অসহায় আত্মজনেরা।

সুব্রত গোস্বামী

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয় / এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো / পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক / গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!! / প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা – / কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, / ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় / পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

Loading videos...

উম্পুন-বিধ্বস্ত সুন্দরবনে ত্রাণ দিতে গিয়ে যা দেখে এলাম, তাতে মনে হল একমাত্র কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা কবিতার এই ক’টি ছত্র দিয়ে তার বর্ণনা করা যায়।  


আমাকে একটু খাবার দেবে গো…

রবিবার ‘গড়িয়া সহমর্মী’, ভাঙড় কলেজের এনসিসি শাখা এবং লবণহ্রদ বিদ্যাপীঠের ২০০১-র প্রাক্তনীরা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সুন্দরবনের উম্পুন-বিধ্বস্ত অঞ্চলে। ‘গড়িয়া সহমর্মী’র এক জন সদস্য এবং এক জন সমাজকর্মী হিসাবে এই উদ্যোগে আমিও শামিল হয়েছিলাম।

যাওয়া হয়েছিল সুন্দরবনের কুমিরমারি, ছোটো মোল্লাখালি ও সাতজেলিয়া অঞ্চলে। অসহায় আত্মজনের হাতে কিছু ত্রাণ তুলে দিয়ে এই ঘোর দুর্দিনে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ১২০০ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হল সোলার লাইট, মশারি, শুকনো খাবার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, মাস্ক, ত্রিপল, মোমবাতি ও জামাকাপড়। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ হল, আর আমরা ফিরে এলাম এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে।

কাদায় যে ঢুকে যাচ্ছি…

উম্পুন প্রলয়ের পরে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এই নিয়ে চতুর্থ বার সুন্দরবনের বিধস্ত অঞ্চলে যাওয়া হল। প্রলয় চলে গিয়েছে আজ এক মাস হল। কিন্তু আজও সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। একটু খাবারের জন্য ক্ষুধার্ত অসহায় আত্মজনের যে যন্ত্রণা তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হল। তাঁদের আর্তনাদ যেন এখনও কানে বাজে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হল। তখনও অসহায় আত্মজনেরা একটু খাবারের জন্য নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। একটু খাবারের জন্য ক্ষুধার্ত মানুষ বুক-সমান কাদায় দাঁড়িয়ে। তাঁদের দলে রয়েছেন বয়স্ক মানুষেরাও। তাঁরা তো কাদায় ঢুকে যাচ্ছেন। সেই কাদা ঠেলে তারই মধ্যে কারও কারও এগিয়ে আসার চেষ্টা। এই দৃশ্য দেখে চোখে জল ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।  

ভেবেছিলাম ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে আমরা ফিরে যাব এক রাশ আনন্দ নিয়ে। তার বদলে ফিরলাম এক রাশ হতাশা নিয়ে। স্বাধীনতার পর ৭৩টা বছর কেটে গিয়েছে। কম সময় নয়। কিন্তু এখনও এত দারিদ্র্য, এখনও একটু খাবারের জন্য এত হাহাকার, এত কান্না।

এই লড়াইয়ে আমিও শামিল।

করোনার আতঙ্কে প্রতি বারই যাওয়ার আগে বাড়িতে বলে যাই, এই বারই শেষ যাওয়া, আর যাব না। কিন্তু ফিরে এসে মনে হয়, আমরা ছাড়া এই অসহায় আত্মজনের পাশে কেউ নেই। তাই আবার যেতে হবে এই জীবন্ত ঈশ্বরের সেবায়।

লড়াই করে পেলাম ত্রাণ…

যত দিন এই দেশে অভুক্ত মানুষেরা থাকবেন, তত দিন আমাদের কাজ শেষ হবে না। আমরা যে সমাজকর্মী, দেশ আমাদের কাছে প্রথম, তার পর পরিবার। বিশ্বাস করি, একদিন এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। ক্ষুধার্ত মানুষ পূর্ণিমার চাঁদকে দেখে বলবে না ঝলসানো রুটি। পৄথিবী আবার শান্ত হবে। আমরা জিতবই, উই শ্যাল ওভারকাম।

যাঁদের ছাড়া ‘গড়িয়া সহমর্মী’র পক্ষে এই ত্রাণকাজে উদ্যোগী হওয়া সম্ভব ছিল না, সেই লবণহ্রদ বিদ্যাপীঠের ২০০১ সালের প্রাক্তনীদের এবং ভাঙড় কলেজের এনসিসি শাখার ক্যাডেটদের জানাই সেলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.