অস্মিতা মজুমদার

গত ২০ মে, কলকাতায় নিজেদের বাড়িতে বসেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের যা তাণ্ডব দেখেছি, তখনই বুঝে গিয়েছিলাম সুন্দরবনের কী পরিস্থিতি হতে চলেছে। তখন থেকেই মনে হচ্ছিল দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কিছু একটা করতেই হবে।

আমাদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আরাকান’ (Arakan–The Used Cloth Bank)-এর তরফে সুন্দরবনের অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে স্থির করে ফেলি। প্রথমে আমাদের পরিকল্পনা ছিল এল-প্লট দ্বীপে এই ত্রাণকাজ করা হবে।

Loading videos...

কিন্তু ত্রাণসামগ্রী নিয়ে পৌছোনোর ঠিক আগের দিনই জানতে পারি যে ওই দ্বীপটি কনটেনমেন্ট জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে করোনা সংক্রমণের কারণে।

কিন্তু আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। আমাদের দুই স্বেচ্ছাসেবী তন্ময় আর কৌস্তভ আমাদের থেকে বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। এল-প্লট যেতে না পারলেও অন্য কোনো একটা গ্রামে আমরা যাবই।

এ ভাবে ঠিক হল, এল-প্লটের বদলে আমরা যাব বালি দ্বীপে।

কলকাতা থেকে রওনা হয়ে প্রথমে গদখালি পৌঁছোলাম। সেখানে আমাদের আরও এক স্বেচ্ছাসেবী রঞ্জু সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। নৌকায় ত্রাণসামগ্রী চাপিয়ে ভেসে পড়লাম বালি দ্বীপের উদ্দেশে।

বালি দ্বীপ পৌঁছে নৌকো থেকে নেমে এ বার মোটরভ্যানে ওঠা। এই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতেই উম্পুনের তাণ্ডবের ভয়াবহ ছবি দেখতে পেলাম।

ঘূর্ণিঝড় চলে গিয়েছে এক মাস পেরিয়ে গিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছে। নোনা জল উঠলেও তা নামতে শুরু করেছে। নদীবাঁধগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। যে কোনো মুহূর্তে আবার বড়ো কোনো বান এলেই ভেসে ভেঙে যেতে পারে।

কিন্তু মানুষের দুর্দশা যেন চোখে দেখা যায় না। আমরা পৌঁছোতেই আমাদের ভ্যান ঘিরে ধরলেন স্থানীয় মানুষজন। কিছু ত্রাণসামগ্রী পাবেন এই আশাতেই।

উম্পুন দুর্গত এই গ্রামে পৌঁছে বেশ কিছু ব্যাপার আমার নজরে এল।

১) সুন্দরবনে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছোলেও সেগুলির সমবণ্টন হচ্ছে না। প্রত্যন্ত গ্রামে যাঁরা অনেক বেশি দুর্গত, তাঁদের হাতে ত্রাণ প্রায় পৌঁছোচ্ছে না। অনেক সংস্থা সহজে পৌঁছোনো যায় এমন গ্রামে ত্রাণ দিয়ে ফিরে যাচ্ছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাহাকার অনেক বেশি।

২) শুধুমাত্র কিছু ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার আশায় গ্রামবাসীরা সারা দিন ধরে নদীর বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। আশা করছেন, কোনো নৌকো গেলে তাঁদের হাতে কিছু ত্রাণের জিনিসপত্র দিয়ে যাবেন।

৩) সরকারের তরফে বাঁধ মেরামতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা এখনও যথেষ্ট নয়। এখনও অনেক জায়গাতেই বাঁধ দুর্বল হয়ে রয়েছে। কাঠের পাটাতন দিয়ে কোনো রকম ভাবে বাঁধকে ঠ্যাকনা দিয়ে রাখা হয়েছে। জোয়ারের সময়ে তা আবার ভেঙে পড়তে পারে।

৪) এখানকার বাসিন্দারা অসম্ভব সাহসী। নানা রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে ঝুঝছেন তাঁরা। আর সেই সবকে জয় করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জঙ্গলের মধ্যে হেঁটে যান তাঁরা ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার আশায়। বাঘ, কুমিরের কোনো ভয়ই তাঁরা পান না।

৫) “আবার কবে আসবেন”— ফিরে আসার সময়ে এমনই আমাদের বললেন গ্রামবাসীরা। বুঝতে পারলাম, এই দিকের গ্রামে ত্রাণের সামগ্রী খুব একটা কখনও আসেনি। এই মানুষগুলোর আর্তিতে হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা ত্রাণ নিয়ে ছুটে যাব সুন্দরবনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.