গামছায় মাথা মুড়ে কাজে ব্যস্ত সাকিরুল।
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

বাবা সামান্য দিনমজুর। অভাবের সংসারে পড়াশোনার ফাঁকে দিনমজুরি করতে হয়েছে তাকেও। তবুও স্বপ্ন দেখে গেছে সে। সেই স্বপ্ন সফল করার জন্য এক কিশোরের লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছে পরিবার এবং গোটা গ্রাম। যাবতীয় প্রতিবন্ধকতাকে হারানোর সেই লড়াইয়ে সাফল্য এসেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ৪৪৮ নম্বর পেয়ে সাফল্যের অন্য মুখ নদিয়ার সাকিরুল শেখ।

তেহট্ট থানার শ্যামনগর নদিয়ার প্রান্তিক গ্রাম। সেই গ্রামের বাসিন্দা সাকিরুল। সেখানকার সিদ্ধেশ্বরীতলা ইনস্টিউশনের ছাত্র সে। বাবা সমীর শেখ পড়াশোনা করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। মা বেদানা বিবি লেখাপড়া জানেন না। পরিবারে সাকিরুল প্রথম উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হল। বাবা সমীর শেখ দিনমজুরি করেন অন্যের জমিতে। অনটন নিত্যসঙ্গী পরিবারে। সংসারের সেই আর্থিক অনটনের কারনে দিনমজুরি করতে হয়েছে সাকিরুলকেও। কখনও স্কুলে যাওয়ার আগে, আবার কখনও স্কুল থেকে ফিরে মাঠে দিনমজুরের কাজ করতে হয়েছে তাকে। তবুও লড়াই ছাড়েনি সে।
শুক্রবার সকালে যখন উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ হচ্ছে সেই সময়েও সাকিরুল বাবার সঙ্গে জমিতে কাজ করছে। তার ফোনও নেই, কাজেই ফল জানার উপায় ছিল না। তবে মাঠে কাজ করার সময় তার এক বন্ধু মারফত সে নিজের ফলের কথা জানতে পারে। সাকরুলের বাবা সমীর শেখ সপ্তাহে দু’দিন স্থানীয় শ্যামনগর কলার হাটে কলার কাঁদি গাড়িতে তোলার কাজ করেন। বাকি পাঁচ দিন সংসার চালানোর জন্য তাঁকে পরের জমিতে মজুরের কাজ করতে হয়। সংসার ও নিজের লেখাপড়া চালানোর জন্য সাকিরুলকেও লেখপড়ার ফাঁকে মাঠে কাজ করতে যেতে হয়। তাদের মাথা গোঁজার ঠাই ছিল না। কিছু দিন আগে আবাস যোজনায় একটি ঘর পেয়ে তারা থাকার জায়গা পায়। বিপিএল তালিকায় নাম থাকায় সরকারি ভাবে বিদ্যুৎ পেয়েছে তারা।
স্থানীয় কিছু বাসিন্দা তাকে নানা ভাবে সাহায্য করতেন পড়াশোনার জন্য। বই কিনতে না পারায় বিভিন্ন সময়ে বন্ধুদের থেকে বই নিয়ে এসেছে, রাত জেগে সেই বই থেকে খাতায় নোট লিখে পড়াশোনা করেছে সে। এর মাঝেও লড়াই ছাড়েনি সাকিরুল। নদিয়ার প্রান্তিক জনপদে একরাশ প্রতিবন্ধকতার মাঝে চলেছে সাকিরুলের জীবনসংগ্রাম। নিজের জেদ আর অধ্যাবসায়কে সম্বল করে লিখে ফেলেছে এক অসামান্য রূপকথা। বাংলায় ৮১, ইংরাজিতে ৮৬, রসায়নে ৯৮, অঙ্কে ৯৫, পদার্থবিদ্যায় ৭৫ ও জীববিদ্যায় ৮৮, এগুলো শুধু সংখ্যা নয় সাকিরুলের স্বপ্ন সার্থক করার পাথেয়।
সাকিরুলের স্বপ্ন বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। সেই আশায় এ বার সে জয়েন্ট দিয়েছিল। র‍্যাঙ্ক করেছে ১১৭০০। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খরচ অনেক। তার সংশয়, সেই স্বপ্ন টাকার অভাবে পূরণ হবে কিনা। সাকিরুল বলে, “সংসার চালানোর জন্য পড়াশোনার ফাঁকে মাঠে কাজ করতে হয়। সহপাঠী ও কয়েকজন মানুষের সাহায্যে আজ এই জায়গায় এসেছি। আমার স্বপ্ন ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। কিন্তু টাকার অভাবে হয়তো সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।”
সাকিরুলের বাবা সমীর শেখ বলেন, “আমার বাড়িতে কেউ মাধ্যমিক পাশ করেনি। ছেলে অনেক কষ্টে নিজের চেষ্টায় আজ এই ফল করেছে। তা-ও সরকারের তরফে নানা সহায়তা পেয়ে ছেলে কিছুটা হলেও উপকৃত হয়েছে।” সাকিরুলের মা বেদনা বিবি লেখাপড়া কিছুই জানে না। তিনি বলেন, “আল্লার দোয়ায় ও মানুষের দোয়ায় সাকি আজ পাশ দিয়েছে। টাকার অভাবে আর কত দূর সাকি যাবে তা জানি না।” সাকিরুলকে ঘিরে যেমন স্বপ্ন দেখছে গোটা পরিবার, তেমনি অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা নিয়েও শঙ্কিত তারা। এখন তারা তাকিয়ে কেউ যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সে দিকে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন