অভিনব স্টুডিও ‘তালিমঘর’-এর কাজ শুরু হল চন্দননগরে

studio inauguration
দীপ প্রজ্বলনে কবি অরুণ চক্রবর্তী ও পণ্ডিত আনন্দগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

হুগলির চন্দননগরে এক অত্যাধুনিক স্টুডিও উদ্বোধন হল সম্প্রতি। নাম ‘তালিমঘর’। নামই পরিচয় বহন করে নিয়ে চলবে, এমনটাই আশা প্রকাশ করেন সে দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুধীবৃন্দ।

‘তালিমঘর’ এক অর্থে চর্চাকেন্দ্র, কিন্তু এর সিংহ ভাগ দখল করে আছে অডিও-ভিডিও-এডিটিং স্টুডিও। তারুণ্যের প্রবল ঝঙ্কার থাকে। সেই ঝঙ্কারের বশেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। স্টুডিওর অধিকর্তা সার্থক সেন ও দিব্যেন্দু দাস দাবি করেন, তাঁরাই এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি স্টুডিও চালু করলেন।

Sarthak Sen and Arun Chakraborty
পর্দা সরাচ্ছেন সার্থক সেন ও অরুণ চক্রবর্তী।

এই স্টুডিওতে কী কী কাজ হবে সেটা জেনে নেওয়া জরুরি। রেকর্ডিং ও মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। রেকর্ডিং-এর মধ্যে থাকছে ডেমো, অডিও এডিটিং, ভয়েস ওভার, মিক্সিং ও মাস্টারিং। ভয়েস ওভারে শিল্পীর গাওয়া গান, কবিতা, নানা সুর, নানা শব্দ (শিল্পীর অনুমতি নিয়ে) প্রক্ষেপণ করা। থাকছে অ্যাডভার্টাইজিং, জিঙ্গলস্‌, ভিডিও ও অডিও প্রোডাকশন যেমন শর্টফিল্ম, ভিডিও প্রজেক্ট ইত্যাদি। আছে সাউন্ড ট্র্যাক অর্থাৎ যার কোনো ভিডিও হচ্ছে না। যেমন নাটক, জিঙ্গলস, কবিতা, গান, শ্রুতিনাটক, সাউন্ড ট্র্যাক মেকিং অ্যান্ড এডিটিং ইত্যাদি। আর তালিমঘর মিউজিক অ্যাডাকেমিতে থাকছে তবলা, পিয়ানো, গিটার, সেতার ও সরোদ বাদন শিক্ষার ব্যবস্থা।

স্টুডিও ‘তালিমঘর’-এর তিনটি ভাগ – রেকর্ডিং, ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রোডাকশন। বাবা মলয় কুমার সেন, মা ছন্দা সেন, সার্থক সেন, অন্বেষ দে, কৌশিক গোস্বামী ও পৌলমী দে-র অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে স্বপ্নের ঘরটি।

হঠাৎ করে এমন চিন্তা মাথায় এল কেন?

পণ্ডিত তন্ময় বসুর সুযোগ্য ছাত্র সার্থক নানা রেকর্ডিং-এর কাজে প্রায়শই কলকাতায় যেতেন এবং স্টুডিও ভাড়া করে কাজ সারতেন। কিন্তু এতে এক দিকে সময় নষ্ট, অন্য দিকে স্টুডিওর অত্যধিক ভাড়া। তাই মনে মনে আঁকা হচ্ছিল এক জল্পনা। যোগাযোগ বন্ধু দিব্যেন্দু দাসের সঙ্গে। নানা আলোচনার মধ্য দিয়ে দানা বেঁধে উঠতে লাগল ইচ্ছেটুকু।

ক্যালিফোর্নিয়ার, জার্মানি ও ইউরোপের আরও কিছু জায়গা থেকে আনা হয়েছে নানা যন্ত্রাংশ, পাইন কাঠ ও  বিশেষ ধরনের অ্যাকস্টিক ফেব্রিক। চন্দননগরে সার্থকদের বাড়ি ‘ঠিকঠিকানা’য় বসে তিলে তিলে গড়া হয়েছে স্বপ্নের ‘তালিমঘর’। গোটা স্টুডিওর কোণগুলি এমন ভাবে তৈরি যে কোনো অ্যাবজর্বশন হবে না। দিব্যেন্দুর কাজ বিদেশেও ব্যাপক সমাদর পেয়েছে। দেশে তো কাজ করছেনই – শান্তিনিকেতনে করেছেন, করেছেন কলকাতায়। দিব্যেন্দু যে ধরনের স্টুডিও চন্দননগরে বসে তৈরি করেছেন, তা বিশ্বের কোথাও নেই, এমনটাই দাবি তাঁর।

কলকাতায় না গিয়ে সময় আর অর্থ বাঁচাতেই গড়ে উঠেছে ‘তালিমঘর’ রেকর্ডিং স্টুডিও। এখানে স্টুডিও ব্লকিং আট ঘণ্টা রাখা হয়েছে। স্টুডিও উদ্বোধনের পরের দিন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে রেকর্ডিং-এর কাজ।

the guests in inaugural function
সে দিনের অনুষ্ঠানে বাবা মলয় কুমার সেন, পণ্ডিত আনন্দগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ চক্রবর্তী, তবলিয়া প্রাণগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও সার্থক সেন।

এত বড়ো কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা সার্থকের জীবনপঞ্জি জানার ইচ্ছে হল। গোয়ার বিচ থেকে একটা ঢোল কিনে দিয়েছিলেন সার্থকের মা। তখন সার্থকের বয়স কত? বড়োজোর দুই বা তিন বছর। নাট্যকার ও অভিনেতা মলয় কুমার সেন বুঝে গিয়েছিলেন এ ছেলের হাত একদিন কথা বলবে। তাই চার বছর বয়সেই বসিয়ে দিয়েছিলেন প্রথম গুরু ভূতনাথ পাখিরার কাছে। বছর চারেক শেখার পর কিশোর সার্থক তালিমের জন্য যান প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য পণ্ডিত তন্ময় বসুর কাছে নাড়া বাঁধেন পাকাপাকি ভাবে। তাঁর কাছে দীর্ঘ ১২ বছর তালিম নেন।

আরও পড়ুন পর্দায় ভূতেরা জিতলেও তা নিয়ে ক্ষমতাবানরা মাথা না ঘামালেই পারতেন

সার্থকের হাত এমনই কথা বলতে শুরু করল, তন্ময়বাবু  সার্থককে শান্তিনিকেতনে তাঁর গুরুভাই অধ্যাপক সন্দীপ ঘোষ ও শিক্ষক নিখিলরঞ্জন রায়ের (বর্তমানে প্রয়াত) কাছে পড়াতে পাঠালেন। পাঁচ বছর পড়াশোনা করে মাস্টার ডিগ্রি, সঙ্গে এ গ্রেড ডিস্টিঙ্কশন নিয়ে চন্দননগরে ফেরা।

সার্থকের স্বপ্ন সার্থক হয়েছে পাশে বাবা-মা এবং অসংখ্য শুভার্থীকে পেয়ে। সে দিনের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে স্টুডিও উদ্বোধন করেন ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’ খ্যাত বিশিষ্ট কবি ও গায়ক অরুণ চক্রবর্তী এবং পণ্ডিত আনন্দগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকটি নাটকের দল ও বন্ধুরা উপস্থিত ছিল।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.