the teenage girl

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: কিশোরীটি যখন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, মা-বাবা মারা গিয়েছেন, সৎমার অত্যাচার সইতে না পেরে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, তখন চোখ ভিজে গিয়েছিল থানার পুলিশ কর্মীদেরও। কিন্তু ঘণ্টা কয়েক পর সেই কিশোরীর কীর্তি শুনে চক্ষু চড়কগাছ সেই পুলিশকর্মীদেরই। বছর পনেরোর এক কিশোরী যে ভাবে মধ্যরাত পর্যন্ত গোটা কোতোয়ালি থানার পুলিশকে বিভ্রান্ত করে রাখল তা নজিরবিহীন।

শুক্রবার রাত নটা নাগাদ জলপাইগুড়ির কদমতলা বাসস্ট্যাণ্ডে এক কিশোরীকে উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয় কয়েক জন ব্যবসায়ীর। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে, মেয়েটি জানায় তার নাম সুমনা রায়, বাড়ি ধূপগুড়ির সিনেমাহল পাড়ায়। মা আগেই মারা গিয়েছেন। সৎমা নিত্য অত্যাচার চালান। এর মধ্যে বাবা মারা যাওয়ায় সৎমার অত্যাচার আরও বাড়ে। তা সইতে না পেরেই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছিল বছর পনেরোর মেয়েটি।

এই বয়সের একটি মেয়ে রাতের রাস্তায় এ ভাবে থাকলে বিপদ হতে পারে, এই ভেবেই এক ফলের দোকানদার কোতোয়ালি থানায় ফোন করে সব জানান। থানা থেকে মহিলা পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসে তাকে। থানায় চাইল্ড লাইনের রুমে বসেও সেই ‘দুখের কাহিনি’ শোনায়। সৎমার কথা না শুনলেই তাকে মারধোর, না খাইয়ে রাখা হত। শীতের সময় পড়ার জন্য একমাত্র সম্বল সোয়েটারটিকেও সৎমা পুড়িয়ে দিয়েছে শুক্রবার। তার পর তাকে মারধর করছে। সেই জন্যই সে বিকেলে পালিয়েছে বাড়ি থেকে। কাহিনি শুনে পুলিশ আধিকারিকরাও মর্মাহত।

কোতোয়ালি থানা থেকে যোগাযোগ করা হয় ধূপগুড়ি থানায়। খবর পেয়েই কিশোরীর বাড়ির খোঁজ শুরু করে ধূপগুড়ি পুলিশ। কিন্তু ওই এলাকায় কিশোরীর দেওয়া নাম ঠিকানা খুঁজে পায়নি তারা। যা শুনে ফাঁপরে পড়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশও। পোড় খাওয়া পুলিশকর্মীদের সন্দেহ হওয়াতে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কিশোরীকে।

এ বার যা বলে কিশোরী তা শুনে চমকে ওঠেন পুলিশকর্মীরা। সে জানায় তার নাম সাবিনা পারভিন (নাম পরিবর্তিত)। মাধ্যমিকের ছাত্রী। সিনেমাহল পাড়া নয়, বাড়ি ধূপগুড়ির খলাইগ্রামে। তবে সে আবার জানায়, বাবা মারা যাওয়ার পর সৎমার অত্যাচার সইতে না পেরেই সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। কিশোরীর কথামতো ধূপগুড়ি থানার পুলিশ এ বার যায় খলাইগ্রামে। সেখানে তারা নামের সূত্র ধরে বাড়ির খোঁজও পেয়ে যায়। যদিও আরও চমক অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য।

বাড়িতে গিয়ে তারা দেখে কিশোরীর বাবা রীতিমতো সুস্থ এবং জীবিত। সৎমার কাহিনিটিও ভূয়ো। যিনি রয়েছেন তিনি কিশোরীর নিজের জন্মদাত্রী। সাবিনা-সহ তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে দারিদ্র্যের সংসার ওই কৃষকদম্পতির। তাঁরা জানান, টাকা নিয়ে রেশন আনতে যাওয়ার পর থেকেই আর বাড়ি ফেরেনি মেয়ে। বিকেল থেকে মেয়ে নিখোঁজের পর প্রায় পাগলপারা হয়ে গিয়েছিলেন ওই কৃষকদম্পতি। সব আত্মীয়-বন্ধুর বাড়িতে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে ধূপগুড়ি থানায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তাঁরা। তখনই সেখানে এসে পুলিশ মেয়ের কথা জানায়। রাতেই স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে জলপাইগুড়ি চলে আসেন কিশোরীর বাবা। থানায় মেয়েকে দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেলেন। যদিও পরে পুলিশের মুখ থেকে সব গল্প শোনার পর হতবাক হয়ে যান তিনিও।

কিন্তু এমন মিথ্যে গল্প ফাঁদল কেন কিশোরী? জীবিত বাবা-মাকে মৃত বলার মতো মানসিকতাই বা হল কী করে? পুলিশের কাছে ওই কিশোরী জানিয়েছে, সে ঘুরতে ভালোবাসে। কিন্তু বাবা গরিব হওয়ায় কোথাও নিয়ে যায় না। তাই দিন কয়েক ধরেই ফন্দি আঁটছিল। শুক্রবার রেশন আনার জন্য কিছু টাকা হাতে পেয়ে সে কিছু না ভেবেই বাসে চেপে বসে। যেতে চেয়েছিল শিলিগুড়ি সংলগ্ন জটিয়াকালী গ্রামে, পিসির বাড়িতে। কিন্ত ভুুল বাসে উঠে চলে আসে  জলপাইগুড়ি। কিন্তু এতে যে তার বিপদ হতে পারত সে কথা বলায়, মাথা নিচু করে থাকে সে।

মনোবিদরা জানাচ্ছেন, এটাও এক ধরনের অসুখ। জলপাইগুড়ির প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃস্বস্তিশোভন চৌধুরী জানিয়েছেন, একে ‘কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার’ বলে। অর্থাৎ কিশোর বয়সের আচারণগত সমস্যা। নিজের ইচ্ছেপূরণের জন্য মিথ্যে কথা বলা বা অপরাধমূলক কাজ করতে এদের বাধে না। কিশোর বয়সেই এই অসুখের চিকিৎসা এবং ভালো কাউন্সেলিং প্রয়োজন। নচেৎ বয়স বাড়লে এই রোগ ‘পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’-এ পরিণত হতে পারে, জানিয়েছেন ডাঃ চৌধুরী।

কোতোয়ালির আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার জানিয়েছেন, থানার অভিজ্ঞ মহিলা অফিসারকে দিয়ে কিশোরীর কিছুটা কাউন্সেলিং করা হয়েছে।

তবে মেয়ে যা-ই করে থাকুক না কেন, মেয়েকে ফিরে পেয়ে কিন্তু আপ্লুত বাবা। তিনি বারবার থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার এবং অন্যান্য পুলিশকর্মীকে ধন্যবাদ জানান। চোখের মণিটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি জানিয়েছেন, যতই গরিব হোন না কেন, এ বার টাকা জোগাড় করে মেয়েকে কাছেপিঠে কোথাও ঘুরিয়ে নিয়ে আসবেন। এত কিছুর পর মেয়েও লজ্জা পেয়ে কথা দিয়েছে, এ রকম দুষ্টুমি সে আর করবে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here