নিজস্ব সংবাদদাতা : কলেজ স্কোয়ারের খোলা মঞ্চে তখন ভাষণ দিচ্ছেন বিজ্ঞানী তুষার চক্রবর্তী। ‘বিমুদ্রাকরণ’ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, এর জেরে লিটিল ম্যাগাজিন করাটাই ‘বন্ধ’ হয়ে যাবে।কারণ ‘বাইন্ডার’ কি ডিজিট্যাল মাধ্যমে টাকা নেবেন।

সত্যিই কি ‘বন্ধ’ হয়ে যাবে? উত্তরটা মিলে গেল একটি লিটিল ম্যাগাজিন স্টলেই। স্টলে রয়েছে পেটিএমের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার সুবিধা। ‘আঙ্গিক’ এবং ‘মাস্তুল’ নামে দু’টি সাহিত্য পত্রিকা যৌথ ভাবে এই ‘ক্যাশলেস’ ব্যবস্থা রেখেছে। আঙ্গিকের সদস্য সুমন সাধু জানালেন, ‘‘এর আগে একটি মেলায় স্টল দেওয়ার সময় থেকে আমরা এই ব্যবস্থা চালু করেছি। ওই মেলা কর্তৃপক্ষ আমাদের পেটিএম ব্যবস্থা করে দেয়। আমরাও দেখলাম ব্যবস্থাটা ভালো। তাই এখানেও রেখেছি।”

কলেজ স্কোয়ারে আয়োজিত এই লিটিল ম্যাগাজিন মেলা শুরু হয় ২০০৮ সালে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলনের সময়। তার ঠিক কয়েক বছর আগে থেকে রাজ্য সরকার নন্দন চত্বরে একটি লিটিল ম্যাগাজিন মেলা শুরু করে। সে বছর লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশকের একাংশ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে বাম সরকারের ভুমিকার বিরোধিতা করে ওই মেলায় না গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ (অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়) চত্বরে পালটা একটি লিটিল ম্যাগাজিন মেলার আয়োজন করে।

সেই শুরু। তার পর থেকে টানা দশ বছর ধরে চলছে এই মেলা। ২০১১-তে রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হয়। লিটিল ম্যাগাজিক প্রকাশকদের অনেকেই এই মেলায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরকার আয়োজিত মেলায় অংশগ্রহণ করে। প্রথম তিন বছর প্রেসিডেন্সি চত্বরে হয়, তার পর থেকে কলেজ স্কোয়ারে শুরু হয় দু’দিনব্যাপী এই মেলা।

কিন্তু পেটিএমের মাধ্যমে বিক্রিবাট্টা হচ্ছে? সুমন জানালেন, এখনও পর্যন্ত কেউই পেটিএম ব্যবহার করে তাদের পত্রিকা কেনেনি। তবে আগামী দিনে কিনবেন বলেই আশা তাঁর।

‘প্রতিবাদ’-এর হাতে ধরে যে মেলার শুরু সেখানে খুব সহজেই ঢুকে পড়ল পেটিএম, কী বলেছেন মেলা উদ্যোক্তারা? এক উদ্যোক্তা অনিন্দ্য ভট্টাচার্য জানালেন, ৮ নভেম্বর মোদীর ঘোষণা পর থেকে অটোতেও পেটিএমের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়ার চল হয়েছে। তা ছাড়া কেউ বই কিনতে এসে টাকা কম পড়লে এটিএম থেকে টাকা তুলে বই কেনেন। সেখানে পেটিএম বা অন্য কোনও সংস্থার মাধ্যমে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে তাতে পাঠাকেরই সুবিধা হয়।

littlemagfair

তা ছাড়া লিটিল ম্যাগাজিনের ক্রেতা তো মধ্যবিত্ত, যাঁরা অনেক আগে থেকেই ফেসবুকে হাত পাকিয়ে ফেলছেন। তাই তাঁদের কাছে এই ধরনের ব্যবস্থায় কিছুটা সুবিধাই হবে বলে মত অনিন্দ্যবাবুর।

‘নগদহীন’ লেনদেন-এ পা বাড়ানো লিটিল ম্যাগাজিন উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি চোখ পড়ল ‘মানববিহীন’ স্টলও। যেখানে টেবিলের উপর রাখা রয়েছে পত্রিকার নতুন পুরোনো কয়েকটি সংখ্যা। উপরে একটা পোস্টারে লেখা ‘ন হন্যতে পত্রিকা দেখুন, পছন্দ হলে ৫ টাকা রেখে পত্রিকা নিয়ে যান’। পত্রিকার সম্পাদক সীতাংশুশেখর জানালেন, গত কয়েক বছর ধরে তিনি এ ভাবেই পত্রিকা রেখে আসছেন। কেউ কেউ পত্রিকা নিয়ে টাকা রেখে যাচ্ছেন। এ বছর তাঁর বেশ কয়েকটি পত্রিকা বিক্রি হয়েছে। পাঠকরা পত্রিকা নিয়ে টাকা রেখে গেছেন।

দু’দিনের এই মেলার শনিবারই ছিল শেষ দিন। শেষ দিনে শেষ বেলায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘বিমুদ্রাকরণ’-এর বিরুদ্ধে সুর চড়া করছেন বিজ্ঞানী তুষার চক্রবর্তী। তাঁরা আশা ‘বিমুদ্রাকরণ’-এর মাধ্যমে এই ‘কর্পোরেট’ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারবে লিটিল ম্যাগাজিনই। 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here