দেখতে দেখতে কেটে গেল বছর ২০১৬। প্রতি বছরের মতো অনেক কিছু দিয়ে গেল আবার নিয়েও গেল অনেক কিছু। বছরের একেবারে প্রান্তে এসে এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক বিদায়ী বছরের স্মরণীয় কিছু ঘটনা।

bibekananda-setu

১) বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ল ১ এপ্রিল। সত্যিই ‘এপ্রিল ফুল’ করল মানুষের প্রাণকে। কে জানত সদ্য নির্মিত সেতু ওই অংশটা হঠাৎ ভেঙে পড়বে? আর তার তলায় চাপা পড়ে মারা যাবেন এত জন মানুষ? গণেশ টকিজ আর পোস্তার সংযোগ স্থলে ব্রিজটির ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ২২ জনের। আহত হন শতাধিক মানুষ। উদ্ধার কাজে নামানো হয় সেনাবাহিনীকে। রাজ্যে এমন ভয়াবহ ঘটনা কমই ঘটেছে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয় নির্মাণকারী সংস্থাকে। মৃতদের পরিবারের জন্য ৫ লাখ টাকা আর আহতদের জন্য ২ লাখ টাকা এবং তুলনামূলক ভাবে কম আহতদের জন্য মাথাপিছু এক লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছিল। অভিযোগ তিরের মুখে পড়েছিল রাজ্য সরকারও।

tmc-win

২) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় তৃণমূল। ৫৪ বছর পর এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যা গরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় এলো। ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৪টিতেই এই সরকার জোড়াফুল ফুটিয়েছে।

mohasweta-debi

৩) চলে গেলেন হাজার চুরাশির মা। ২০১৬ নিয়ে গেল বাংলা তথা ভারতের অন্যতম প্রবীণ সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীকে। ১৯২৬ সালে জন্ম মহাশ্বেতা দেবীর। প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং সাহিত্যিক মনীষ ঘটকের কন্যা তিনি। বড়ো হয়ে ওঠেন ঢাকায়। এর পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন। সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক বিশেষত আদিবাসী-উপজাতি সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে আন্দোলন ও অধ্যাপনার কাজও করেছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য অকাদেমি, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ। পেয়েছেন ম্যাগসেসেও।

singur

৪) সিঙ্গুর নিয়ে মমতার রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষেই রায় দিল শীর্ষ আদালত।  ২০০৬ থেকে ২০১৬ টানা ১০ বছরের আন্দোলন সফল হয় তৃণমূলের। ২০০৬ সালে ভোটে জিতে টাটার প্রস্তাবিত ন্যানো কারখানার জন্য সিঙ্গুরের জমি দখলের সিদ্ধান্ত নেয় বামফ্রন্ট সরকার। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন সিঙ্গুরের মানুষ। ধীরে ধীরে তাতে যুক্ত হয় বহু বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সমাজের নানা স্তরের মানুষ। ২০০৬ সালের ভোটে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া তৃণমূল উঠে আসে রাজনৈতিক আঙিনার সামনে। বস্তুত ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার বীজ বোনা হয়েছিল ওই সিঙ্গুর আন্দোলন থেকেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি ছিল, বেআইনি ভাবে জমি অধিগ্রহণ করেছে বাম সরকার। তৃণমূলনেত্রীর সেই দাবিতেই বস্তুত সিলমোহর দিয়েছে এ বছর ৩১ আগস্ট শীর্ষ আদালতের রায়। বামফ্রন্ট সরকারের জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে বারো সপ্তাহের মধ্যে চাষিদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয় সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনকে রাজ্যের স্কুলের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

mother

৫) মাদারের সেন্টহুড। ৪ সেপ্টেম্বর মাদার থেকে সন্ত হলেন ‘মাদার টেরিসা’। তিরিশের দশকে কলকাতায় আসেন তিনি। তার পর থেকে এটাই তাঁর নিজের শহর। জীবনে নানা আত্মত্যাগ, পরিশ্রম আর মানব-সেবার সুমহান কর্মকাণ্ডের জন্যই মাদারের এই উত্তরণ। এই উপলক্ষ্যে ঐতিহ্যশালী শহর ভ্যাটিকানে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দু’ ঘণ্টা চলে এই অনুষ্ঠান। নানা আচার পালনের মধ্যে দিয়ে সেখানকার পোপ তাঁকে ‘সেন্ট’ ঘোষণা করেন। এ দিন এখানে উপস্থিত ছিলেন দেশ বিদেশের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ-সহ অনেকেই। এর পর অনেক জায়গায় মাদারের নামে ডাকটিকিট আর কয়েন বের করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এ দিনের পর থেকে মাদারের হাত ধরে কলকাতার নামও জুড়ে গেল ভ্যাটিকানের হোলি বুকে।

child-trafficking

৬) রাজ্য জুড়ে নবজাতক পাচার চক্র সামনে এল বছরের শেষে। জীবিত সদ্যোজাতকে মৃত বলে ঘোষণা করে শিশু বিক্রি কিংবা বাচ্চা বদলে দেওয়ার চক্র রাজ্যে যে এত শক্তিশালী, রাজ্যবাসীর তা ধারণা ছিল না এতদিন। ডাক্তার থেকে হাসপাতাল মালিক এবং চক্রের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতাল কর্মী, গ্রেফতার হয়েছেন অনেকেই। এখনও হয়তো অনেক রাঘব বোয়ালের ধরা পড়া বাকি। পাশাপাশি কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার নামও এই পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে সামনে এসেছে। রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে বহু শিশু ও শিশুর দেহ-কঙ্কাল।

sangkho-ghosh

৭) জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক পেলেন এই সম্মান। এই নিয়ে ছ’জন বাঙালি পেলেন এই সম্মান। আসল নাম চিত্রপ্রিয় ঘোষ, জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। তাঁর ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’ও পান তিনি।  তিনিই এক মাত্র ‘জ্ঞানপীঠ’ আর ‘সরস্বতী’ দু’টি সম্মানই পেলেন। হিন্দুত্ববাদী বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিতে হবে বলে ‘সরস্বতী’ পুরস্কার নিতে যাননি তিনি। এছাড়া ‘দেশিকোত্তম’, ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারও পান শঙ্খ ঘোষ।

madan

৮) সারদা কাণ্ডের প্রভাবশালী অভিযুক্ত তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র ছাড়া পেলেন। দু’দফায় প্রায় ২১ মাস জেল খাটার পর সেপ্টেম্বরে ছাড়া পান মদন। কিন্তু মাস ঘুরতে না ঘুরতে বছর শেষের এক দিন আগেই রোজভ্যালি কাণ্ডে গ্রেফতার হন তৃণমূল সাংসদ তাপস পাল। রোজভ্যালির একটি ফিল্ম প্রোডাকশন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাপস।  

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here