কলকাতা: সময়টা একবিংশ শতাব্দী। আর সালটা ২০১৭। মঙ্গলে যান পাঠিয়ে শুক্রকে নিয়ে ভাবছে ভারত।  নিজের দেশের সম্পূর্ণ অচেনা মানুষটাও মার্কিন মুলুকে বর্ণবৈষম্যের শিকার হলে প্রতিবাদে, সমালোচনায় মুখর হয়েছে ভারত। আবার সেই দেশেই ‘কালো বাবা-মার ফর্সা সন্তান জন্ম দেওয়ার রহস্য’ জানতে কর্মশালায় যোগ দিচ্ছেন শহরের ‘শিক্ষিত’ দম্পতি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ঘনিষ্ঠ সংস্থা ‘আরোগ্য ভারতী’ কলকাতা শহরের হরিশ মুখার্জি রোডে একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিল  গত শনিবার।  কর্মশালার বিষয়টি ছিল ‘গর্ভ সংস্কার’। মা-বাবার গায়ের রঙ শ্যামলা হলে, কিংবা শরীরের গড়ন খাটো হলেও লম্বা, ফর্সা এবং সব দিক থেকে ‘উৎকৃষ্ট’ সন্তানের জন্ম দেওয়ার উপায় বাতলাবে এই কর্মশালা।

প্রথমে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ‘গর্ভবিজ্ঞান অনুসন্ধান কেন্দ্র’- এর ওয়েবসাইটে। গর্ভ সংস্কারকে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে ‘বিজ্ঞানসম্মত’ পদ্ধতি হিসেবে। ওয়েবসাইট থেকে জানা গেল সাহসী আর সৃজনশীল সন্তানের জন্ম দিতে গ্রহদের অবস্থান অনুযায়ী নাকি গর্ভধারণের পরিকল্পনা করতে হয়। তিন মাসের ‘শুদ্ধিকরণ’ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেলেই দম্পতীরা পাবেন তাঁদের বহু কাঙ্খিত ‘সুপার বেবি’। বাবা মায়ের কোনো জিনগত সমস্যা থাকলেও সন্তান হবে সেই সমস্যামুক্ত। সাইটে এ-ও বলা হয়েছে ভাবী সন্তানের ঐশ্বরিক আত্মা নিজেই নাকি তার বাবা মাকে বেছে নেয়। গর্ভ সংস্কার পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া সন্তানদের সার্বিক বিকাশও নাকি অন্যদের তুলনায় দ্রুত হয়। বাকিদের তুলনায় আগে কথা বলতে শেখে এই শিশুরা। ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, এই পদ্ধতিতে এখনও পর্যন্ত ৪৫০টি ‘কাস্টোমাইসড বেবি’ প্রসব করেছেন মায়েরা। ২০২০-এর মধ্যে দেশের প্রতিটি রাজ্যে একটি করে গর্ভবিজ্ঞান অনুসন্ধান কেন্দ্র চালু করার কথা ভাবছে তারা। তিন দশক ধরে আরএসএস-এর প্রচারক থাকা ডঃ অশোককুমার ভার্শ্নে বর্তমানে ‘আরোগ্য ভারতী’র জাতীয় স্তরের সেক্রেটারি। সংস্থার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অনেকেই এক কালে ছিলেন স্বয়ংসেবক।

যা-ই হোক, কয়েকটি শর্তের বিনিময়ে মিলে গেল কলকাতা হাইকোর্টের ছাড়পত্র। শর্ত এই রকম; কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফিজ নেওয়া যাবে না, শুধুমাত্র বক্তৃতা দেওয়া যাবে, গর্ভ সংস্কার সংক্রান্ত চিকিৎসা নিয়ে কোনো পরামর্শ দেওয়া যাবে না এবং কর্মশালা চলাকালীন তা পুরোটাই ভিডিও রেকর্ড করে ১৫ দিনের মধ্যে কোর্টকে জমা দিতে হবে।

কোর্টের শর্ত ঠিক মতো মানা হচ্ছে কি না, কর্মশালার ভিডিও করে রাখা হচ্ছে কি না, তা পরিদর্শন করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সংরক্ষণ কমিশনের সভাপতি অনন্যা চ্যাটার্জি চক্রবর্তী গিয়েছিলেন হরিশ মুখার্জি রোডের একল ভবনে। প্রথমত তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তার ওপর রীতিমতো হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনন্যা দেবী। শনিবারই ‘আরোগ্য ভারতীর’ বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর করেছেন তিনি। কর্মশালায় উপস্থিত দম্পতিরা জানিয়েছেন ৫০০ টাকা দিয়ে নাম নথিভুক্ত করে তাঁদের প্রবেশ করতে হয়েছে কর্মশালায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here