murder

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: শনিবার মধ্যরাত। থানার ডিউটি অফিসারের ঘরে এসে হাজির এক ব্যাক্তি। হাত রক্তমাখা, জামাকাপড়ও রক্তে ভিজে গিয়েছে। হতভম্ব পুলিশ আধিকারিকের সামনের টেবিলে দাঁড়িয়ে তার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, “মইলে মেরো ভউজু র দুইটা ভানিজ কো খুন গরে। মোলাই অ্যারেস্ট গরনু হোস”। যার অর্থ, আমি আমার বৌদি এবং দুই ভাইপোকে খুন করেছি। আমায় গ্রেফতার করুন। এর পর তার মুখ থেকে পুরো ঘটনাটি শুনে হতবাক হয়ে যান পুলিশকর্মীরা।

কালিম্পং জেলার ছিমছাম পাহাড়ি এলাকা দাড়ঁগাও। স্ত্রী জুনিতা এবং দুই নাবালক ছেলেকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন ধ্রুব ভুজেল। চাকরি করতেন একটি চা-বাগানে। কিছু দিন আগে মৃত্যু হয় তার। তখন তাঁর চাকরিটি দাবি করে ভাই সূর্য ভুজেল। এই নিয়ে বৌদি জুনিতার সঙ্গে অশান্তি শুরু হয় সূর্যর। সূর্য বেশ কয়েক বার তাঁকে হুমকি দিয়েছিল বলেও জানান পাড়া-প্রতিবেশীরা। কয়েক দিন আগে সূর্য জানতে পারে নিয়ম অনুযায়ী স্ত্রী জুনিতাকেই চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাগান কর্তৃপক্ষ। গত কাল রাতে সেই রাগ মেটাতেই সে তাঁর বিধবা বৌদিকে খুন করে। তার নৃশংসতার হাত থেকে রেহাই পায়নি দুই নাবালক ভাইপো। খুনের পর ধরা দিতে সটান এই জলঢাকা থানায়।

তার মুখ থেকে ঘটনা শোনার পরই অকুস্থলে ছুটে যান পুলিশ আধিকারিকরা। ততক্ষণে ভিড় জমে গিয়েছে বাড়ির সামনে। ভেতরে ঢুকে খুনের বীভৎসতা দেখে আতঁকে ওঠে পুলিশও। দেখা যায় শোয়ার ঘরের বাইরে পড়ে রয়েছে জুনিতার দেহ। ধারালো খুকরির আঘাতে তাঁর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন হয়ে গিয়েছে। পাশেই পড়ে রয়েছে আট বছরের আকৃতের দেহ। তার মাথায় ও মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। পাশেই পড়ে রয়েছে প্রায় দেড়ফুটের ঘাতক অস্ত্রটিও।

ভেতরে শোয়ার ঘরের বিছানায় পড়েছিল বছর ছয়েকের অংকিতের দেহ। তারও দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। পুলিশের অনুমান, বচসা চলাকালীন এই নৃশংস কাণ্ড ঘটিয়েছে সূর্য। স্থানীয় বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, একটুতেই মাথা গরম করে ফেলত সূর্য। তখন কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকত না তার। বেকার সূর্য এই চাকরি পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। অকুস্থলের পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, প্রথমে বৌদি জুনিতাকে খুন করে সূর্য। কিন্তু বড় ভাইপো আকৃত সেটা দেখে ফেলায় তাকে খুন করে। এর পর শোয়ার ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অংকিতের দেহ থেকে ধড় আলাদা করে দেয়।
রাতভর জেরার মুখে সূর্য জানিয়েছে, শনিবার রাতেও চাকরি কে পাবে এই নিয়ে বৌদির সঙ্গে তার বচসা হয়। সেই সময় বৌদি তার উদ্দেশে কটুক্তি করেন। তখনই এই ঘটনা ঘটায় সে। রাগ মেটাতে দুই ভাইপোকেও ছাড়েনি নেশাগ্রস্ত সূর্য। রবিবার তাকে গ্রেফতার করে কালিম্পং আদালতে পাঠানো হয়। আপাতত সে জেল হেফাজতে। মৃত তিন জনের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কালিম্পং-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অম্লান ঘোষ জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত শুরু করা হয়েছে। যে রকম নৃশংস ভাবে খুনগুলি করা হয়েছে, তাতে শুধু চাকরি না পাওয়ার রাগ, নাকি আরও অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের জেরে পারিবারিক সম্পর্কগুলোর মূল্য কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তার প্রমাণ এই ঘটনা। কিন্তু  সামান্য একটি চাকরির দাম তিন-তিনটি জীবন দিয়ে চোকাতে হল? এখন এই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে ওই পাহাড়ি গ্রামে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here