ইন্দ্রাণী সেন, বাঁকুড়া: অশুভ শক্তির বিনাশে ‘রাবণ কাটা’ উত্‍সব অনুষ্ঠিত হল বিষ্ণুপুরে। পরম্পরাগত ভাবে তিন দিনের এই উত্‍সব হয়ে আসছে। প্রতি বছর বিজয়া দশমীতে এই উত্‍সব শুরু হয়ে দ্বাদশীতে রাবণ কাটার মাধ্যমে এই উত্‍সবের সমাপ্তি ঘটে।

বাঁকুড়ার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর বিষ্ণুপুরের কাটানধারে রামভক্ত বৈষ্ণব অর্থাত্‍ রামায়েত্‍ বৈষ্ণবদের ‘অস্থল’ রঘুনাথজিউর মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে থেকে এই রাবণ কাটা উত্‍সবের শোভাযাত্রা বের হয়। তিন দিন ধরে বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করে স্থানীয় লোকশিল্পীরা রাবণ কাটা নাচ দেখান শহর ঘুরে। গৃহস্থের আমন্ত্রণে বাড়ি ঘুরে নাচ দেখান লোকশিল্পীরা।

প্রাচীন প্রথা মেনে বিজয়া দশমীর দিন রঘুনাথজিউর মন্দিরে পুজো করার পর কূম্ভকর্ণ বধ করেন তাঁরা। একাদশীতে সন্ধ্যায় ইন্দ্রজিত্‍ বধ ও দ্বাদশীর রাতে ওই মন্দির প্রাঙ্গণেই রাবণ কাটা উত্‍সব হয়। রবিবার রাতে ‘রাবণ কাটা’ উত্‍সবে অংশ নিতে শহরের অসংখ্য মানুষ রঘুনাথ জিউর মন্দিরে ভিড় করেন। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের তরফে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।

স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্র অনুসারে জানা যায়, বিষ্ণুপুরে ‘রাবণ কাটা’ উত্‍সবের সূচনা হয় রঘুনাথ সিংহ-এর আমলে। এই কারণেই এখানে রঘুনাথ মন্দির তৈরির পাশাপাশি এই মন্দির প্রাঙ্গণেই ধারাবাহিক ভাবে এই উত্‍সব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ‘রাবণ কাটা’ আদতে একটি লোকনৃত্য। এখানে জাম্বুবান, হনুমান, সুগ্রীব, বিভীষণ সেজে মানুষকে আনন্দ দেন দিন স্থানীয় লোকশিল্পীরা। শিল্পীর সঙ্গেই থাকে ব্যান্ডের দল। তাতে মেতে ওঠেন স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটকরা।

‘রাবণ কাটা’ উত্‍সবের মূল অঙ্গ রাবণের মাটির মূর্তি দীর্ঘ পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করে আসছেন পেশায় রাঁধুনি নারায়ণ গোস্বামী। রাবণ বধের দিন দ্বাদশীর সন্ধ্যায় চলে কৃত্রিম যুদ্ধ। শনের তৈরি পোশাক পরে অদ্ভুত দর্শন মুখোশ পরেন শিল্পীরা।

বিষ্ণুপুর শহরের বাসিন্দা ও প্রবীণ পুরাতাত্ত্বিক গবেষক চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত বলেন, “রাবণ বংশের কুম্ভকর্ণ ও ইন্দ্রজিত্‍ বধ শেষে দ্বাদশীর রাতে রাবণ বধ হয়। রাবণকে কেটে খণ্ড বিখণ্ড করা হয় বলেই ‘রাবণ কাটা’ নামেই এই উত্‍সব পরিচিতি লাভ করেছে।” তিনি আরও বলেন, “রামভক্ত বৈষ্ণবরা সারা দিন উপবাস শেষে নাচ করতে করতে দ্বাদশীর রাতে প্রতীকী রাবণকে কেটে ফেলেন।” সেই কারণেই এই উত্‍সবের নাম ‘রাবণ কাটা’ উত্‍সব।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here