নয়াদিল্লি ও কলকাতা : নোট বাতিল ইস্যুতে এমনিতেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনে ঘি পড়ল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সেনা মোতায়েনকে কেন্দ্র করে। এক দিকে সেনা মোতায়েনের বিরোধিতায় বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নবান্নেই রইলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দিকে লোকসভায় তৃণমূলের বিরোধিতার মুখে পড়ে শাসকদল। আবার সেনার দাবির পাল্টা হিসাবে কলকাতা পুলিশ যা জানিয়েছে, তাতে সেনার বক্তব্য স্বীকার করে নেওয়াই হয়েছে।

লোকসভায় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যসভায় সুখেন্দুশেখর বিশ্বাস – সেনা নামানোর প্রতিবাদে তৃণমূলের এই দুই সাংসদ শুক্রবার সংসদের দুই কক্ষে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হন। রাজ্যসভায় আবার তৃণমূল পাশে পায় বিএসপি নেত্রী মায়াবতীকে। লোকসভায় এ দিন সুদীপবাবু অভিযোগ করেন, “রাজ্যকে না জানিয়ে যে ভাবে সেনা নামানো হয়েছে সেটা যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় আঘাত হানার সমান।” অন্য দিকে সেনা নামানোর বিষয়টা খুবই উদ্বেগের বলে আখ্যা দেন সুখেন্দুশেখরবাবু। রাজ্যকে না জানিয়ে সেনা নামানো যে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় আঘাত সেটা বলেন মায়াবতীও।

তবে সব অভিযোগ খণ্ডন করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিকর। তিনি দাবি করেন, সেনা তার পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী কাজ করছে এবং এই ব্যাপারে রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দফতরকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যে আচরণ করছেন তাতে তিনি বিস্মিত আর ব্যথিত।”

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করেছে ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ড। শুক্রবার সাংবাদিক সম্মেলন করে রাজ্যের তরফ থেকে সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে ইস্টার্ন কমান্ডের মেজর জেনারেল সুনীল যাদব বলেন, “এটা শুধুমাত্র ঔপচারিক কারণে (অপারেশনাল পারপস) একটি অনুশীলন। স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে এই অনুশীলন চালানো হয়। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছিল।  বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলিতে এই অনুশীলন চালানো হয়।”   

তিনি বলেন, এই অনুশীলনের মাধ্যমে ভারী গাড়ি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়, বিশেষ করে উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে। কোনো আপৎকালীন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জওয়ানরা কত গাড়ি নিতে সক্ষম, সে ব্যাপারেই দু’দিন ধরে সমীক্ষা করা হচ্ছে। 

রাজ্যের প্রশাসন যে এই ব্যাপারে আগে থেকেই অবগত সে প্রসঙ্গে সুনীলবাবু বলেন, “কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে জানিয়েই এই সমীক্ষা চলছে।  গত ২৪ নভেম্বর  সেনার তরফে রাজ্যকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়।  চিঠি দেওয়া হয়েছিল পুলিশ কমিশনার রাজীর কুমার এবং বিভিন্ন জেলার জেলাশাসকদের।  প্রথমে ২৮ নভেম্বর রাজ্যে এই সমীক্ষা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে পুলিশের অনুরোধেই সেই তারিখ পিছিয়ে ১ ডিসেম্বর করা হয়।” গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে এই ধরনের অনুশীলন চালানো হয়েছিল। প্রতি বছরই এই ধরনের অনুশীলন চালানো হয় বলে জানিয়েছেন সুনীলবাবু।

সেনা গাড়ি থামিয়ে টাকা নিচ্ছে, বৃহস্পতিবার এমন অভিযোগও করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সে ব্যাপারে এ দিন কার্যত মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন সুনীলবাবু। তিনি বলেন, “টাকা তোলার সত্যতা প্রমাণ করুন। প্রমাণ থাকলে তদন্ত হবে।”
অন্য দিকে স্থানীয় প্রশাসনকে যে আগে থেকে জানিয়েই সেনা মহড়া চালাচ্ছে সেটা কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে কার্যত স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুলিশ টুইট করে জানায়, “নিরাপত্তার অভাব হতে পারে সেই জন্য সেনার মহড়ার ব্যাপারে কলকাতা পুলিশ লিখিত ভাবে আপত্তি জানিয়েছিল।”

তবে সেনা যতই বলুক রাজ্যকে আগে থেকে জানিয়েই এই মহড়া চলছে, তৃণমূল কিন্তু তা মানেনি। এমনকি সেনার দাবি যে মিথ্যে সেই অভিযোগও করা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে। নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে এ দিন সন্ধ্যায় নবান্ন ছাড়েন মুখ্যমন্ত্রী। তবে তার আগে কেন্দ্রের উদ্দেশে তীব্র তোপ দাগেন তিনি। নোট বাতিল ইস্যু থেকে নজর ঘোরানোর জন্যই যে কেন্দ্র এমন করছে সে অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এ রকম দিশাহীন দাম্ভিকতা আগে দেখা যায়নি। সেনা যদি না সরে তা হলে আইনি ব্যবস্থা নেব।” পাশাপাশি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে বলেন, “শুধুমাত্র বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতেই পর্যাপ্ত ৫০০ টাকার নোট পৌঁছেছে। বাকি রাজ্যগুলিতে এখনও পাঁচশোর নোট এসে পৌঁছোয়নি।”   

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here