশবাবুদের হাতে টাকা গুঁজে দিতে না পারলে, না খেয়েই কাটিয়ে দিতে হয় গোটা দিন। পরিবারের লোকেরা দেখা করতে এলে কথাই নেই। এক জন ১০ মিনিট কথা বললে নিদেনপক্ষে ২০০ টাকা। অভিযোগ, দেখা করার লোকের সংখ্যা বেশি হলেই পরিমাণটা দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যায়। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই অমানবিক দুর্নীতি চললেও তাঁরা কিছু বলার সাহস করেন না। তাঁদের বক্তব্য, হাজতে এলে এই পুলিশকর্মীদের নজরদারিতেই তাঁদের সারা দিন কাটাতে হয়। মুখ খুললেই সাহায্য না পাওয়ার ভয়। এমনিতেই বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে জেরবার বন্দি ও তাঁদের আত্মীয়রা। মামলার খরচ, উকিলের খরচ জোগাতে হিমশিম অবস্থা। তার ওপর এই বাড়তি ঘুষের চাপ। আর দিতে না পারলেই পুলিশবাবুদের দুর্ব্যবহার, গলাধাক্কা সহ্য করতে হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। এর জেরেই শনিবারের ঘটনা।
সঞ্জয় রায় নামে এক বিচারাধীন বন্দির সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর দাদা সুদীপ্ত। অভিযোগ, প্রথামাফিক পুলিশকর্মীরা হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু  টাকা না থাকায় গলাধাক্কা দিয়ে তাঁকে হাজতের সামনে থেকে বার করে দেওয়া হয়। ঘটনার পর ওই বিচারাধীন বন্দি প্রতিবাদ করেন। তখন সেই বন্দিকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এর পরেই হাজতে থাকা বন্দিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। চিৎকার করে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। হাতাহাতি শুরু হয়ে যায় দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মী ও বন্দিদের মধ্যে। কিন্তু নামমাত্র পুলিশকর্মীর পক্ষে এই ঘটনা সামাল দেওয়া সম্ভব ছিল না। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী ছুটে আসে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে আসেন ডিএসপি (হেড কোয়ার্টার) মানবেন্দ্র দাস। তাঁর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। বন্দিদের অভিযোগ শুনে হাজতের দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের সামলে চলার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। ঘটনার তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন। যদি কোনো পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে টাকা চাওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয় তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওই পুলিশকর্তা।
কিন্তু তাতে কি এই সমস্যা চিরতরে মিটবে? এই নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পোড় খাওয়া বন্দি বিবেক প্রধান, রাজু বর্মণরা। নেশার সামগ্রী বিক্রি, ছোটোখাটো চুরির মামলায় জড়িয়ে বেশ কয়েক বার জেল হাজতে আসার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁদের। তাঁদের কথায় পুলিশ হাজতে এই টাকার লেনদেন নতুন কিছু নয়। শুধু খাবার বা জল কেন, মোটা টাকা দিলে হাজতে চলে আসে নেশার সামগ্রীও। যা একেবারেই নিয়মবিরুদ্ধ। ১০ টাকা দামের এক প্যাকেট বিড়ি দিতে গেলে নিদেনপক্ষে ১০০ টাকা গুঁজে দিতে হবে। বিড়ির বদলে সিগারেট হলে রেট দ্বিগুণ, প্যাকেট পিছু ২০০। ৫ টাকা দামের এক পুরিয়া খৈনির জন্য ৫০ টাকা। নিজের চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়েই এই সব মেনে নিতে হয় বন্দিদের। কিন্তু একেই তো অপরাধী বলে সমাজে একটা তকমা পড়ে গিয়েছে, তাই ভয়েই এই সবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস দেখান না বিবেক, রাজুরা।
মালতী রায় নামে এক মহিলা জানিয়েছেন, ছয় মাস ধরে তাঁর স্বামী সংশোধনাগারে রয়েছেন। যে দিন তাঁর আদালতের তারিখ থাকে, কোলের মেয়েকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে ছুটে আসেন তিনি। টাকা দিয়ে দেখাও করেন। কিন্তু এর আগের তারিখে টাকা দিতে না পারায় ধাক্কা দিয়ে হাজতের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছিল পুলিশকর্মীরা। সারা দিন হাজতের সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেও স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়নি। এমনকি একরত্তি মেয়েটা বাবাকে দেখার জন্য কান্নাকাটি করলেও মন ভেজেনি পুলিশবাবুদের। আজ ২০০টাকা নিয়ে ফের আসেন। যদিও এ দিনের ঘটনার জেরে টাকা ছাড়াই স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন। ফিরে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলেন, এর পরের দিন কি এমনটা হবে, নাকি ফের টাকা নিয়েই আসতে হবে? কিন্তু উত্তর পেলেন না। কে-ই বা দেবে এর উত্তর? হয়ত এর পরের ‘তারিখ’….।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here