round up 2017

১) মুকুল খসল তৃণমূলে

জল্পনা চলছিল অনেক দিন ধরেই। শেষে তৃণমূল ছাড়ার সিদ্ধান্তই নিলেন এককালে তৃণমূলের ‘সেকেন্ড ম্যান’ মুকুল রায়। দুর্গাপুজোর পরেই তৃণমূলের সঙ্গত্যাগ করেন তিনি। এর পর কিছু দিনের অপেক্ষা। নিজের দল তৈরি করবেন, নাকি বিজেপিতে যাবেন, এই নিয়ে জল্পনা যখন তুঙ্গে, তখনই বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। বিজেপিতে যোগ দিয়েই একের পর এক বোমা ফাটিয়ে চলেছেন তাঁর পুরোনো দলের বিরুদ্ধে।

২) গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন

শুরু হয়েছিল জুন মাসের একটি অভিশপ্ত বিকেলে। পর্যটকে গমগম করা দার্জিলিং-এ রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরেই শুরু তাণ্ডব। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সংঘর্ষ বাঁধে পুলিশের। শহরে সেনা তলব করেন মুখ্যমন্ত্রী। কিছু দিনের মধ্যেই পুরোদস্তুর গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন শুরু করে দেন তৎকালীন মোর্চা প্রধান বিমল গুরুং। শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের বন্‌ধ। টানা বন্‌ধে ক্ষোভ বাড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ভাঙন ধরে মোর্চার অন্দরেও। এক দিকে নানা অপরাধমূলক কাজকর্মে জড়িয়ে গা ঢাকা দেন গুরুং। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উঠে আসেন মোর্চার আলোচনাপন্থী নেতা বিনয় তামাং। রাজ্য সরকার বিনয়কে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ১০৪ দিন টানা বন্‌ধের পরে পুজোর ঠিক আগেই বন্‌ধ প্রত্যাহার হয় পাহাড়ে। এ দিকে মোর্চার গুরুংপন্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারান রাজ্য পুলিশের এএসআই অমিতাভ মালিক। তবে পাহাড়ের পরিস্থিতি এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের পথে। রাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিনয় তামাঙের মোর্চা এবং পাহাড়ের প্রধান বিরোধী দল জিএনএলএফও।

৩) বন্যার কবলে গোটা রাজ্যই

শুরু হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গ দিয়ে তার পর বন্যার কবলে পড়ল উত্তরবঙ্গও। জুলাইয়ের শেষের কয়েক দিন প্রবল বর্ষণের পরে জল ছাড়া শুরু করে ডিভিসির জলাধারগুলি। ধীরে ধীরে বন্যার কবলে পড়ে দক্ষিণবঙ্গ। পরিস্থিতি সব থেকে খারাপ হয় হাওড়ার আমতা এবং উদয়নারায়ণপুর ব্লকে। অতীতের বৃষ্টির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে বাংলার চেরাপুঞ্জির তকমা পায় বাঁকুড়া। দক্ষিণবঙ্গের পরে উত্তরবঙ্গের পালা। আগস্টের মাঝামাঝি সেখানে বন্যার প্রকোপ শুরু। প্রথমে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে বন্যার কবলে পড়লেও, সব থেকে খারাপ পরিস্থিতি হয় দক্ষিণ দিনাজপুরের। উত্তর দিনাজপুর এবং মালদহেও বন্যার প্রকোপ ভালোই টের পাওয়া যায়। বন্যায় প্রায় ৫০ জন প্রাণ হারান।

বন্যার ফলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ট্রেন পরিষেবা। বিহারের বারসোইয়ের কাছে রেল ব্রিজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রেল পরিষেবায় বাকি ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে উত্তরবঙ্গ এবং সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারত।

৪) সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং সম্প্রীতির নজির

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনায় ত্রস্ত হল বসিরহাট এবং লাগোয়া অঞ্চল। শুরু হয়েছিল বিতর্কিত একটি ফেসবুক-পোস্টকে ঘিরে। তার পরের পাঁচ দিন গোষ্ঠী সংঘর্ষে উত্তপ্ত হল অঞ্চল। এর পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের সক্রিয় ভূমিকায় ধীরে ধীরে শান্তি ফেরে বসিরহাটে। শুধু বসিরহাটই নয়, হাওড়ার ধুলাগড়ি হোক বা নদিয়ার নাকাশিপাড়া কিংবা কোচবিহারের মাথাভাঙা, ছোটোখাটো গোষ্ঠী সংঘর্ষে তপ্ত হয়েছিল ওই অঞ্চলগুলিও। অন্য দিকে সম্প্রীতির নজিরের গোটা দেশের মধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলা। এ বার মহরম এবং দুর্গাপুজো একসঙ্গে পড়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলার মানুষের। সেখানে কিন্তু এ রাজ্য পুরো নম্বরে উত্তীর্ণ। এক দিকে যখন মহরমের দিন উত্তরপ্রদেশের কানপুর এবং গুজরাতের বডোদরায় গোষ্ঠী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, বাংলা থেকে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবরই আসেনি। উলটে দুর্গাপুজোয় থাকা ঢাকিরা মহরমের মিছিলে ঢাক বাজিয়ে নজির সৃষ্টি করেছেন। আবার হিন্দু বন্ধুর চিকিৎসার জন্য মহরমের জন্য তোলা চাঁদার পুরোটাই তাঁর হাতে দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেন কয়েক জন মুসলিম বন্ধু।

৫) রাজ্যের নতুন জেলা

শুরু হয়েছিল কালিম্পংকে জেলা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে। তার পর পূর্ব এবং পশ্চিমে দু’ভাগ হল বর্ধমান এবং নতুন জেলা হল ঝাড়গ্রাম। সব মিলিয়ে ২০১৭-তে নতুন তিনটে জেলা পেল রাজ্য। এ ছাড়াও সুন্দরবনকেও আলাদা জেলা ঘোষণা করার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

৬) মানসকে হারালেন গীতা

বাম-কংগ্রেসের জোটের হাত ধরে গত বিধানসভা নির্বাচনে সবং-এ ৪৯ হাজার ভোটে জিতেছিলেন মানস ভুঁইয়া। ভোটের পর তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। চলে যান রাজ্যসভায়। তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে তৃণমূলের হয়ে দাঁড়ান তাঁর স্ত্রী গীতা ভুঁইয়া। উপনির্বাচনে অবশ্য কোনো জোট ছিল না। ভোট ছিল চতুর্মুখী। মানসবাবুর তুলনায় ভোট কিছুটা কম পেলেও জয়ের ব্যবধান বাড়ালেন গীতা ভুঁইয়া। জিতলেন ৬৪ হাজারেরও বেশি ভোটে। অন্যদিকে অনেকটা ভোট বাড়লেও তৃতীয় স্থানে থাকল বিজেপি। নিজেদের ভোটের ক্ষরণ কিছুটা রোধ করে দ্বিতীয় স্থানে সিপিএম।

৭) পর্বতারোহণে বাঙালি

পর্বতারোহণেও এই বছরটা স্মরণীয় থাকবে বাংলার। এ বার এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন কুন্তল কাঁড়ার এবং শেখ সাহাবুদ্দিন। ‘ফিরে দেখা জার্নি’ করে পর্বতারোহণের পঞ্চাশ বছর পালন করলেন বাংলার প্রথম মহিলা পর্বতারোহী দীপালি সিংহ। সপ্তশৃঙ্গ জয় করেন সত্যরূপ সিদ্ধান্ত।

৮) নক্ষত্র পতন

২০১৭-তে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন অনেক নক্ষত্রই।

Bengali celebrity passed away in 2017

এর মধ্যে ছিলেন নাট্যকার দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সুলতান আহমেদ, কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, নকশাল আন্দোলনের নেতা খোকন মজুমদার, নকশাল নেতা খুদন মল্লিক এবং নারায়ণ সান্যাল, লোকসংগীত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য, বাংলার মহিলা ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক শ্রীরূপা মুখোপাধ্যায়, বাউল তারক ক্ষ্যাপা এবং কালাচাঁদ দরবেশ, অভিনেত্রী শোভা সেন, সুমিতা সান্যাল, রীতা কয়রাল, সংগীতশিল্পী সবিতা চৌধুরী, বনশ্রী সেনগুপ্ত ও জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী আত্মস্থানন্দ এবং ভারতের প্রাক্তন বিচারপতি আলতামাস কবির।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here